একটি শিল্প যা গড়ে ওঠেনি, শুধু বেড়েছে
- বাংলাদেশের আইটি খাত
- সম্ভাবনার গল্প নাকি নীতিগত ব্যর্থতার কেস স্টাডি?

ইনসেটে লেখক
বিগত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আখ্যানে একটি শব্দবন্ধ খুব নিয়মিত শোনানো হয়েছে— ‘আইটি খাতের অপার সম্ভাবনা’। প্রতিবছর রপ্তানি বৃদ্ধির গ্রাফ আর ফ্রিল্যান্সারদের সাফল্যের গল্প দিয়ে এই খাতকে একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে হাজির করা হয়। কিন্তু এই সুনিপুণ বর্ণনার আড়ালে একটি মৌলিক শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে: আমরা প্রবৃদ্ধিকে ‘শিল্পায়ন’-এর সমার্থক ধরে নিয়েছি।
বাস্তবতা হলো, দুই দশকেও বাংলাদেশে আইটি খাতের কোনো পূর্ণাঙ্গ শিল্প-কাঠামো গড়ে ওঠেনি। যা তৈরি হয়েছে, তা হলো কিছু বিচ্ছিন্ন ফ্রিল্যান্সার, গুটিকয়েক ছোট আউটসোর্সিং ফার্ম এবং একটি সীমিত দেশীয় সফটওয়্যার বাজারের যান্ত্রিক সমষ্টি। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি কোনো ‘শিল্প’ নয়; এটি মূলত একটি খণ্ডিত সেবা সংগ্রাহক অর্থনীতি। এখানে সংখ্যা বা স্কেল আছে, কিন্তু কোনো সুদৃঢ় কাঠামো নেই; ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ আছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নেই। সহজ কথায়, আমাদের আইটি খাতটি আসলে গড়ে ওঠেনি, এটি শুধু অবয়বে বেড়েছে।
শিল্প কৌশলের পরিবর্তে ‘প্রশিক্ষণভিত্তিক’ ভ্রান্তি
যেকোনো খাতের টেকসই বিকাশের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত শিল্প কৌশল। কিন্তু বাংলাদেশের আইটি নীতির সবচেয়ে বড় গলদ হলো, এটি কখনোই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে সাজানো হয়নি। বরং একে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে সস্তা ‘মানবসম্পদ উৎপাদন প্রকল্পে’।
ফলাফল হিসেবে আমরা এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তথাকথিত ‘দক্ষ জনশক্তি’ তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই দক্ষতাকে ধারণ করার মতো কোনো অর্থনৈতিক শোষণ-কাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিক বাজার তৈরি করতে পারেনি। বিশ্ব যখন সফটওয়্যার প্রোডাক্ট ইকোনমি, সফটওয়্যার অ্যাস এ সার্ভিস, এবং এআই-চালিত সেবার দিকে ধাবিত হচ্ছে, বাংলাদেশ তখনো ‘টেইনিং-হেভি কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি-লাইট’ মডেলে বুঁদ হয়ে আছে। এটি প্রযুক্তির অভাব নয়, এটি মূলত আমাদের ‘পলিসি ডিজাইন’-এর এক চরম ব্যর্থতা।
ফ্রিল্যান্সিং: কর্মসংস্থান বৃদ্ধির এক পরিসংখ্যানগত বিভ্রম
সরকারি ও বেসরকারি প্রচারণায় ফ্রিল্যান্সিংকে একটি জাদুকরি কর্মসংস্থান মডেল হিসেবে জমকালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর ভেতরের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেশ রূঢ়। ফ্রিল্যান্সিং আসলে একটি বৈশ্বিক অনিশ্চিত বাজারের ওপর ব্যক্তির একাকী লড়াই। যেখানে আয়ের প্রবাহ অস্থিতিশীল, চুক্তিগুলো সাময়িক এবং প্রতিযোগিতা চরম মাত্রায় বৈরী। একে কোনোভাবেই ‘কাঠামোগত কর্মসংস্থান’ বলা চলে না; বরং এটি একটি ‘গ্লোবাল ইনফরমাল লেবার এক্সপোজার মডেল’ বা বৈশ্বিক অনানুষ্ঠানিক শ্রমের উন্মুক্ত বাজার। ফলে কাগজে-কলমে যখন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জয়ধ্বনি শোনানো হয়, তখন আড়ালে থেকে যায় এই চাকরির গুণগত মান এবং পেশাদারি নিরাপত্তার চরম অনিশ্চয়তা।
প্রোডাক্ট ইকোনমির অনুপস্থিতি: সবচেয়ে বড় হারানো সুযোগ
একটি দেশের আইটি খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি ও সার্বভৌমত্ব আসে তার ‘প্রোডাক্ট ইকোনমি’ থেকে— যেখানে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি হয়, পেটেন্ট বা মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা বৈশ্বিক বাজারে স্কেল করে।
বাংলাদেশ এই মূল স্তরে প্রবেশ করতেই ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের পুরো আইটি অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ‘সার্ভিস আর্বিট্রাজ’ বা সস্তা শ্রমের মধ্যস্থতার ওপর। অর্থাৎ, উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের শ্রমের দাম কম, আমরা শুধু সেই কম দামটুকুই বিক্রি করছি। এর ফলে একটি ঐতিহাসিক দাসত্ব তৈরি হচ্ছে— বাংলাদেশ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, অন্যের হয়ে কোডিং করছে, কিন্তু প্রযুক্তির মালিকানা তৈরি করতে পারছে না। অথচ এই ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির মালিকানাই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নির্ধারণ করে।
বৈশ্বিক মানচিত্র: যেখানে অন্যরা শাসক, আমরা সেখানে পরিযায়ী
একই সময়ে যাত্রা শুরু করে আমাদের প্রতিবেশীরা কোথায় গেছে, তা দেখলেই আমাদের স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত শুধু সস্তা শ্রম দেয়নি, তারা টিসিএস বা ইনফোসিসের মতো টেক জায়ান্ট তৈরি করেছে যা আজ বৈশ্বিক করপোরেট চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। ফিলিপাইন বৈশ্বিক বিপিও শিল্পে নিজেদের একচ্ছত্র দুর্গ বানিয়েছে। আর ভিয়েতনাম দ্রুত নিজেদের রূপান্তরিত করেছে হাই-অ্যান্ড সফটওয়্যার আউটসোর্সিং হাবে।
তাদের তুলনায় বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় মূলত নিম্ন-মূল্যের এবং প্রাথমিক স্তরের ডেটা এন্ট্রি বা ক্লারিক্যাল টাস্ক মার্কেটেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের একদম নিচের স্তরে আমাদের এই আটকে থাকা প্রমাণ করে, আমাদের নীতিনির্ধারকেরা সমুদ্রের সন্ধান না করে শুধু জোয়ারের পানিতে পা ভিজিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন।
আর্থিক অবকাঠামোর অদৃশ্য কর ও ডিজিটাল আস্থার সংকট
আইটি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতক হলো ‘ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রিকশন’ বা আর্থিক লেনদেনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বৈদেশিক আয় দেশে আনা, ব্যাংকিং অনুমোদন, কর কাঠামোর অসামঞ্জস্য এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল নীতিমালার কারণে এখানে ব্যবসা করার খরচ অনেক বেশি। উন্নত বিশ্বে যেখানে লেনদেন এবং চুক্তি হয় প্রায় স্বয়ংক্রিয় ও তাৎক্ষণিক, বাংলাদেশে সেখানে প্রক্রিয়াগত অনিশ্চয়তাই উদ্যোক্তাদের প্রধান ব্যবসায়িক ঝুঁকি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ডিজিটাল আস্থার সংকট’। অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন কার্যক্রম, বিশেষ করে অনলাইন জুয়া, ক্রিপ্টো স্ক্যাম এবং বিভিন্ন প্রতারণামূলক নেটওয়ার্কের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ডিজিটাল সুনামের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বড় ক্লায়েন্টরা বাংলাদেশকে একটি ‘উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, যা সরাসরি বড় বড় বিদেশি চুক্তির প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে।
এআই শিফট: দরজায় কড়া নাড়ছে কাঠামোগত বিলুপ্তি
সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি বিশ্ব জুড়ে শ্রমবাজার পুনর্গঠনের একটি নিষ্ঠুর শক্তি। বাংলাদেশ এতদিন যে ‘লো-স্কিল আউটসোর্সিং মডেল’-এর ওপর ভর করে গর্ব করত, এআই ঠিক সেই জায়গাটাতেই সরাসরি আঘাত হেনেছে।
বেসিক কনটেন্ট রাইটিং, প্রাথমিক গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং সাধারণ কোড ডিবাগিং— যে কাজগুলো আমাদের সিংহভাগ ফ্রিল্যান্সাররা করেন— সেগুলো এখন এআই দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ফ্রিতে করা সম্ভব। এর অর্থ অত্যন্ত ভয়াবহ: বাংলাদেশের আইটি খাত শুধু প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে না, বরং এটি খুব দ্রুত একটি কাঠামোগত অপ্রয়োজনীয়তার ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির মুখোশে নীতিগত দেউলিয়াত্ব
দিনশেষে, বাংলাদেশের আইটি খাতের মূল সমস্যাটি আমাদের সক্ষমতা বা মেধার অভাব নয়; সমস্যাটি হলো এর ‘ডিজাইন’ বা নকশাগত ব্যর্থতা। একটি শিল্প তখনই সত্যিকার অর্থে মাথা তুলে দাঁড়ায়, যখন রাষ্ট্র সেটিকে একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড ইকোনমিক সিস্টেম’ বা সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পনা করে। যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত, কর নীতি এবং শিল্প কৌশল একই সূত্রে গাঁথা থাকবে। বাংলাদেশে সেই মহাকাব্যিক সমন্বয়টি কখনোই ঘটেনি।
তাই প্রচারণার আলো আর জমকালো উৎসবের আড়ালে বর্তমান বাস্তবতাটি অত্যন্ত নির্মম ও সরল: আমাদের আইটি খাতটি কোনো সফলতার গল্প নয়; এটি আসলে একটি কাঠামোগত নীতিগত ব্যর্থতা, যা এতদিন প্রবৃদ্ধির চটকদার মুখোশ পরে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
লেখক: সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট, আইওয়েস্টনট সিস্টেমস, কানাডা




