আমাদের প্রিয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

সায়ীদ স্যারের সত্তা জুড়ে শিক্ষকতা। ঘরে বাইরে সর্বত্র তার শ্রেণি কক্ষ। আড্ডা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান পাঠচক্র, শ্রেণিকক্ষ-যেখানেই তিনি থাকেন সেখানেই শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। যে কোনো কাজেও স্যারের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে। স্যার প্রথমে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সব শোনেন। তারপর তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা করেন। এরপর স্যার মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। এবং গল্পচ্ছলে শিক্ষার্তীকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছে আমার অপরিসীম ঋণ। আমি গরিব পরিবারে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতৃব্য হাবীবুর রহমান। বাবা সামান্য চাকুরে। কিন্তু আমাদের স্যাঁতস্যাঁতে পুরান ঢাকার বাসায় কিছু কিছু বইয়ের সম্ভার ছিল। বাবা বই পড়তেন। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্যাতা ছোটবেলা থেকেই বই পাঠ করতেন আনন্দের সঙ্গে। আমাদের সবচেয়ে বড় ভাই (চাচাত) হুমায়ুন কবীর। তিনি আমাদের বইয়ের জগৎ সম্পর্কে স্কুলজীবনেই আলোর বাতিঘর খুলে দেন।
আমাদের লালবাগে আজাদ মুসলিম লাইব্রেরি এবং গ্রন্থবিতান পাঠাগার আমাদের পাঠক্ষুধা কিছুটা মেটায়। সেই শৈশবে আমরা গোগ্রাসে যা পেতাম তাই পড়তাম। বাংলা ভাষার সেরা লেখকদের সঙ্গে তখনই পরিচয়।
এক
৭১ এ আমরা ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। সায়ীদ ষ্যারের সঙ্গে টেলিভিশনের পর্দায় পরিচয় থাকলেও ক্লাসরুমের পরিচয় আমাদের জবিনকে পাল্টে ছিল। ইন্দিরা রোডের কেন্দ্রের লাইব্রেরি থেকে বিস্মিত হলাম। বন্ধু আহমাদ মাযহার অনার্সে সায়ীদ স্যারের ছাত্র হওয়ার সুবাদে বেশি নৈকট্য অর্জন করে। মাযহার কেন্দ্রের একজন কর্মী হিসাবে জীবনের পথ খুঁজে নেয়। ৮৭ সালের দিকে কেন্দ্র স্কুল ও কলেজ কর্মসূচির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পত্রিকা বের করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারই ধারাবাহিকতায় এক বিকেলে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন আমাকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হলেন। সায়ীদ স্যারের সঙ্গে দীর্ঘ মিটিং হলো। স্যার চাচ্ছেন উৎকর্ষ ধর্মী একটি পত্রিকা। অর্থাৎ আনন্দময় শিক্ষামূলক লেখার মাধ্যমে ছোটদের আগ্রহ সৃষ্টি করা। স্যার নাম দিলেন ‘আসন্ন’। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পত্রিকার লোগো করে দিলেন হাশেম খান। ভেতরের ছবি আঁকবেন। পত্রিকা বেরুবেÑতাই কম্পিউটার সেকশন স্থাপন করা হলো। ‘আসন্ন’ এর প্রথম সম্পাদক লুৎফর রহমান রিটন, সহকারী সম্পাদক আমি, প্রকাশক হিসেবে আহমাদ মাযহার এবং প্রধান সম্পাদক হিসাবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নাম।
দুই সংখ্যা পরেই ‘আসন্ন’ মাসিক হলো এবং সম্পাদনার কাজ করতে লাগলাম আমি। লুৎফর রহমান রিটন তখন অন্যত্র কাজ নিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু কেন্দ্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়ে যায়। প্রতি বিকেলে তিনি কেন্দ্রের ছাদ ফাটিয়ে আড্ডা দিতেন।
দুই
আমি এর লেখা বাছাই করতে গিয়ে আমি শিশুসাহিত্যের বৃহত্তর জগতের সঙ্গে পরিচিত হলাম। স্যার বইকেনার ব্যাপারে ছিলেন উদার হস্ত। প্রতি সপ্তাহে আমি আর মাযহার শিশু-কিশোর উপযোগী নানা ধরনের বই কিনতাম। নীলক্ষেত পুরানা বইয়ের বাজার থেকে বই সংগ্রহ করতাম। আসন্নের লেখার প্রাথমিক বাছাই আমরা করতাম। তারপর স্যার সম্পাদনা করে দিতেন। তখন ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছিÑসম্পাদক হিসাবে কতটা নিষ্ঠাবান ও সঠিক। তখনই বুঝেছি ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদনার মাধ্যমে ষাট দশকের সাহিত্য আন্দোলনকে কিভাবে তারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নিরন্তর সাহিত্য পাঠে স্যার এখনো সজীব। ক্লাসিক বই তিনি প্রায় সবই পড়েছেন। পড়া মানে প্রায় মুখস্থ। বইয়ের মূল বিষয় তিনি অনর্গল বলে যেতে পারেন। আশ্চর্য স্মৃতিধর ব্যক্তি তিনি। আসন্নের বাছাইকৃত লেখা নিয়ে তার সহজাত রসিক মন্তব্য থেকেই আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতাম। কোনো কোন লেখা কেন ভালোÑ শিল্পতত্বের জটিল সব ব্যাখ্যা তিনি খুব সরলভাবে বুঝিয়ে দিতেন। কেন্দ্রের বই প্রকাশনার সূচনা লগ্নে আমরা ছিলাম স্যারের সঙ্গে। বই বাছাই, বই সম্পাদনার মুল সূত্রগুলো আমরা শিখি সায়ীদ ষ্যারের সান্নিধ্যে। স্যার কখনো শেখানোর জন্য শেখাতেন না। কৌতুক ও পরিহাসের মাধ্যমেও আমরা স্যারের কাছ থেকে অনেককিছু শিখেছি। আমার সাংস্কৃতিক শুরুটিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় স্যারের কল্যাণে। স্যার কারো স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মামা ঘামাতেন না। কথা বলে বুঝে যেতেনÑ সে কোন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে এসেছে। স্যার খুব প্রভাববিস্তারী শিক্ষক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা সবাই শুনে থাকে। আমরাও তার ‘জ্যোৎস্নার মতো কথা’ শুনে তরুণ বয়স থেকে আজ পর্যন্ত হেঁটে চলেছি। এ আমাদের অপরিসীম ভ্রমণ।
আমরা যে সায়ীদ স্যারের কালে জন্ম নিয়েছি এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর তার নৈকট্যে আছি এ আমাদের পরম সৌভাগ্য।
তিন
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরি আমাকে বড় জগতের সন্ধান দেয়। আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শিক্ষা দেন উন্নত রুচি ও সুন্দর হতে পেরেছিলাম বলে একটা সুন্দর ও আনন্দময় ঝবিন কাটিয়ে দিলাম। বইপাঠ ও শিমুসাহিত্য চর্চাÑ এই চর্চা করেই কেটে গেল আমাদের জীবন। জীবনের আনন্দ, উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যÑসব মিলিয়ে অনিন্দ্য জীবনকে আমর্ াউপভোগ করেছি সায়ীদ স্যারের কল্যাণে। সকলের মিলিত শক্তি নিয়ে কাজ করতে হয়। স্যার সকলের সম অধিকারে বিশ্বাসী। সবাই বই পড়ুক। সবাই আলোকিত মানুষ হোক। সায়ীদ স্যার তার জীবন সাধনা করেছেন এই ব্রত নিয়ে। শিক্ষক সায়ীদ স্যারের মহিমা কীর্তন করে শেষ করা যাবে না। আমাদের শিক্ষাজীবন ঢাকা কলেজ বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই আমাদের শিক্ষালয় আসলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই আমাদের হৃদয়ে আলো ছড়িয়েছে। কেন্দ্রের কারণে তারুণ্যেই অনেক বিখ্যাত মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। কারও কারও সঙ্গে ঘনিষ্ঠও হয়েছিলাম। শিল্পী কামরুল হাসান, কবি আহসান হাবীব, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা, মুস্তাফা মনোয়ার, নির্মলেন্দু গুণ, হাশেম খান, রাহাত খান, শিবনারায়ণ রায়, আবেদ কান, মেয়র আনিসুল হক, মামুনূর রশিদ, ড., আনিসুজ্জামান, ফাহমিদা মজিদ, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, আবদুশ শাকুর, রফিক আজাদ, সুকুমার বড়ুয়া, ফয়েজ আহমদ, শিক্ষাবিদ আহমেদ শরীফÑ আরও কতজনের নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের কত বিদ্বৎজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি। এ সবই আমাদের জীবনের বড় অর্জন।
শিক্ষক বলতে আমরা সায়ীদ স্যারকে বুঝি। স্যার আপনি ভালো থাকবেন। কর্মক্ষম থাকবেন।
চার
একদা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সারা দিন থাকতাম। লিখতাম, লেখাপড়া করতাম। আড্ডা দিতাম। দুপুর কেন্দ্রের ক্যাফেতে যেতাম। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আড্ডা চলতো। হইচই করতাম। যৌবনের সোনালি দিনগুলো ফেলে এসেছি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চত্বরে। কেন্দ্রর কাছ থেকেই সকল শিক্ষা আহরণ করেছি। কিভাবে অনুষ্ঠান করতে হয় কিভাবে টিভি প্রডাকশন নির্মাণ করতে হয়, কিভাবে খাবার বিতরণ করতে হয়। সবাই মিলি কিভাবে একসঙ্গে একত্রিত হতে হয়-সবই শিখেছি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কাছ থেকে। সায়ীদ স্যার মিটিং করে কিংবা গল্প করে কতকিছু যে শিখিয়েছেন তার কোনো হিসাব নাই। আর কতকিছু যে তার কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারিনি তার হিসাবও অনেক দীর্ঘ। স্যারের মতো পরিশুদ্ধ কথা শিখিনি। স্যারের মতো মিষ্টি বক্তৃতা দেয়া শিখলাম না। স্যারের মতো সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রিয়মুখ হতে পারিনি। স্যারের মতো বিপুল গ্রন্থপাঠ করা হলো না। স্যারের মতো কবিতার বিপুল জগতে পরিভ্রমণ করা হলো না। ক্ল্যাসিকাল সাহিত্য ও দর্শন স্যারের মতো জানা হলো না। স্যারের মতো ধীরস্থির শান্তসৌম ও স্থিতিশীল হতে পারিনি। পায়জামা পাঞ্জাবি পরার মতো ব্রত আমরা ধারণ করতে পারিনি। স্যার অতি তরুণ প্রজন্মের সঙ্গেও সহজভাবে মিশতে পারেন। আমরা পারি না। স্যার দৈর্যহারা হন না। আমরা সেটা পারি না। স্যার হাসিমুখ নিয়ে সবার সাথে সহজে মিশতে পারেন আমরা পারি না। আমর া অনেক অস্থির ও চঞ্চল। স্যার আমাদের মতো তাড়াহুড়ো করে কাজ করেন না।
তাই বলি স্যারের কাছ থেকে গ্রহণ করার পাল্লা অনেক হালকা। তবে যা পেয়েছি তার জন্য আমাদের আনন্দের সীমা নাই।







