রাজপথে সক্রিয় ইশরাক রাজনীতিতে অপরিপক্ব

২০২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কর্মীকে বাঁচাতে পুলিশের বেষ্টনির ভেতর ঢুকে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন ইশরাক হোসেন (বামে), আজ সোমবার প্রেস ক্লাবে প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
প্রয়াত বাবা সাদেক হোসেন খোকার উত্তরাধিকার হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশের পথ তৈরি হয়েছিল ইশরাক হোসেনের। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম তাকে দিয়েছে নিজস্ব পরিচিতি। অল্প সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক উত্থানের এই পথে বারবার বিতর্কেও জড়িয়েছেন ইশরাক। তার সাহসিকতা যেমন নেতাকর্মীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি কিছু কর্মকাণ্ড প্রশ্ন তুলেছে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
সর্বশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার উপস্থিতি এবং এর জেরে প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ সে প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। ফলে ইশরাকের রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। রাজপথের সাহসকে দায়িত্বশীল নেতৃত্বে রূপ দিতে পারলে তার সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খোলা থাকবে। অন্যথায়, নিজের কিছু সিদ্ধান্ত ও আচরণই তার রাজনৈতিক অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের দীর্ঘকালীন মেয়র ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। পুরান ঢাকায় তার শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল। বাবার মৃত্যুর পর সেই উত্তরাধিকারকে সঙ্গী করেই রাজনীতিতে আসেন বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি।
ঢাকা-৬ আসনে মনোনয়ন না পেলেও ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হন। নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে ফল প্রত্যাখ্যান করেন ইশরাক। তবে ওই নির্বাচন তাকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। বর্তমানে দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির ১ নম্বর সদস্য তিনি।
বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নেতাকর্মীদের পাশে থাকার কারণে ইশরাক সাহসী ও কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পুলিশের হাতে আটক এক কর্মীকে ছাড়িয়ে আনার ঘটনাও আলোচনায় আসে। তবে তার কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, কখনো কখনো নিজের ভূমিকা সামনে তুলে ধরার প্রবণতা তার কর্মকাণ্ডে প্রাধান্য পেয়েছে। যেটিকে সাধারণভাবে অনেকে স্টান্টবাজিও বলে থাকেন।
ইশরাকের যত কাণ্ড
১৯ অক্টোবর ২০২৬
দলীয় নির্দেশনার বাইরে গিয়ে সরকার হটাতে কয়েক বছর আগে তৎকালীন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদের নেতৃত্বে জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির ব্যানারে আয়োজিত কয়েকটি কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিলেন ইশরাক। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি বিএনপির হাইকমান্ড। এ ঘটনায় তাকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
অনেকে মনে করেন, রাজনীতিতে সাহসিকতার পাশাপাশি বিচক্ষণতা, সংযম ও দলীয় অবস্থানের সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইশরাকের রাজনৈতিক পথচলায় এ ভারসাম্য কতটা বজায় ছিল, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
ইশরাকের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি আলোচিত অধ্যায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ নিয়ে বিরোধ। ২০২০ সালের নির্বাচনে ফলের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করেন তিনি। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে।
তবে শপথ গ্রহণ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলে তার কর্মী-সমর্থকরা আন্দোলনে নামেন। ১৪ মে থেকে এক মাসের বেশি সময় নগর ভবন ঘিরে অচলাবস্থা চলে। ইশরাকের অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক কারণে তাকে দায়িত্ব নিতে দেওয়া হচ্ছে না। একপর্যায়ে শপথের আগেই নিজেকে মেয়র ঘোষণা করে দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ নেন তিনি। এতে সমালোচনা সৃষ্টি হয়। সমর্থকরা একে নির্বাচনী রায় বাস্তবায়নের দাবি হিসেবে দেখলেও সমালোচকদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি ছিল। পরে বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন ইশরাক।
প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগে নতুন প্রশ্ন
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে জয়ী হন ইশরাক। এরপর তাকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার আট মাসের মাথায় পদ ছাড়তে হলো তাকে।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার উপস্থিতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন উপস্থিতি ও অভিযান পরিচালনার ধরন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এতে সরকারও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। পরদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক।
এ ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনা এই বার্তা দিয়েছে, রাজপথের আন্দোলন এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এক নয়।
সামনে সম্ভাবনা, সঙ্গে চ্যালেঞ্জ
মাত্র ৩৯ বছর বয়সে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া ইশরাকের রাজনৈতিক অগ্রগতির বড় দিক। পারিবারিক উত্তরাধিকার, পুরান ঢাকায় সাংগঠনিক ভিত্তি, রাজপথের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনী সাফল্য তাকে ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
তবে অনেকে মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখতে শুধু পারিবারিক পরিচিতি ও দলীয় সমর্থনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিজস্ব দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। রাজপথের সক্রিয়তার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি করাই তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ইশরাক নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও পরিণত হলে সাম্প্রতিক বিতর্ক তার রাজনৈতিক অগ্রগতির স্থায়ী বাধা নাও হতে পারে। অন্যদিকে একই ধরনের বিতর্কের পুনরাবৃত্তি হলে তার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়বে।






