সংস্কার ও সুশাসন ছাড়া লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রস্তাবিত বাজেট বিগত বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বাড়লেও জিডিপির তুলনায় এর আকার মাত্র ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক চাহিদার তুলনায় একে কোনোভাবেই বড় বলার সুযোগ নেই; বরং অতীতের সরকারগুলোর আমলে গড় ১৫ শতাংশ জিডিপি আকারের বাজেটের চেয়ে এটি কম। তবে আমাদের ভঙ্গুর রাজস্ব কাঠামো, ক্রমবর্ধমান দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা এবং দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে এই সীমিত বাজেট বাস্তবায়নও এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এ বছর কর-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতায় এই অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশের ঘরে আটকে রয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে করের পরিধি বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধ করা জরুরি। খুচরা ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনা বা ২০ লাখ দোকানকে ট্যাক্স নেটে যুক্ত করার উদ্যোগ ভালো; কিন্তু এক বছরে এনবিআরের ৪৫ শতাংশ রাজস্ব বাড়ানোর প্রজেকশন অবাস্তব। অতীত অভিজ্ঞতায় যেখানে প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১২ শতাংশের বেশি হয় না, সেখানে এ হিসাব মেলানো মুশকিল। একই সংকট ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ক্ষেত্রেও। যেখানে প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত এবং অর্থসংস্থান নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অথচ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৩ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রাক্কলিত ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ দিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। কারণ দেশে বর্তমানে ইনক্রিমেন্টাল ক্যারিটাল আউটপুট রেশিও (আইসিওআর) বেসরকারি হিসাবে ৭ দশমিক ৭৩-এ দাঁড়িয়েছে। ২০১৮-১৯ সালেও এটা ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতিতে অদক্ষতা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা এবং শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অন্যদিকে, ২ দশমিক ৪৩ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখানো হয়েছে, যাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ব্যাহত না হয়। কিন্তু বর্তমানে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং এক্সচেঞ্জ রেটের ঝুঁকির কারণে এটি বিপজ্জনক। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, নতুন ঋণের একটি বড় অংশই চলে যাবে আগের ঋণের সুদ পরিশোধে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রাও কঠিন, তবে ৬০টি পণ্যের কর হ্রাস বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান সংকটে কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসন ছাড়া এই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব।
লেখক: সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব ও এডিবির সাবেক নির্বাহী পরিচালক




