জরুরি অবস্থা মানবে না খাইবার পাখতুনখাওয়া
- পিটিআইয়ের লংমার্চের সপ্তম দিন

সংগৃহীত ছবি
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার দলের ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চ সপ্তম দিনে পৌঁছেছে। তবে এখনো খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ পেরোতে পারেনি তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতাকর্মীরা। লংমার্চ নিয়ে পরিস্থিতি যখন ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে উঠছে, তখন জানা যেন প্রদেশের ১২ জেলায় জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে সরকার। তবে প্রদেশটির ক্ষমতাসীন পিটিআই বলছে, এ পদক্ষেপ সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর সুস্পষ্ট লঙ্ঘণ। জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি-কোনোটাই মানবে না তারা।
এমন পরিস্থিতিতে পিটিআই সরকার সরিয়ে জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি করা হলে চলমান আন্দোলন নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যা কেন্দ্র সরকারের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। সম্ভবত পাকিস্তানের ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তিরাও তা বুঝতে শুরু করেছেন। আর তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারির সভাপতিত্বে হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। এতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, মূল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ অন্যরা। যেখানে দ্বিতীয়বারের মতো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
জিও নিউজ বলছে, ওই বৈঠকে মঙ্গলবার পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ—জাতীয় পরিষদ এবং সেনেটের আলাদা অধিবেশন ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে সে ঘোষণাও এসে পড়েছে। পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর জরুরি অবস্থা জারিরও সিদ্ধান্ত এসেছে। তবে সে ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।
সত্যিই যদি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি করা হয়, তবে তা প্রথমবার হবে না। এর আগেও তিনবার প্রদেশটিতে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭৫ সালে গভর্নরের শাসনের নির্দেশ দিয়েছিলেন; ১৯৯৪ সালে পিপিপির রাষ্ট্রপতি ফারুক আহমেদ খান লেঘারি এবং ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফও জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন।
আসিফ আলী জারদারি ২০০৯ সালেও পাঞ্জাবে গভর্নরের শাসন জারি করেছিলেন, যা প্রায় এক মাস স্থায়ী ছিল। এবারও তিনি জরুরি অবস্থা জারি করলে সেটি হবে তার দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর পিপিপির জন্য তা হবে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় তৃতীয়বারের মতো হস্তক্ষেপ।
কেন্দ্র সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সরকার যে জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থা সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের একটি প্রস্তাবের বিধান রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতিরও নিজ উদ্যোগেও কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি যদি স্বাধীনভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, তবে সেই ঘোষণা ১০ দিনের মধ্যে অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পেশ করতে হবে।
২৩৪ অনুচ্ছেদে মূলত কোনো প্রদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। সেখানে পার্লামেন্টের অনুমোদনের জন্য ১০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা না হলেও এই ঘোষণা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এবং এটাও বলা আছে, উভয় কক্ষ অনুমোদন না করলে দুই মাস পর এর কার্যকারিতা লোপ পাবে।
ফলে আপাতদৃষ্টিতে, পার্লামেন্ট তলব করার সিদ্ধান্ত এই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে হচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপ পিটিআইয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ারও হতে পারে।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রায় তিন ডজন জেলার এক-তৃতীয়াংশে নিষিদ্ধ ঘোষিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ উপস্থিতি রয়েছে। কিছু জেলা তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছেও বলেও দাবি এসেছে। এর মধ্যে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এমন কিছু এলাকা রয়েছে যা আগে ফেডারেলি অ্যাডমিনিস্টার্ড ট্রাইবাল এরিয়াসের (ফাটা) অংশ ছিল এবং পরবর্তীতে প্রদেশের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল।
তালেবানরা এসব এলাকার কিছুর ওপর আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ চায়। বেশ কিছু স্থানে তারা নিজস্ব অনানুষ্ঠানিক আদালতও পরিচালনা করছে, নিজস্ব ইসলামি ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রশাসনিক বিষয়গুলোও পরিচালনা করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
পিটিআইয়ের মতে, যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, প্রদেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা উচিত এবং এর সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত।
প্রথম দর্শনে প্রস্তাবটি যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও পাকিস্তানের ইতিহাস বলে, ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা শক্তিশালী পক্ষগুলো বিস্তৃত আলোচনার চেয়ে হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তির নেওয়া সিদ্ধান্তকেই অগ্রাধিকার দেয়। সামরিক স্বৈরাচারী হোক বা রাজনৈতিক নেতা, যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা বারবার তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তগুলোকে জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে বাস্তবায়ন করেছে। তা সে যত যুক্তিসঙ্গতই হোক বা প্রশ্নবিদ্ধ। গত ৭৮ বছর ধরে ‘জাতীয় স্বার্থের’ নামে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ নাগরিকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে, এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায় না।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, পিটিআইয়ের সঙ্গে সেনাবাহিনীর দূরত্ব বজায় রাখাটা ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির রাজনীতির জন্য সুবিধাজনক। এর মাধ্যমে তারা সেনাবাহিনীর কাছে নিজেদের রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য থাকতে সাহায্য করে, বলে মনে করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, সরকার মাওলানা ফজলুর রহমানকে পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনায় মধ্যস্থতা করার দায়িত্ব দিয়েছিল। সে অনুযায়ী তিনি যোগাযোগও শুরু করেছিলেন।
সরকার যদি এরই মধ্যে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে, তাহলে মাওলানা ফজলুর রহমানের প্রচেষ্টা উপহাসে পরিণত হবে। রাষ্ট্রপতি ভবনের বৈঠকের পর, মাওলানা তার দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (জেইউআই) একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান, যেখানে তিনি শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দেখা করেন।
সরকার যদি তাকে আশ্বস্ত করে থাকে এবং তার ওপর ভিত্তি করে তিনি যদি পিটিআইয়ের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখেন, তবে তা সরকারের জন্য একটি বড় সুবিধা হবে। তবে তিনি বিনামূল্যে এমন সুবিধা দেবেন, সে এমন সম্ভাবনা কম। জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন সমর্থনের বিনিময়ে খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর পদের চেয়ে কম কিছু তিনি চাইবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।
অথবা, ফজলুর রহমান যদি একটি সর্বদলীয় সম্মেলন ডেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন, তবে সরকার মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে, পিটিআই এবং এই মাওলানার সম্মিলিত রাজপথের শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর আন্দোলন তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে: এবার খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি করা কি সন্ত্রাসবাদকে পুরোপুরি নির্মূল করে প্রদেশে শান্তি ফিরিয়ে আনবে? নাকি অতীতে পরিচালিত ডজন ডজন সামরিক অভিযানের মতো এই পদক্ষেপও জনগণের উপকারে আসতে ব্যর্থ হবে এবং এর ফলে আরও নতুন সমস্যার সৃষ্টি হবে?
লেখক: ডেইলি সিন্ধিয়ার সম্পাদক ও পাকিস্তানে বিবিসির সাবেক প্রতিনিধি



