মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রী রঘু রাইয়ের প্রয়াণ
আমি মুহূর্তেরও ওপারে যেতে চেষ্টা করি
- একান্ত সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে ২০১২ সালে রঘু রাইয়ের একক প্রদর্শনী ‘বাংলাদেশ: দ্যা প্রাইস অফ ফ্রিডম’ চলাকালে।

ছবি কোলাজ
২০১২ সাল। সেবারই সম্ভবত সবশেষ তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি মানে রঘু রাই। ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র আলোকচিত্রী যিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও বনেদী ফটো এজেন্সি ম্যাগনামের সদস্য। পাশাপাশি তিনি ভারতের প্রথম আলোকচিত্রী যিনি সেদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব 'পদ্মশ্রী' পদক পেয়েছেন।
বেঙ্গল গ্যালারিতে এক কাঠফাটা দুপুরের রোদ কাটিয়ে উপস্থিত আমি। দেখলাম, গ্যালারিতেই তিনি আছেন; কিন্তু দর্শক হাতে গোনা। নিজের পেশাগত পরিচয় দিয়ে ক্যামেরার সামনে আলাপ শুরু করলাম। আমার সামনে জীবন্ত এক আলোকচিত্রের কিংবদন্তী যিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের হাজারো মুহূর্তকে স্থির-ইতিহাস করে ধরে রেখেছেন তার ফ্রেমে ফ্রেমে।
যেহেতু কেউ খুব একটা ডিস্টার্ব করার জন্য ছিল না, আমি আলাপ শুরু করলাম একদম প্রাথমিক জায়গা থেকে। কীভাবে শুরু হয়েছিল আপনার ছবি তোলা?
গ্যালারির বিষন্ন দুপুরের অবসরে তিনি প্রাণ খুলে দিয়েছিলেন। আমাদের আলাপ হচ্ছিল আমার ভাঙা ভাঙা আর রঘু রাইজির প্রফেশনাল চোস্ত ইংরেজিতে। রঘু রাই মনে করতেন, তার আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। তিনি পুরকৌশলে স্নাতক হয়েছিলেন। কারণ তার বাবা চেয়েছিলেন। দেড় বছর সরকারি চাকরি করে তিনি একেবারে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন— কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তাই তিনি তার বড় ভাই এস পলের কাছে গিয়ে থাকতে শুরু করেছিলেন, যিনি নিজেও ছিলেন একজন বিখ্যাত ভারতীয় আলোকচিত্রী। তিনি রঘু রাইয়ের চেয়ে এগারো বছরের বড় ছিলেন। ‘দুর্ভাগ্যবশত, তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তবে তিনি একটি ভালো জীবনযাপন করে গেছেন’— বলছিলেন রঘু রাই। যখন রঘু রাই তার কাছে থাকতে গেলেন, তখনো তার কোনো ধারণা ছিল না তিনি আসলে কী করতে চান।
এস পলের কাছে থাকার সময় অনেক আলোকচিত্রী পলের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তারা ছবি, লেন্স, ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতেন। রঘু রাই ভাবতেন, এরা কেমন এক পাগলের দল। একদিন শুনলেন, এস পলের খুব ভালো এক বন্ধু তার গ্রামে ছবি তুলতে যাচ্ছেন। লোকটিকে তার খুব পছন্দ ছিল। তাই তিনি বললেন, ‘ভাইসাব, আমিও ওর সঙ্গে যাব। যেতে পারি?’
