নেপাল হারিয়েছে নিজস্ব কণ্ঠস্বর

কাঠমাণ্ডুর একটি রাস্তা । ছবি : সংগৃহীত
ভারসাম্যহীনতার দেশ নেপাল। আমাদের রপ্তানি আয়ের প্রতি টাকার বিপরীতে আমদানিতে খরচ হয় প্রায় ৮ টাকা। জ্বালানি, জরুরি ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স কিংবা সিমেন্ট— আধুনিক জীবনের সব অপরিহার্য অনুষঙ্গই আসে সীমান্ত ছাড়িয়ে। আর সবচেয়ে বেদনার হলো মানুষ রপ্তানি।
কর্মসংস্থানের অভাবে ঘরছাড়া তরুণদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই কোনোমতে টিকে আছে আমাদের অর্থনীতি। তবে আরও এক আমদানির কথা আমরা খুব একটা স্বীকার করি না। যদিও গণতন্ত্রের জন্য তা ভীষণ জরুরি। আমরা মূলত আমদানি করছি আমাদের নিজেদেরই ইতিহাস।
আজ হয়তো ভোগের অনেক কিছুই আমাদের আমদানি করতে হয়। কিন্তু স্বচ্ছতার এই পথ যদি অব্যাহত থাকে, তবে আমাদের ইতিহাস আর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না। আমরা নিজেরাই জ্ঞান তৈরি করতে পারি
অতীতের নীরবতা
বিষয়টি বুঝতে আমাদের অতীতের জাতীয় সংকটগুলোর দিকে তাকানো প্রয়োজন। ২০০১ সালের জুন মাসে রাজপরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর এক ভয়াবহ অবস্থা ও পরিচয় সংকটে পড়ে দেশ। দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিলেও সেখানে জনআস্থার ছিল চরম অভাব। মানুষের মনের প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দেওয়ার মতো করে সেই তথ্যগুলো সামনে আনা হয়নি। যখন স্বচ্ছতা ছিল সবচেয়ে জরুরি, তখন প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতাই ছিল সার।
আর যখন একটি দেশ জনগণের কাছে নিজের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে পারে না, তখন উত্তরের জন্য তাকে তাকাতে হয় বাইরে। রাজপরিবারের সেই হত্যাকাণ্ডের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোই হয়ে ওঠে আমাদের প্রধান ভাষ্যকার। একেই আমি বলি ‘লাইব্রেরি ইফেক্ট’। জ্ঞানের অভাব নেই— তবুও নিজেদের মধ্যে তা শেয়ার না করায় বাস্তবতা বুঝতে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে একটি দেশ।
আমরা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ইতিহাস লেখার ভার অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে টিকে থাকা ও বারবার নিজেকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা আমাদের আছে। এখন সময় সেই গল্প ভেতর থেকে বলার
ইতিহাস কেবল যাপন করার বিষয় নয়, লেখারও বিষয়। আপনি যদি নিজের গল্প না বলেন, তবে অন্য কেউ তা লিখবে। যারা ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করে, নিয়ন্ত্রণ থাকে তাদেরই হাতে। কী মনে রাখা হবে, কোন বিষয়ে জোর দেওয়া হবে, আর কোন প্রশ্নটি হারিয়ে যাবে অতলে— সবই তাদের নির্ধারণ করা।
নেপাল নিজের গল্প লেখার দায়িত্ব অন্যদের হাতে ছেড়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছে নিজস্ব কণ্ঠস্বর। এর ফলে আমাদের গল্প ঠিক কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে— তৈরি হয়েছে সেই ঝুঁকি। এর মানে বিদেশি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের পর্যবেক্ষণ যেন আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের পরিপূরক হয়, একমাত্র উৎস নয়।
বিদেশি লেন্স যত দক্ষই হোক, তার সীমাবদ্ধতা অনস্বীকার্য। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ কিংবা রুদ্ধদ্বার কক্ষের কৌশলগত সিদ্ধান্তের গভীরে পৌঁছানো বাইরের কারও পক্ষে প্রায় অসম্ভব
স্বচ্ছতা মানে কেবল ধুলোজমা শেলফে রাখা বই নয়। এটি তাৎক্ষণিক ডিজিটাল উপায়ে তথ্য পাওয়ার অধিকার। আনুষ্ঠানিকভাবে এই লেখা অনলাইনে প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্র গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাবে। কেবল বার্তাবাহক নয়; এখানেই গণমাধ্যম শক্তিশালী ছাঁকনি হয়ে ওঠে। যারা আখ্যান তৈরি করে, তারা মানুষের জানার পরিধি তো বটেই, এমনকি মানুষের অনুভূতিকেও প্রভাবিত করে। এর একটি অর্থনৈতিক সুবিধাও আছে।
নেপালের উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ আসে বিদেশি সাহায্য থেকে। ফলে নেপাল বিষয়ক অধিকাংশ গবেষণা ও জ্ঞান এখন বিদেশি অর্থায়ন ও নেতৃত্বে পরিচালিত। তারা রাস্তা বা হাসপাতাল তৈরি করছে ঠিকই, একইসঙ্গে প্রতিবেদন তৈরি করছে শাসনব্যবস্থা, দারিদ্র্য বা সম্ভাবনা নিয়েও। এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সবসময় নিরপেক্ষ নয়। ফলে নিজস্ব ভবিষ্যতের আলোচনায় গৌণ হওয়ার ঝুঁকিতে নেপালের কণ্ঠস্বর।
