ফুটবল, স্বীকৃতি ও অপমানের ব্যাকরণ
ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হারলে আমরা আসলে কাকে হারাতে চাই?

বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার রয়েছে প্রচুর সমর্থক। ছবি: সংগৃহীত
ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হারলে বাংলাদেশে শুধু একটি ফুটবল দল হারে না। হারে আমাদের বন্ধুর দল, ভাইয়ের দল, মা-বোনের দল, স্ত্রী-প্রেমিকার দল, পাড়ার দল, শৈশবের দল, রাত জাগা স্মৃতির দল। তাই খেলার পর ঠাট্টা হবে, খোঁচা হবে, মিম হবে— এটাই স্বাভাবিক। ফুটবল আবেগের খেলা; প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া তার রসও অনেকটা কমে যায়।
কিন্তু কখনো কখনো হাসির চরিত্র বদলে যায়। ঠাট্টা আর খেলার ভেতরে থাকে না, হয়ে ওঠে অপমানের উৎসব।
ব্রাজিল হারলে কিংবা আর্জেন্টিনা হারলে আমরা দেখি, একজন সমর্থককে আর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সে হয়ে যাচ্ছে ‘ওরা’। তাকে বলা হচ্ছে— লুকিয়ে থাক, মুখ দেখাস না, ফেসবুকে আসিস না। পুরোনো পোস্ট খুঁড়ে বের করা হচ্ছে, যেন আদালতে প্রমাণ হাজির করা হচ্ছে। তার কষ্টকে মজা বানানো হচ্ছে, কান্না মাপা হচ্ছে। ফুটবলীয় পরাজয়কে বানানো হচ্ছে পৌরুষ হানি, বংশগত অপমান, ‘জাত’ বিচার, এমনকি প্রতীকী জানাজা।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই শুধু ফুটবল নিয়ে হাসছি? নাকি অন্যকে অপমান করে এক ধরনের ‘আমরা’ তৈরি করছি?
এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ট্রলিং কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়। এটিকে হিন্দু-মুসলিম সহিংসতা, পোগ্রম বা সংখ্যালঘু নিপীড়নের সঙ্গে এক করে দেখা বিপজ্জনক সরলীকরণ। কিন্তু এক না হলেও তুলনা করা যায়। কারণ ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রেও কিছু ভাষা ও মনস্তত্ত্ব ঘুরেফিরে আসে: ‘ওরা’, ‘ওদের প্রাপ্য’, ‘ওরা কথা বলার যোগ্য নয়’, ‘ওদের কাঁদতে দেখে শান্তি।’
এই ভাষাটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি একে বলব অপমানের ব্যাকরণ।
এই ব্যাকরণকে একেবারে নিরীহ ভাবার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ঘিরে সংঘর্ষ, আহত হওয়া, পুলিশি হস্তক্ষেপ, পতাকা টাঙাতে গিয়ে দুর্ঘটনা এবং গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের নানা খবর বহু বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২২ বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশি অনলাইন সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় ২৩টি বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু, ৩৫টি হাসপাতালে ভর্তি এবং ৪৫টি আহত হওয়ার ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছিল। এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে ২৩ জন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন, ঘটনাগুলোর কারণ ছিল ভিন্ন। এই পার্থক্য জরুরি। কিন্তু অতিরঞ্জন বাদ দেওয়ার পরও একটি সত্য থেকে যায় : আমাদের ফুটবলীয় পরিচয় কখনো কখনো সামাজিকভাবে কার্যকর, এমনকি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন নিছক খেলা নয়। এটি বহু পরিবারের উত্তরাধিকার, পাড়ার পরিচয়, কৈশোরের স্মৃতি, টিভির সামনে রাত জাগা, পতাকা, জার্সি, পেলে-ম্যারাডোনা-মেসি-নেইমারের গল্প। দূরের দেশ দুটি আমাদের সামাজিক জীবনে এসে স্থানীয় হয়ে গেছে। তাই একজন বাংলাদেশি সমর্থক যখন বলে ‘আমরা জিতেছি’, প্রশ্ন ওঠে— এই ‘আমরা’ কারা?