রঘু ভেবেছিলেন, এটা একটা ছুটির মতো হবে। যাওয়ার সময় তার কী হলো তিনি জানেন না; বেরোনোর সময় তিনি পলের কাছে একটা ক্যামেরা চেয়ে নিলেন, যাতে নিজেও কিছু ছবি তুলতে পারেন। এস পল একটা ছোট ক্যামেরায় ফিল্ম সেঁটে দিলেন, আর এক্সপোজার সম্পর্কে একটু বুঝিয়ে দিলেন। গ্রামে তার তোলা প্রথম ছবিটা ছিল একটা বাচ্চা গাধার। রঘু বলছিলেন, ‘মাঠে একটা গাধার বাচ্চা দেখতে পাই। আর যখন তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি, সে দৌড়াতে শুরু করে। কয়েক মিনিট পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে আর শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। তাই আমি কাছে গিয়ে কিছু শট নিই। ছবিগুলো তোলা হয়েছিল নরম আলোয়, আর ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল সম্পূর্ণ ঝাপসা’।
হাসিমুখে রঘু বলছিলেন, ‘তখনকার দিনে গ্রামের মিষ্টি বাচ্চা আর গ্রামীণ শিশুদের ছবি তোলাই ছিল রেওয়াজ। বহু আলোকচিত্রী ওসব ছবি তুলতেন। কিন্তু সেটা আমার কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। আমি যখন ওই বাচ্চা গাধাটা দেখলাম, ভাবলাম এটা খুব মিষ্টি আর মজার কিছু হবে। আমি সহজাত ভাবেই সেভাবে সাড়া দিয়েছিলাম। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১/৭২ সাল পর্যন্ত লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকা প্রতি সপ্তাহান্তে একটা করে হাফ-পেজ ছবি প্রকাশ করত। এই ছবিগুলো হতে হতো মজার, অদ্ভুত বা আকর্ষণীয়— কিছু একটা অনন্য থাকত তাতে। ভাইয়া তার ছবি পাঠাতেন। আমি যে ছবিটা তুলেছিলাম, সেটা এস পল পাঠালে তারা সেটা প্রকাশ করে। তখন আমার বয়স ২৪ বা এ রকম হবে। তারা আমার নাম দিয়ে ছবিটা প্রকাশ করে, আর এর জন্য তারা যে টাকা দিয়েছিল, তা দিয়ে আমার এক মাস চলে যেত। সবাই বলছিল, এটা একটা বড় ব্যাপার যে আমার ছবি ছাপা হয়েছে। আর আমি ভাবলাম, ‘কেন না, আমি এটাতেই হাত চালিয়ে দেখি।’
এভাবে দুর্ঘটনাবশতই ঘটনাটা ঘটলো আর রঘু ভাবলেন, ‘ঠিক আছে, আলোকচিত্রে একটু হাত চালিয়ে দেখি।’ তিনি যখন প্রতিদিনের ভিত্তিতে ছবি তোলা শুরু করলেন, তিনি ভিন্ন ও ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন; অন্য সবাই যা করেছে, তার থেকে ভিন্ন কিছু, আলাদা কিছু। তিনি সেসব ছবিও খুঁজছিলেন, যেগুলো এরই মধ্যে অন্যদের মাধ্যমে তার মাথায় জমা হয়েছিল। তাই তিনি ছবি তুলে ফিরে আসতেন আর সেগুলো নিয়ে সত্যিই খুশি হতেন না। বলছিলেন, ‘আমার বুঝতে কিছু সময় লেগেছিল যে বিষয়বস্তুর প্রতি, বাচ্চা গাধার প্রতি আমার সহজাত প্রতিক্রিয়াই তাকে অনন্য কিছু দিয়েছে। এখান থেকেই অলৌকিক ব্যাপারটা শুরু হয়’।
রঘু রায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। কম্পোজিশন, আলো বা ডেভেলপিংয়ের কাজ তিনি বড় ভাইকে দেখে দেখে শিখেছিলেন। তার বড় ভাই পল খুব ভালো প্রিন্ট মেকার এবং ভালো আলোকচিত্রী ছিলেন। নিজের প্রিন্ট নিজেই তৈরি করতেন, যে প্রিন্টগুলো খুব সুন্দর ছিল, রঘুর ভাষায় ‘চোখ-ধাঁধানো’। তিনি সব তার কাছ থেকেই শিখেছেন। তখন তিনি ব্যবহার করতেন অ্যাগফা সুপার, ছোট ক্যামেরা; অপেশাদারদের জন্য একটা সাধারণ ক্যামেরা। পরে তার ভাই তাকে একটা পুরনো নাইকন ক্যামেরা দিয়েছিলেন, যেটা তিনি ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নাইকন রেডিয়াস ইত্যাদি ব্যবহার করছিলেন। এখন তিনি ফুজি মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরাও ব্যবহার করেন।
রঘু রাই মনে করেন, বেশিরভাগ মানুষই প্রোগ্রাম করা যান্ত্রিক মানুষ। যেমন তারা বলে ‘গার্বেজ ইন গার্বেজ আউট’; তেমনি এটা হলো সৃজনশীল জিনিস, ভেতরে তো সৃজনশীলতার প্রক্রিয়া চলতে থাকে তারপর জিনিস বেরোয়। বেশিরভাগ মানুষ জিনিসপত্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নকল করে, না বুঝে যে তারা ভিন্ন ও নতুন কিছু অন্বেষণ করছে না। এমন না যে তিনি জানতেন, তাকে নতুন কিছু খুঁজতে হবে; কিন্তু বাচ্চা গাধাটা খুব মিষ্টি আর মজাদার দেখতে ছিল। তাই তিনি ওই ছবিটা তুলেছিলেন।
রঘু রাই শুরুর সময়টার কথা বলতে বলতে আমাকে বলছিলেন, পৃথিবীর এই অংশে তখন ছিল আলোকচিত্রের এক খুব বিরক্তিকর সময়: সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য, বৃদ্ধ মানুষ আর কুঁচকে যাওয়া মুখ, সুন্দরী মেয়ে, ছোট শিশু, খুব কাছ থেকে ছবি তোলাই ছিল রেওয়াজ। তারপর পল আর কিশোর পারেখ, আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় থাকার কারণে, প্রাত্যহিক বাস্তবতা নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হন। আর এটা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলা। তারা সেই ধরনের আলোকচিত্রে ডুবেছিলেন, যা তখন জনপ্রিয় ছিল। তারা দৈনন্দিন জীবন বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে অনন্য ও দুর্লভ কিছু মুহূর্ত বন্দি করতেন।
কিশোর আর পল রঘু রাইয়ের চেয়ে দশ-এগারো বছরের বড় ছিলেন। ততদিনে তারা বেশ নাম করেছিলেন। কিশোর পারেখ ছিলেন হিন্দুস্তান টাইমসের প্রধান আলোকচিত্রী। পল ছিলেন দ্যা এক্সপ্রেস এর প্রধান আলোকচিত্রী। রঘু রাই জয়েন করলেন দ্য স্টেটসম্যান এ, আর এক বছরের মধ্যেই তিনি প্রধান আলোকচিত্রী হয়ে গেলেন। তারা তিনজন খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। যখন তিনি তাদের অ্যাসাইনমেন্ট দেখতেন, বলতেন ‘ছাড়ব না’, মানে তিনি তাদের সহজে ছাড়ছেন না। তার চারপাশে এই দুই দিকপালকে নিয়ে তিনি খুব পরিশ্রম করতেন। এমন পরিস্থিতিতে হয় আপনি দিকপালদের মাঝে চাপা পড়ে গুঁড়িয়ে যাবেন, নয়তো ওপরে উঠে আসবেন। তার মনে হয়, তার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টাই হয়েছিল।
আবশ্যিকভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তোলা ছবি নিয়ে আলাপ হলো। সেসব নিয়েই বেঙ্গল গ্যালারির এই আয়োজন। প্রদর্শনীর নাম ‘বাংলাদেশ: দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’। তিনি বলছিলেন, ‘যখন দ্য স্টেটসম্যান-এর প্রধান আলোকচিত্রী ছিলাম, তখনই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কাভার করার অ্যাসাইনমেন্ট আসে। আমি দিল্লিতে থাকতাম, কিন্তু সদর দপ্তর ছিল কলকাতায়। যখন শরণার্থীরা আসতে শুরু করল, তারা আমাকে কলকাতায় ডেকে পাঠাল এবং একজন প্রতিবেদককে আমার সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় পাঠাল। আমরা যশোরেও গিয়েছিলাম, যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখান থেকে সরে গিয়েছিল। আমি মুক্তিবাহিনীর ছবি তুলেছিলাম— কিন্তু কীসের মুক্তিযোদ্ধা! আমি দেখেছি সাধারণ মানুষ সব দাঁড়িয়ে আছে, যাদের হাতে রাইফেল। সত্যি বলতে, কেউই এর জন্য প্রস্তুত ছিল না—পাকিস্তানিরা বাংলাদেশিদের লড়াই করার মতো কিছুই রেখে যায়নি। আমি আমাদের দিকে আসতে থাকা শরণার্থীদের ছবি তুলেছিলাম। আমি বাস ও রিকশায় চড়ে আসা বাংলাদেশিদের ছবি তুলেছিলাম, যারা তাদের বাচ্চাদের বুকে ধরে রেখেছিলেন। ভাঙা সেতু আর এসবের ছবি তুলতে তুলতে আমার মনে আছে, আমার চোখ ভিজে উঠেছিল। যখন তারা ভারতে আসা শুরু করল, আমি ঘুরে ঘুরে ক্যাম্পগুলোর ছবি তুলেছি।’
