আশার বাজেট, চাপের জীবন
- তিন বাম দলের প্রতিক্রিয়া

জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা যেন একদিকে সংখ্যার বিশালতা আর অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নের টানাপোড়েন। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই নতুন অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে বামপন্থী তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র দাঁড়ায়—বড় অঙ্কের হিসাব আছে, কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগও সমানভাবে গভীর।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেছেন, এই বাজেটে ‘আশাবাদ আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার শিক্ষা নেই।’ তার ভাষায়, বাজেটের অর্থসংস্থান কাঠামো পুরনো ধারাতেই আটকে আছে—ধনীদের প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, ব্যাংক ঋণ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, এই বিশাল ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে, বিশেষ করে যখন ঋণের সুদ পরিশোধেই বছরে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে—যা বাজেটের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ‘সামর্থ্যের মধ্যে জনপ্রত্যাশা পূরণের আধাআধি চেষ্টা’দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত এর চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই বর্তাবে। তিনি বলেছেন, প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নযোগ্য হলেও তা নির্ভর করছে কর সংগ্রহের দক্ষতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ঘাটতি বাজেট মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে আর্থিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়বে। সাইফুল হকের মতে, সরকার ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে, যা কাগজে-কলমে বাস্তবসম্মত মনে হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হলে এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বিবৃতিতে বলেছেন, প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার এই বাজেট ‘গণবিরোধী চরিত্রের’এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি ফাঁকা প্রতিশ্রুতির মতোই মনে হচ্ছে। তারা উল্লেখ করেছেন, বাজেটের বড় অংশই ঋণনির্ভর—নতুন করে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগের ঋণের বোঝাকে আরও ভারী করবে। একই সঙ্গে ঋণের সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
সিপিবির নেতারা আরও বলেছেন, ২০১০-১১ অর্থবছরে বাজেট ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, যা তখন জিডিপির ১৬.৯ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় ৮ গুণ বেড়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও বাজেট-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ১৩.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তাদের মতে, এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয়—বাজেট বড় হলেও রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা সে অনুপাতে বাড়েনি। বরং প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোনো স্পষ্ট কার্যকর রূপরেখা নেই।
তিনটি দলের বক্তব্য এক জায়গায় এসে মিলে যায়—বাজেটের ভেতরের কাঠামোতে ঋণনির্ভরতা, সুদের চাপ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা কমার কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।