এই ‘আমরা’ ধার করা, কিন্তু মিথ্যা নয়। এটি এক ধরনের কল্পিত আত্মীয়তা, ধার করা ফুটবলীয় সার্বভৌমত্ব। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা জিতলে আমরা নিজেদের বড় মনে করি, হারলে প্রতিপক্ষ সমর্থকেরা আমাদের ছোট করতে চায়। দূরের এগারোজন মানুষের জয় আমার আত্মমর্যাদা বাড়ায়, আর তাদের হার যেন পাশের বন্ধুকে আমাকে অপমান করার অধিকার দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। আগে বাংলাদেশিরা দূরের দলকে ভালোবাসত, এখন দূরের সেই দলও কখনো কখনো ফিরে তাকাচ্ছে। আর্জেন্টিনার দূতাবাস ঢাকায় ফিরে এসেছে, তাদের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বাংলাদেশি সমর্থকদের ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা বাংলাদেশি সমর্থকদের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ব্রাজিলের আলিসন বেকারও বাংলাদেশি সমর্থকদের ভিডিয়ো দেখে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, আমরা শুধু তাদের দেখি না, তারাও কখনো কখনো আমাদের দেখে।
এই স্বীকৃতি আনন্দের। এতে আন্তঃদেশীয় ভালোবাসা, কূটনীতি, কৌতূহল, সম্মান— সবই আছে। কিন্তু স্বীকৃতির আরেক দিকও আছে। যখন দূরের দল আমাদের দেখে, তখন আমাদের সমর্থক পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়। জয় আরও আপন লাগে, হারও আরও ব্যক্তিগত। আমি একে বলব স্বীকৃতি ধার করা, সার্বভৌমত্ব— দূরের দলের গৌরব আমি ধার করছি, কিন্তু এবার সেই দূরের দলও যেন আমার উপস্থিতি স্বীকার করছে।
এখানেই ফুটবল শুধু ফুটবল থাকে না। এটি হয়ে ওঠে পরিচয় ও মর্যাদার রাজনীতি।
আর এই মর্যাদার রাজনীতি গভীরভাবে জেন্ডারড। শুরুতেই বলেছি— ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা আমাদের মা-বোনের দল, স্ত্রী-প্রেমিকার দলও। নারীরা এখানে পূর্ণাঙ্গ সমর্থক, আবেগের অংশীদার, স্মৃতির নির্মাতা। অথচ অপমানের মুহূর্তে সেই নারীই আবার পুরুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষকে ছোট করতে তার মা, বোন, স্ত্রী বা প্রেমিকাকে টেনে আনা হয়, পুরুষ সমর্থককে ‘মেয়ে’ বানিয়ে অপমান করা হয়, কান্নাকে নারীত্বের প্রমাণ ধরা হয়, পরাজয়কে যৌন অধীনতার ভাষায় প্রকাশ করা হয়।
অর্থাৎ, নারী একই সঙ্গে ফুটবলের সমর্থক এবং ফুটবলীয় অপমানের কাঁচামাল।
এখানে পরাজিত পুরুষকে শুধু বলা হচ্ছে না যে তার দল খারাপ খেলেছে। তাকে বলা হচ্ছে— তুমি যথেষ্ট পুরুষ নও। আর ‘নারী’কে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই অপুরুষত্বের প্রতীক হিসেবে। ফলে ট্রলিংয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি পুরোনো সামাজিক সমীকরণ : পুরুষত্ব মানে জয়, নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য; নারীত্ব মানে দুর্বলতা, কান্না ও পরাজয়। ফুটবলের মিম তখন আমাদের সমাজের জেন্ডার-ব্যবস্থার ক্ষুদ্র আয়না হয়ে ওঠে।
আর এখানেই আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়টি : অনেক সময় আমাদের নিজের জয় যথেষ্ট নয়, আমাদের অন্যের কষ্টও দেখতে হয়।
‘কই গেলি?’