অভ্যুত্থানের পরীক্ষা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা ছিল আমাদের জন্য নতুন পরীক্ষা। মর্মান্তিক প্রাণহানির পর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই শূন্যতায় ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে ও বিস্তারিত সংবাদ পরিবেশনে এগিয়ে আসে বিবিসির মতো বিদেশি মাধ্যমগুলো। তথ্যের অভাবের সেই সময়ে তাদের প্রতিবেদনগুলোই দেয় মানুষকে স্বচ্ছতা।
তবে বিদেশি লেন্স যত দক্ষই হোক, তার সীমাবদ্ধতা অনস্বীকার্য। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ কিংবা রুদ্ধদ্বার কক্ষের কৌশলগত সিদ্ধান্তের গভীরে পৌঁছানো বাইরের কারও পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন এমন এক অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা যা কেবল দেশের মানুষই করতে পারে।
গণতন্ত্রের জয়
এখন বদলাচ্ছে পরিস্থিতি। ডিজিটাল স্বচ্ছতার এই যুগে আটকে রাখা যাচ্ছে না সত্যকে। আমরা এখন এক ‘হুইসেলব্লোয়ার’ সংস্কৃতির উত্থান দেখছি। যেখানে গোপন তথ্যগুলো ডিজিটাল লিক হিসেবে আগেভাগেই পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে।
আমরা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের ইতিহাস লেখার ভার অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে টিকে থাকা ও বারবার নিজেকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা আমাদের আছে। এখন সময় সেই গল্প ভেতর থেকে বলার।
নেপালের উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ আসে বিদেশি সাহায্য থেকে। ফলে নেপাল বিষয়ক অধিকাংশ গবেষণা ও জ্ঞান এখন বিদেশি অর্থায়ন ও নেতৃত্বে পরিচালিত। তারা রাস্তা বা হাসপাতাল তৈরি করছে ঠিকই, একইসঙ্গে প্রতিবেদন তৈরি করছে শাসনব্যবস্থা, দারিদ্র্য বা সম্ভাবনা নিয়েও
অতীতে অনেক তদন্ত হলেও তার সত্য অনেক সময় ড্রয়ারেই বন্দি থাকত। সেই প্রেক্ষাপটে কারকি কমিশন প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ও বাস্তবায়ন আমাদের জাতীয় চরিত্রে এক বিশাল পরিবর্তন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দ্বিতীয় দিনেই এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জেন-জি প্রটেস্টের সময় প্রাণহানির জন্য দায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেকের কাছেই ন্যায়বিচারের এই প্রচেষ্টা এক বড় জয়।
তবে ৯০৭ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনের তথ্য ও প্রমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা জরুরি যেন সমালোচকদের মুখ বন্ধ হয়। এটি যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয় বরং সত্যের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ, তা যেন প্রমাণিত হয়। এই তদন্ত প্রতিবেদনটি রুদ্ধদ্বার কক্ষ থেকে জনসমক্ষে আনার মাধ্যমে রাষ্ট্র অবশেষে তার নাগরিকদের সত্য জানানোর ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছে।
প্রশ্ন এখন একটাই, এই তথ্য নিয়ে রাষ্ট্র সামনে কীভাবে এগোবে? প্রতিবেদনটি কি সংসদের কোনো লাইব্রেরিতে পড়ে থাকবে? নাগরিকদের কি তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে এটি পেতে লড়াই করতে হবে? নাকি সরকার আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি অনলাইন পোর্টালে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করাই হলো সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তি। ষড়যন্ত্রের গুঞ্জনের একমাত্র প্রতিষেধক এই স্বচ্ছতা।
কলম ফিরে পাওয়া
কথায় আছে, একমাত্র ঐতিহাসিকই পারেন অতীতকে নতুন রূপ দিতে। নেপালের রয়েছে এক অসাধারণ লড়াইয়ের গল্প। আজ হয়তো ভোগের অনেক কিছুই আমাদের আমদানি করতে হয়। কিন্তু স্বচ্ছতার এই পথ যদি অব্যাহত থাকে, তবে আমাদের ইতিহাস আর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে না। আমরা নিজেরাই জ্ঞান তৈরি করতে পারি, নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারি এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা লিখতে পারি।
কারকি কমিশনের প্রতিবেদন তারই প্রমাণ। তথ্যই শক্তি; আর এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু জনগণের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে নেপাল অবশেষে সেই ক্ষমতা তার নিজের মানুষের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
লেখক: নেপালের গবেষক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞ















