পুরনো রূপেই ফিরতে চায় আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই আছে; কিন্তু দলটির ফিরে আসা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। মাঝেমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘আওয়ামী লীগ ইস্যু’ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এতদিন গুঞ্জন ছিল, বিকল্প নেতৃত্বে ফিরে আসতে পারে দলটি। কিন্তু এটি একেবারে গুঞ্জনই। দেশের ভেতরে-বাইরে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হওয়া গেছে, দলটির শীর্ষ পদে আপাতত কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন হচ্ছে না। নেতৃত্বে থাকছেন শেখ হাসিনাই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আন্দোলনের মুখে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলটির শীর্ষ অনেক নেতাও তখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এর ফলে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে এই রাজনৈতিক দলটি। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সংসদে বিল পাস করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রেখেছে।
গত কয়েক মাসে কখনো সাবের হোসেন চৌধুরী, কখনো আবদুল হামিদ, আবার কখনো ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, কখনো সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ এবং সর্বশেষ সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সামনে রেখে একটি ‘পরিশোধিত’ (রিফাইন্ড) আওয়ামী লীগ গঠনের গুঞ্জন তীব্র হয়। তবে দলের ভেতরকার তথ্য, ৫ আগস্ট-পরবর্তী চরম ধাক্কা সামলে উঠে দলটির হাইকমান্ড এখন সর্বস্তরে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— নেতৃত্বের কোনো পরিবর্তন নয়; বরং পুরনো অবয়ব ও চেনা নেতৃত্বেই তারা মাঠে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাবে।
দলটির সাম্প্রতিক নানামুখী তৎপরতা, অডিওবার্তা এবং নেতাকর্মীদের মনোভাব বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন— রাজনৈতিক কৌশল বা নেতৃত্বে বড় কোনো সংস্কার বা পরিবর্তনের পথে না হেঁটে আওয়ামী লীগ সেই পুরনো ঘরানার রাজনীতি ও নেতৃত্বের ওপর ভর করে ফেরার যে চেষ্টা করছে, তা কতটুকু সম্ভব, সময়ই বলে দেবে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকট কাটিয়ে উঠতে দলটিতে নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবি উঠেছিল খোদ দলের ভেতর থেকেই। অপেক্ষাকৃত তরুণ বা সংস্কারপন্থী অংশকে সামনে এনে দল গোছানোর গুঞ্জনও ওঠে একাধিকবার। দলের একটি অংশও সেরকমই চাচ্ছিল। আওয়ামী লীগের যে কয়েকজন নেতাকে নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা ছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং ক্লিন ইমেজের কারণে গুঞ্জন উঠেছিল, তিনি হয়তো একটি অন্তর্বর্তী বা সংস্কারপন্থী আওয়ামী লীগের হাল ধরতে পারেন। বিশেষ করে তার গ্রেপ্তার, তড়িঘড়ি জামিন এবং পরে কয়েকজন বিদেশি দূতের সঙ্গে নিজ বাসায় বৈঠকের খবরে সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়। আলোচনা ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে নিয়েও। পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজকে দলের নেতৃত্বে ফিরিয়ে এনে ইমেজ সংকটের অবসান ঘটানোর একটি আলোচনা তৈরি হয়। নানা গুঞ্জনের ডালপালা মেলে নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভিকে ঘিরেও। সবশেষ সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও দ্রুত জামিন ঘিরেও নানা আলোচনার ঝড় বয়ে যায় রাজনীতির আড্ডায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘রিফাইন্ড’ ফর্মুলার উদ্দেশ্য ছিল জুলাই-আগস্টের দায় এড়ানো এবং একটি গ্রহণযোগ্য অবয়ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় আসা। তবে দলের মূল নীতিনির্ধারক ও মাঠপর্যায়ের কঠোর অবস্থানের কারণে এই ফর্মুলা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সাবের হোসেন চৌধুরী, আবদুল হামিদ বা সোহেল তাজদের মতো নেতাদের সামনে এনে ‘রিফাইন্ড’ দল করার ফর্মুলাটি হোঁচট খায় প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো এখনো সম্পূর্ণভাবে শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বড় অংশের বিশ্বাস, শেখ হাসিনাকে মাইনাস করে বা দল ‘রিফাইন্ড’ করার নামে নতুন কাউকে আনলে দল খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, দলটির শীর্ষ নেতাদের ওপর যে আইনি চাপ তৈরি হয়েছে, তাতে তারা মনে করছেন, এই মুহূর্তে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এখন বড় বিষয়। এই সংকটে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুঁজি ও আন্তর্জাতিক লবিংই একমাত্র ভরসা। আর দলীয় প্রধানও কোনো সংস্কারের পক্ষে নন। ফলে সব ধরনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ এখন যে কৌশলে এগোচ্ছে, তা মূলত তাদের পুরনো ও চেনা রাজনীতিরই প্রতিফলন।
সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিওবার্তা এবং নেতাকর্মীদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রমাণ করে, দলের রিমোট কন্ট্রোল শেখ হাসিনার হাতেই রয়েছে। দলের কোনো সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বা নতুন নেতৃত্বকে এই স্পেস দেওয়া হচ্ছে না।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড মনে করছে, শেখ হাসিনার ক্যারিশমা এবং তার একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছাড়া এই মুহূর্তে দলটি ঐক্যবদ্ধ রাখা অসম্ভব। ফলে সংস্কারের সব সম্ভাবনা এক পাশে সরিয়ে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই দলের রাজনৈতিক চাল চালার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দলটির বর্তমান নীতিনির্ধারণী মনোভাব হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা মাইনাস করা, মানে দলটির অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলা। ফলে অতীতের কোনো ভুলত্রুটির আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা না করেই শেখ হাসিনার অডিওবার্তা ও দিকনির্দেশনা পুঁজি করে তারা নির্বাচনী এবং রাজপথের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে চায়। এক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের বড় কোনো ব্যর্থতার দিকে তাকিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকরা।
সূত্র আরও জানায়, ভারতে থাকা শেখ হাসিনা নিয়মিত বিভিন্ন সভা করছেন। কখনো সরাসরি আবার কখনো ভার্চুয়ালি তিনি এতে যোগ দিচ্ছেন। এসব কর্মসূচিতে কখনো দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আবার কখনো জাহাঙ্গীর কবির নানক সভাপতিত্ব করেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সভাপতিত্ব করেছেন কোনো কোনো সভায়। দেশে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করছেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও। অন্যদিকে, দলের বিতর্কিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে এখন তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। জানা গেছে, শুরুর দিকে এসব অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা দলীয় নেতৃত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানান। কিন্তু সেখানে থাকা দলের সিনিয়র নেতারা দলীয়প্রধানের এমন প্রস্তাবে সায় দেননি। তারা বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ মানে শেখ হাসিনা, আর শেখ হাসিনা মানেই আওয়ামী লীগ। দলের কোনো স্তরের নেতাকর্মীই শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগ কল্পনা করতে পারেন না।’
দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। মনোবল ভেঙে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করছেন তিনি নিজেই।
দলের সিনিয়র একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সরাসরি দলীয় প্রতীকে বড় ধরনের আন্দোলনে নামার সুযোগ সীমিত থাকায় আওয়ামী লীগ এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনকে ‘পলিটিক্যাল এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করছে। দলীয় কার্যক্রমের ওপর কড়াকড়ি থাকায় অনেক জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থী বা পরোক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের জনভিত্তি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে আগামীর সময়কে বলেছেন, বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি বা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মতো বড় ঘটনার জন্য দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো অনুশোচনা বা ভুল স্বীকার করা হয়নি। উল্টো পুরো বিষয়টিকে একটি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পুরনো রাজনৈতিক লাইনেই হাঁটছে। গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেওয়া আওয়ামী লীগ শেষ সময়ে ফ্যাসিস্ট রূপে আবির্ভূত হয়। নতুন প্রেক্ষাপটে দলের এই বিপর্যয়ের জন্য দোষীদের সরিয়ে রাখা উচিত। মানুষের মনস্তত্ত্বে যে বড় পরিবর্তন এসেছে, সেখানে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু— সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আওয়ামী লীগের এই পুরনো ধারার রাজনীতিতে ফেরার কৌশলকে বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। বলেছেন, তাদের ফিরতে হলে ভুলত্রুটি শুধরিয়ে আইনি বিষয়গুলো মোকাবিলা করেই ফিরতে হবে।