‘অনলাইনে আয়।’
‘আরও কান্না কর।’
‘আজ ফেসবুকে আসিস না।’
এগুলো নিছক বিজয়ের ভাষা নয়। এখানে প্রতিপক্ষের পরাজয় যথেষ্ট নয়; তাকে দৃশ্যমানভাবে কষ্ট পেতে হবে। তাকে জানতে হবে যে আমরা তার কষ্ট দেখছি।
এক অর্থে আমরা তখন খেলা দেখি না; আমরা পরাজিত মানুষ দেখি।
এই আনন্দকে বলা যায় শাস্তিমূলক দর্শকত্ব। অন্যের কষ্ট একটি দ্বিতীয় ম্যাচ হয়ে ওঠে। প্রথম ম্যাচটি মাঠে শেষ হয়; দ্বিতীয় ম্যাচটি শুরু হয় ফেসবুকে।
আমাদের সামাজিক মাধ্যমে যে ভাষা দেখা যায়, তা তাই শুধু মজা নয় : কাউকে শিশুসুলভ করা, নারীকরণ করা, পুরুষত্ব নিয়ে আঘাত করা, বংশ টানা, ‘বাপ’ ডাকা, জানাজা-কবরের মিম বানানো, পুরোনো পোস্ট তুলে বিচার বসানো, ট্যাগ করে জনসমক্ষে হাজির করা। সবাই হয়তো একটি করে ইমোজি দেয়, একটি করে কমেন্ট করে, একটি করে মিম শেয়ার করে। কিন্তু লক্ষ্যবস্তুর কাছে তা একসঙ্গে এসে দাঁড়ায় ভিড়ের মতো।
এটাই আজকের ডিজিটাল ভিড়— এক জায়গায় নেই, কিন্তু একসঙ্গে আঘাত করে।
আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বাক্যটি হলো : ‘মজা করলাম।’
এই বাক্য দিয়ে আমরা প্রায় সবকিছু বৈধ করে ফেলি। অপমান করলাম, তারপর বললাম মজা। কাউকে জনসমক্ষে ছোট করলাম, তারপর বললাম সিরিয়াসলি নিও না। কারও কষ্টকে বিনোদন বানালাম, তারপর বললাম ফুটবলই তো। এই ‘মজা করলাম’ অনেক সময় নিষ্ঠুরতার নৈতিক বীমা— আঘাত করার ক্ষমতাও রাখলাম, আবার নির্দোষ থাকার দাবিও ছাড়লাম না।
এখানে কেউ হয়তো বলবেন, এ আর নতুন কী—’হুজুগে বাঙালি’। কিন্তু এই ব্যাখ্যাও বিপজ্জনকভাবে সহজ। ‘বাঙালি এমনই’ বলা কোনো বিশ্লেষণ নয়। বরং ‘হুজুগে বাঙালি’ কথাটিকেই প্রশ্ন করা দরকার। কে কাকে হুজুগে বলেছে? ঔপনিবেশিক শাসক? শিক্ষিত ভদ্রলোক? শহুরে মধ্যবিত্ত? জনতার উচ্ছ্বাসকে কে কখন বিশৃঙ্খলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে?
নীরদ সি. চৌধুরীকে এখানে স্মরণ করা যায়, কিন্তু সাবধানে। বাঙালি সমাজ সম্পর্কে তাঁর কঠোর সমালোচনা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, চিন্তাও জাগাতে পারে। কিন্তু তাঁকে দিয়ে ‘বাঙালি চরিত্রের’ চূড়ান্ত রোগনির্ণয় করানো যাবে না। কারণ যে দৃষ্টি জনতাকে বিচার করে, সেই দৃষ্টিরও ইতিহাস আছে— ঔপনিবেশিকতা, শ্রেণি, ভদ্রলোকি আত্মপরিচয় এবং এলিট উদ্বেগের ইতিহাস।
বাংলাদেশের ইতিহাস জনতা ছাড়া বোঝা যায় না। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, শাহবাগ, জুলাই— সবখানেই জনতার শক্তি আছে। তাই জনতাকে ভয় করাই সমাধান নয়।
প্রশ্ন হলো : কোন জনতা ন্যায় দাবি করে, আর কোন জনতা শিকার খোঁজে?
ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হারলে আসলে শুধু একটি দল হারে না। আমরা নিজেদেরও পরীক্ষা দিই। অন্যের পরাজয় দিয়ে আমরা কী ধরনের ‘আমরা’ বানাচ্ছি?
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাই স্কোরলাইন নয়।
প্রশ্ন হলো, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হারলে আমরা আসলে কাকে হারাতে চাই?
একটি সমাজকে শুধু সে কাকে ভালোবাসে তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করা যায়— সে ‘মজা করলাম’ বলে কতখানি নিষ্ঠুরতাকে অনুমতি দেয়।
লেখক, কবি ও নৃবিজ্ঞানী




