সৌদি কারাগারে ১৬ হাজার বাংলাদেশি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বা পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই। মূলত রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দেওয়া ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এ সংখ্যা জানা গেছে।
গত বুধবার সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর পরই কারাবন্দিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আসাদুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রবাসে যেসব বাংলাদেশি কারাগারে বন্দি আছেন, তাদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করতে দূতাবাসগুলোতে চিঠি পাঠানো হবে। পাশাপাশি কোনো প্রবাসী দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে থাকলে, তাদের বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ‘নোট ভার্বালের’ মাধ্যমে ১৫৮ জন কারাবন্দি বাংলাদেশির বিষয়ে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলকে অবহিত করা হয়। আগামীর সময়ের বিশ্লেষণে এই বন্দিদের মামলার যে চিত্র উঠে এসেছে, এর মধ্যে মাদক মামলা সর্বোচ্চ প্রায় ৪৮ শতাংশ। ৮ শতাংশের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ। পাবলিক প্রসিকিউশনের আদেশে কারাবন্দি প্রায় ৭ শতাংশ। ৩ শতাংশ করে ঘুষের লেনদেন ও হয়রানি-সংক্রান্ত অভিযোগে কারাবন্দি। থানানীতি অমান্য ও শিশুকে হয়রানির অভিযোগ প্রায় ২ শতাংশের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া যৌন পেশা, অনৈতিক কাজ ও স্থান নির্ধারণের অপরাধে কারাবন্দি ১২ শতাংশ। এ ছাড়া আইসিটি, জালিয়াতি, মানি লন্ডারিংসহ ১৬ অভিযোগ ২০ শতাংশের বিরুদ্ধে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গাড়ি চালাতেন সিলেটের মোহাম্মদ আলী। কিন্তু নিয়োগকর্তার (কাফালা) অধীনে কাজ না করে নিজ দায়িত্বে অন্যত্র কাজ করার অভিযোগে ৭ মাস আগে তাকে আটক করে ডিপোর্টেশন সেন্টারে পাঠায় সৌদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মোহাম্মদ আলীর ভাগ্নে কামাল মিয়া জানালেন, তার মামা জেলখানা থেকে মাঝেমধ্যে ফোন করেন। সৌদিতে থাকা আত্মীয়স্বজনরা তাকে দেখতে গেলেও আইনি জটিলতা নিরসনে তারা কী করবেন, তা বুঝে উঠতে পারছেন না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের প্রবাসী শ্রমিকরা আদালতে সঠিক দোভাষী না পাওয়া, আইনি সহায়তা বা আইনজীবী নিয়োগে অক্ষমতা এবং নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো মারাত্মক বিচারিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। গত বুধবার ঢাকাকে কোনো পূর্বানুমতি বা তথ্য না দিয়ে দুই প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব— উভয় দেশই ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী। এই সনদ অনুযায়ী, কোনো দেশের নাগরিক বিদেশে গ্রেপ্তার হলে বন্দির অনুরোধে তার দেশের কনস্যুলার বিভাগ বা দূতাবাসকে তাৎক্ষণিক বিষয়টি জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি যথাযথ কনস্যুলার সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরই বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ৬০-৬৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কাজ করছেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রায় সাড়ে ৭ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৫৮৪ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা মোট প্রবাস আয়ের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের তথ্যমতে, কারাবন্দি বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে মাদক, চুরি, ঘুষ লেনদেন, অনৈতিক কাজ, হয়রানি, থানানীতি অমান্যকরণ, শিশুকে হয়রানি, আইসিটি আইন লঙ্ঘন, মারধর, ইকামা জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং ও ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশটিতে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার ৭৫ শতাংশই বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিক।
চারটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা— মিনা রাইটস গ্রুপ, ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস, আলকস্ট ফর হিউম্যান রাইটস ও রিপ্রিভের গত মে মাসের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে রেকর্ড ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে ১৩৮ জন বিদেশি নাগরিক (যার ১২২ জনই মাদক মামলার আসামি) এবং ৪ জন নাইজেরীয় নারীসহ মোট ৯ জন নারী ছিলেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ৩৫৬ জনে পৌঁছায়, যার মধ্যে ২৪০ জন মাদক মামলার এবং ১৮৮ জন বিদেশি নাগরিক।
যদিও সৌদি সরকারের দাবি, ২০২১ সালে তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে একটি খসড়া দণ্ডবিধি তৈরি করেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ (১ কোটি ৫৭ লাখ) বিদেশি। তবে মাদক-সংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। বিচারপ্রক্রিয়ায় দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তার সুযোগ না থাকা এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো গুরুতর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তারা।
এ সংকট উত্তরণে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের (সিএমএস) পরিচালক ড. সেলিম রেজা প্রবাসী কর্মীদের সৌদি আইনের ওপর পর্যাপ্ত ধারণা দেওয়া এবং বাংলাদেশ দূতাবাসে জনবল বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সৌদি আরব শরিয়াহ আইনে পরিচালিত হয়। কর্মীদের যদি আমরা স্থানীয় আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান দিয়ে পাঠাতে না পারি, তবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামনে আরও বাড়বে।’
২০১৩ সালের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার উইং বা শ্রমকল্যাণ শাখার স্পষ্ট দায়িত্ব— প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা করা, কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন, নিয়োগপত্র সত্যায়ন, বকেয়া বেতন আদায় এবং আইনি বিপদে পড়া প্রবাসীদের কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা প্রদান করা।
তবে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সেন্টার ফর হায়ার স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সৌদি আরবের মতো বিশাল একটি দেশে লাখ লাখ প্রবাসীর বিপরীতে দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল, লজিস্টিকস ও প্রয়োজনীয় আইনি তহবিলের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে সৌদি বিচারব্যবস্থায় বাংলা ভাষী প্রবাসীদের পক্ষে কার্যকর আইনি লড়াই চালানো বা প্রবাসীদের কাজের পরিস্থিতি নিয়মিত পরিদর্শন করা লেবার উইংয়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।



