ছয় দফা থেকে সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিছু নাম শুধু ব্যক্তি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেননি, তারা হয়ে উঠেছেন সময়ের প্রতীক। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই এক নাম। ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিন, ছয় দফার সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি, বিরোধীদলের আন্দোলন, জেল-জুলুম ও দীর্ঘ সংসদীয় জীবনের বহু বাঁক অতিক্রম করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির জীবন্ত ইতিহাসের অংশ। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে যেন আরেকটি পুরনো অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
১৯৪৩ সালে ভোলায় জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ছাত্রজীবন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) সেসময় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক চেতনার প্রাণকেন্দ্র। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ হচ্ছিল ক্রমেই সংগঠিত। এই পরিবেশেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তোফায়েল আহমেদ। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পরিচিতি পান ছাত্রসমাজের পরিচিত মুখ হিসেবে।
ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক মুক্তির দাবিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে আখ্যা দিলেও বাঙালি জনগণ এটিকে নিজেদের মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে। সেই আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে যেসব তরুণ নেতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি রাজপথে আন্দোলন করেছেন, মিছিল-সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হাজারো দমন-পীড়নের মুখেও পিছিয়ে যাননি।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে যখন পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল, তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের মধ্যে তোফায়েল আহমদ ছিলেন সামনের সারিতে। সে সময় ছাত্রনেতাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পাকিস্তানি সামরিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানই পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তিকে দৃঢ় করে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তোফায়েল আহমেদ জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতাকর্মীদের মতো তোফায়েল আহমেদও স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যে প্রজন্ম জীবন ও ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছিল, তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার গুরুত্ব আরও বাড়ে। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পান। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বহুবার। মন্ত্রিসভায়ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। শিল্প ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিয়েছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিরোধীদলের কঠিন বাস্তবতাও।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা সংকটকালও খুব কাছ থেকে দেখেছেন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতো তাকেও কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। সামরিক শাসনের সময় বিরোধী রাজনীতির কারণে জেল-জুলুম, মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সক্রিয় সদস্য। সব মিলিয়ে রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
তার রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ, তবে একেবারে বিতর্কহীন নয়। বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতায় ক্ষমতা, দলীয় দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। তবু সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক, যিনি আন্দোলনের রাজনীতি থেকে উঠে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
সংসদে তার বক্তব্য, রাজনৈতিক ভাষা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। পুরনো প্রজন্মের রাজনীতিকদের মধ্যে তার মধ্যে ছিল আন্দোলনের রাজনীতির ছাপ। বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর ও কৌশলভিত্তিক রাজনীতির তুলনায় তার প্রজন্ম ছিল অধিকতর মাঠকেন্দ্রিক। মিছিল, পোস্টার, ছাত্রসমাবেশ ও রাজপথের উত্তাপের মধ্য দিয়েই তাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে তোফায়েল আহমেদের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের মানুষ, যারা পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে বড় মনে করতেন। রাজনীতিকে তারা দেখতেন জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে। সময় বদলেছে, রাজনীতির ভাষা বদলেছে, কিন্তু সেই প্রজন্মের স্মৃতি এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তার মৃত্যুতে শুধু একজন প্রবীণ নেতার বিদায় হননি, বিদায় নিয়েছে ছয় দফার সংগ্রামী প্রজন্মের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়।




