খামেনি অমর, খামেনি অম্লান

শোকাহত জনসমুদ্রের উপস্থিতিতে সমাহিত হলেন খামেনি। ছবি: এপি
কোটি কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ, রাষ্ট্রীয় ও সামরিক প্রটোকল এবং শোকাহত জনসমুদ্রের উপস্থিতিতে মাশহাদের পবিত্র মাটিতে সমাহিত হলেন আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইসলামের অষ্টম ইমাম, হজরত ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারের ছায়াতলে তার চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ, প্রভাবশালী ও আলোচিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনে শাহাদাতবরণের পর থেকে ইরানের প্রতিটি শহর ও জনপদ ছিল শোকে স্তব্ধ। কিন্তু দাফনের এ ঐতিহাসিক মুহূর্তে সেই শোক রূপ নিয়েছে এক দৃঢ় অঙ্গীকারে। তেহরানের রাজপথ থেকে মাশহাদের পবিত্র চত্বর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়েছে একটিই ধ্বনি: ‘খামেনি অমর, খামেনি অম্লান’। ব্যক্তি খামেনির দেহাবসান ঘটেছে; কিন্তু যে প্রতিরোধ, স্বনির্ভরতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের দর্শন তিনি রেখে গেছেন, তা আজও জীবন্ত বাস্তবতা।
বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের স্থপতি
ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনির উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৮৯ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার জটিল সন্ধিক্ষণে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। খোমেনি বিপ্লবের মাধ্যমে যে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তার সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় অভিযোজিত করা। পারমাণবিক সংকট এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না; বরং রাষ্ট্রের আদর্শিক দিকনির্দেশনা, নিরাপত্তানীতি, বৈদেশিক কৌশল এবং আঞ্চলিক অবস্থানের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
শাসকদের ইতিহাসে এক সাদাসিধে জীবন
পারমাণবিক সক্ষমতা, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিস্তৃত প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হয়েও তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিলাসিতার দূরত্ব বজায় রাখার এই চিত্রই তাকে বহু মানুষের কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং একজন নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
তার এই জীবনদর্শন সম্পর্কে খামেনির ছেলে সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি গত ১২ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেছিলেন— ‘এই নেতৃত্বের দায়িত্ব এর আগে এমন একজন ব্যক্তির হাতে ছিল, যিনি আল্লাহর পথে ছয় দশকেরও বেশি সময় নিরলস সংগ্রাম করেছেন এবং সব ধরনের আরাম-আয়েশ ও পার্থিব সুবিধা ত্যাগ করেছেন। এর ফলেই তিনি শুধু বর্তমান যুগেই নয়; বরং এ দেশের শাসকদের সমগ্র ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।’
সমর্থক ও সমালোচক উভয়পক্ষই স্বীকার করেন, কয়েক দশক ধরে তিনি ইরানের রাজনীতির কেন্দ্রীয় ও নির্ধারক ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তার প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিস্তৃত ছিল।
ইতিহাসে খামেনির অবস্থান
তিনি শুধু নেতৃত্ব দেননি; বরং একটি দর্শন, একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নির্মাণ করে গেছেন।
ইতিহাসে খুব কম নেতাই ব্যক্তিসত্তাকে অতিক্রম করে একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পেরেছেন। ইরানের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করে, খামেনি সেই বিরল নেতাদের একজন, যার প্রভাব তার জীবদ্দশার গণ্ডি পেরিয়ে ভবিষ্যতের রাজনীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোয়ও প্রতিফলিত হবে।
ইতিহাসে কোনো নেতার মূল্যায়ন কখনো একমাত্রিক হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সিদ্ধান্ত, নীতি ও উত্তরাধিকার নতুনভাবে বিচার ও বিশ্লেষিত হয়। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং ইসলামি বিশ্বের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব রেখে গেছেন।
আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে তিনি যে মোনাজাত করেছিলেন, তা আজ কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়— ‘হে আল্লাহ! আমার এই ক্ষতবিক্ষত শরীর, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আমার এই অবশ হাত এবং আমার এই অবশিষ্ট জীবনকে আপনার রাস্তায় শহীদ হিসেবে কবুল করুন। আমাকে শহীদদের কাফেলা থেকে পৃথক রাখবেন না।’
গতকাল মাশহাদের পবিত্র মাটিতে একটি দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু খামেনি শুধু একটি নাম নয়; তিনি একটি যুগ, একটি রাজনৈতিক দর্শন এবং আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি অমর, তিনি অম্লান।
লেখক: ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরবির সিনিয়র সাংবাদিক




