উদ্যোক্তা উন্নয়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এনআরবি ব্যাংক

এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রিয়াজ খান
দেশের এমএসএমই খাতের সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রিয়াজ খান
প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে এমএসএমই খাতের বর্তমান অবদান ও গুরুত্বকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
উত্তর: এমএসএমই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এ খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে এমএসএমই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এ খাতের বিকাশ অপরিহার্য।
প্রশ্ন: এমএসএমই খাতের উন্নয়ন ও অর্থায়নে এনআরবি ব্যাংক কী কী উদ্যোগ নিয়েছে?
উত্তর: এনআরবি ব্যাংক শুরু থেকেই সিএমএসএমই খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। সম্প্রতি আমরা ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র দিলকুশায় একটি বিশেষায়িত এসএমই হাব চালু করেছি, যেখানে উদ্যোক্তারা এক ছাদের নিচে দ্রুত ও প্রয়োজনভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন বা সহজ শর্তের ঋণ, নারী উদ্যোক্তা ঋণ, মৌসুমি ঋণ এবং তরুণ উদ্যোক্তা অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছি। উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজড ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহযোগিতা করছি।
প্রশ্ন: বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমএসএমই উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কী ধরনের অতিরিক্ত ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: বর্তমান সময়ে শুধু ঋণ প্রদান যথেষ্ট নয়। উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারসংযোগ, আর্থিক পরামর্শ, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সহায়তা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক অর্থায়ন বৃদ্ধি, দ্রুত ঋণ অনুমোদন এবং উদ্যোক্তাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো জরুরি।
প্রশ্ন: নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর: নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়নকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। এনআরবি ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ‘এনআরবি প্রেরণা’ নামে বিশেষ ঋণপণ্য রয়েছে, যেখানে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘এনআরবি ইয়াং এন্ট্রাপ্রেনিউর’ স্কিমের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায়ও আমরা এসব উদ্যোক্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
প্রশ্ন: ডিজিটাল ব্যাংকিং ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এমএসএমই খাতকে আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন?
উত্তর: ডিজিটাল প্রযুক্তি এমএসএমই খাতের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। ডিজিটাল লোন প্রসেসিং, অনলাইন পেমেন্ট, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডেটাভিত্তিক ক্রেডিট মূল্যায়নের মাধ্যমে দ্রুত ও স্বচ্ছ অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রযুক্তির ব্যবহার উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় উভয়ই কমাবে এবং তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?
উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় এনআরবি ব্যাংক অংশগ্রহণমূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে অর্থায়ন পাচ্ছেন। এ ছাড়া ‘স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম’ (এসআইসিআইপি)-এর আওতায় আমরা উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যাতে এসএমই উদ্যোক্তাদের দক্ষতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়। ‘রিফাইন্যান্স স্কিম ফর সেটিং আপ অ্যাগ্রো বেজড প্রোডাক্ট প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এনআরবি ব্যাংক দেশের কৃষি অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে ‘স্মল এন্টারপ্রাইজ রিফাইন্যান্স স্কিম ফর উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরস’-এর ভূমিকা অগ্রগণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক সহযোগিতায় এনআরবি ব্যাংক পিএলসি কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ঋণ বিতরণ করে আসছে। ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর ফান্ড ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ’ (এফএসএফডিএমএসএমই)-এর মাধ্যমে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এনআরবি ব্যাংক।
প্রশ্ন: এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: জামানত সংকট, অর্থায়নের ব্যয়, সীমিত আর্থিক সাক্ষরতা এবং বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধানে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম সম্প্রসারণ, বিকল্প তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, ডিজিটাল ট্রেড প্ল্যাটফর্ম এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারক, ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের এমএসএমই খাতের সম্ভাবনা এবং এ খাতের উন্নয়নে এনআরবি ব্যাংকের ভূমিকা কী হবে?
উত্তর: আমি বিশ্বাস করি, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের এমএসএমই খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে। এনআরবি ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং টেকসই ব্যবসা অর্থায়নের মাধ্যমে এ খাতের বিকাশে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।




