প্রতিক্রিয়া
প্রবৃদ্ধির চেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থায়নের

ছবি: আগামীর সময়
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের গল্প হলো স্থিতিশীলতা থেকে পুনরুদ্ধার, পুনরুদ্ধার থেকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি। সরকার আশা করছে, প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে, রাজস্ব আদায় দ্রুত বাড়বে, মূল্যস্ফীতি কমবে এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সমস্যা হলো, এই প্রত্যাশাগুলোর প্রতিটি বাস্তবায়িত হতে হবে একই সঙ্গে। বাজেটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কোনো একটি পূর্বাভাস ভুল হওয়ার নয়। ঝুঁকি হলো প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব ও বৈদেশিক অর্থায়ন তিনটিই যদি প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হয়।
বাজেট ঘোষণার ঠিক আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে, উৎপাদনশীল শিল্পে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, আর বিনিয়োগের হারও কমেছে। এই বাস্তবতা থেকে এক বছরের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছানো সহজ হবে না। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে। সরকার যেখানে মূল্যস্ফীতি কমার আশা করছে, সেখানে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ বাজেটের ভিত্তিগত অনুমান এবং অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে।
রাজস্বের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। নতুন অর্থবছরে ৬ কোটি ৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাই অর্জিত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে আগামী বছরের রাজস্ব লক্ষ্য কাগজে যতটা দেখাচ্ছে, বাস্তবে তা আরও কঠিন হতে পারে।
এখানেই শুরু হয় প্রকৃত ম্যাক্রো অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
রাজস্ব কম এলে ঘাটতি বাড়বে। বৈদেশিক অর্থায়নও প্রত্যাশামতো না এলে সরকারকে আরও বেশি দেশীয় উৎস থেকে ঋণ নিতে হবে। তখন ব্যাংকগুলোর তহবিলের বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে চলে যেতে পারে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করবে। এর ফলে একটি বৈপরীত্য তৈরি হতে পারে। যে বাজেট প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার জন্য তৈরি, সেটিই বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন সীমিত করে দিতে পারে। একই সঙ্গে বড় ঘাটতি, বেশি ঋণগ্রহণ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিবেশে মুদ্রানীতি পরিচালনাও কঠিন হয়ে উঠবে।
বৈদেশিক অর্থায়ন কম এলে বিনিময় হার
ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে,
বাজেটের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে, রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার চেয়ে ভালো
হতে পারে, বৈদেশিক অর্থায়নও আসতে পারে। কিন্তু বিচক্ষণ অর্থনৈতিক
ব্যবস্থাপনার কাজ শুধু আশাবাদী হওয়া নয়; কম অনুকূল পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত থাকা।
তবে বাজেটে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যা স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা
খাতে বরাদ্দের অগ্রাধিকার বেড়েছে এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারিত
হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের বর্তমান পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এই পুনর্বিন্যাস অনেক দিন ধরেই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এটা নিশ্চিত করা যে, অতিরিক্ত ব্যয় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, ভালো শিক্ষার ফলাফল এবং অধিক কার্যকর সামাজিক সুরক্ষায় রূপান্তরিত হচ্ছে। প্রশ্ন শুধু কত টাকা খরচ করা হচ্ছে তা নয়; বরং সেই ব্যয় থেকে নাগরিকরা কতটা মূল্য পাচ্ছেন।
এই বাজেটের প্রকৃত পরীক্ষা হবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে নয়। একদিকে প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব ও বৈদেশিক অর্থায়নের ঝুঁকি কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যায়, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয় থেকে নাগরিকদের জন্য কতটা বাস্তব সুফল নিশ্চিত করা যায় সেটা। সাফল্যের প্রকৃত পরিমাপ হবে সেখানেই।




