জামায়াত প্রশ্নে জারা-জাবীনের পথে সামান্তাও

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নুসরাত তাবাসসুম এই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘ডিল ইজ ডান’
তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আরও এক পরিচিত মুখ সামান্তা শারমিন দল ছাড়লেন। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। কাউন্সিল ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন এবং নারী প্রশ্নে দলের অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সামান্তা। তার পদত্যাগপত্র ইতোমধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
এনসিপির জন্মলগ্ন থেকেই দলটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সামান্তা শারমিন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করে এনসিপি। তখন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে সরিয়ে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। পদাবনতির বিষয়টি নিয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। তবে দল ছাড়ার বিষয়ে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই পরিচিত নারী নেত্রীর পদত্যাগ এবং তার অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি এনসিপি।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য অস্পষ্ট
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘গত ১১ মাসে এনসিপির অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছি। পাশাপাশি আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে দলের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি। দল ভুল পথে গেলে তা থেকে ফিরিয়ে আনা নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করেই অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়েছি।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন তিনি। এখন তিনি মনে করছেন, এনসিপি আর দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আন্তরিক থাকতে পারবে না।
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন অভিযোগ করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপি সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে গেছে।
তার ভাষ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশ মনে করে না।
তিনি দাবি করেন, জামায়াত প্রকৃত অর্থে সংস্কারের রাজনীতি করে না। বরং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা নিজেদের পক্ষে ব্যবহারের প্রয়োজন থেকেই দলটি সংস্কারের কথা বলে।
জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সামান্তা শারমিনের মতে, জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এনসিপির নিজস্ব অবস্থানের পার্থক্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। এ কারণে উদার গণতন্ত্রপন্থীরা এনসিপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে এনসিপির ছয় নেত্রী ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। সামান্তা শারমিন ছাড়াও নির্বাচনী ঐক্য ঘোষণা করার দুদিন আগে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, নুসরাত তাবাসসুম, মনিরা শারমিন ও নাহিদা সারোয়ার নিভা। এ ছাড়া শীর্ষ নেতাদের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন অন্তত ৩০ কেন্দ্রীয় নেতা।
এনসিপির স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন সামান্তা শারমিন। তার আরেকটি বড় অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার যথাযথ স্বীকৃতি দেয়নি দলটি।
তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধের অংশীদার ও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকর্তা ছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পুরনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায্য হিস্যা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এনসিপিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই প্রবণতার অনুসারী হয়েছে।’
কাউন্সিল ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের সমালোচনা করে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘কাউন্সিল ছাড়াই কমিটি পুনর্গঠন করায় দলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে নেতৃত্ব নির্বাচন, নিরপেক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’
পাশাপাশি বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তাসনিম জারার পদত্যাগ
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এনসিপি ছাড়েন দলটির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। সে সময় জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল দলটির। এনসিপির একাধিক সূত্র তখন জানিয়েছিল, জামায়াতের সঙ্গে জোটের ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। একপর্যায়ে নির্বাচনী ঐক্যের ঘোষণা আসার আগেই পদত্যাগ করেন।
দল ছাড়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি তাসনিম জারা। তবে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ‘জাতীয় নির্বাচন ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘জনগণ পরিবর্তন চায়। তারা পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমি দল থেকে সরে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারাকে মনোনয়ন দিয়েছিল এনসিপি। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই আসনে বিএনপির হাবিবুর রশীদ ১ লাখ ১১ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আর ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন তাসনিম জারা।
তাজনূভা জাবীন যা বলেছিলেন
জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রেক্ষাপটে এনসিপি ছেড়েছিলেন দলটির তৎকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনও। তিনি নির্বাচন থেকেও সরে দাঁড়ান। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্টে দল ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন।
ওই পোস্টের শুরুতে তাজনূভা লিখেছিলেন, ‘এটাকে রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী জোট ইত্যাদি লেভেল দেয়া হচ্ছে। আমি বলব এটা পরিকল্পিত। এটাকে সাজিয়ে এ পর্যন্ত আনা হয়েছে।’
তাজনূভা জাবীন দাবি করেন, ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে সব বিকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা ছাড়া আর কোনো উপায় না থাকে। তার মতে, পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল পরিকল্পিত।
জামায়াতের আদর্শের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লিখেছিলেন, ‘কিন্ত যারা এই দেশ, এই সংসদই চায় নাই, তাদের সাথে সমঝোতায় একদম শুরুতেই এমপি হতে চাওয়া, বা যারা এদের কল্যাণে এমপি হওয়ার জন্য হাভাইত্তার মতো করছে তাদের নেতৃত্ব মানা আমার পক্ষে ঠিক গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর অসম্ভব।’
তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি। আমার নেতা হবে মাজাওয়ালা, জুলাই রাজনীতির ধারক। কিন্তু পুরো জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক কৌশলের নাম করে তুলে দিচ্ছে জামায়াতের হাতে।’
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এনসিপি প্রথমে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের পর দলটি ৩০টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ পায়। দলের অন্য নেতাদের নির্বাচন করতে না দেওয়ার কৌশল হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন তাজনূভা জাবীন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করা নেত্রীদের মধ্যে ছিলেন মনিরা শারমিন ও নুসরাত তাবাসসুম। পরে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হয়েছেন নুসরাত তাবাসসুম। যদিও ওই আসনে প্রথমে মনোনয়ন পান জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী মনিরা শারমিন। তবে সরকারি চাকরি ছাড়ার পর তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তিনি শপথ নিতে পারেননি। শেষে নুসরাত তাবাসসুমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।