রঘু রাই বলছিলেন, ‘যুদ্ধের সময় তোলা আমার বেশিরভাগ ছবিই হয় নারীর নয়তো শিশুর। নারীদের দুঃখ-কষ্ট পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। নারীরা সবকিছুর যত্ন নিতে চান। শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়, কারণ তারা কোমল ও নরম। পুরুষরা বিপর্যস্ত ছিল; হ্যাঁ, ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। কিন্তু কোনোভাবে নারীরা আমার মধ্যে অনেক আবেগ আর বেশি বেদনা জাগিয়েছেন। তুমি নিশ্চয়ই দেখেছ (আমাকে বলছিলেন রঘু রাই), ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির শিশুটির যে ছবিটা, সেটা একটা আইকনিক ফটোগ্রাফ হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা দেখো সবার হৃদয় ছুঁতে পারে।’
১৯৭১-এ তোলা ছবি প্রসঙ্গেই আমি থাকতে চাই— রঘু রাইকে বলি, আপনার ১৯৭১-এ তোলা ছবিগুলো তো অনেক পরে বিশ্ববাসী দেখল। তখন বলছিলেন রঘুজি, তিনি ১৯৭১ সালের সব নেগেটিভ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ১৯৭৭ সালে যখন তিনি দ্য স্টেটসম্যান ছাড়লেন, তিনি নেগেটিভগুলো তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু পত্রিকাতে তো দিনে এক বা দুইটা ছবি ছাপে, বড়জোর তিনটা। বেশিরভাগ কাজই তো কখনো প্রকাশিতই হয়নি। তাই যখন তিনি স্টেটসম্যান ছাড়েন, তিনি নেগেটিভগুলো সঙ্গে নিয়ে যান। সেগুলো তিনি তার অফিসে একটা বান্ডিল করে রেখেছিলেন। কয়েক বছর পর তিনি তার অফিস আরেক জায়গায় সরিয়ে ফেলেন। এই বাক্সগুলোতে নেগেটিভের প্যাকেট আর অন্যান্য জিনিসে ভরা ছিল। কিন্তু কোনোভাবে পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি পর তিনি সেগুলো কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সেগুলো কোনো একটা বাক্সে লুকানো ছিল। যখন তিনি তার কাজ ডিজিটাইজ করা শুরু করলেন, তখন বাক্সের সবকিছু বের করতে শুরু করলেন। পঁয়ত্রিশ বছর পর তিনি দেখেন নেগেটিভের একটা বড় বান্ডিল, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের সময় তোলা। ঐতিহাসিক সব ছবি।
রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রী জীবনে ১৯৭১ ছিল যেন এক মাইলফলক। সেসব ছবির জন্যই তিনি পেয়েছিলেন বিশ্ব জুড়ে অসামান্য খ্যাতি। রঘু রাইয়ের জীবনের এক অন্যতম প্রেরণা ছিলেন অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসো। ব্রেসোর সঙ্গে অলৌকিকভাবে দেখা হয়ে গিয়েছিল তার প্যারিসের একটি প্রদর্শনীর সময়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি শরণার্থীদের কিছু ছবি তুলেছিলেন রঘু, যেগুলো ছিল খুব তীব্র। বাংলাদেশি শরণার্থীদের বিশটা ছবি আর তার সৃজনশীল কাজের পঞ্চাশটা ছবি ১৯৭২ সালে দেল পিয়েরোর একটি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যা ৬টায়। আর পৌনে ৬টার দিকে তিনি দেখেন, কেউ একজন লাইকা ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে প্রতিটি ছবি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। তিনি তাঁকে দেখলেন আর ভাবলেন, নিশ্চয়ই ইনি ব্রেসোঁ। তিনি দেখলেন, তারপর কাছে গেলেন আর শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন যে তিনি সত্যিই ব্রেসোঁ। তিনি রঘু রাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনিই আলোকচিত্রী কি না। তিনি বললেন যখন হ্যাঁ, ব্রেসো বললেন, ‘আমায় দেখতে দিন, তারপর আপনার কাছে আসছি।’ পরে তিনি খুঁজে বের করে তাকে বললেন, ‘খুব ভালো।’ তারপর তিনি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তার স্ত্রী মার্টিন ফ্রাঙ্ককে ফোন করে বললেন, একজন খুব ভালো ভারতীয় আলোকচিত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি আমি, এবং তাকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতে চাই। রঘু রাই বলছিলেন হাসতে হাসতে, আমি নিমন্ত্রণ পেলাম তাদের বাড়িতে নৈশভোজে— এটা ছিল আমার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
ভারতে ফেরার পর রঘু রাই ম্যাগনাম প্যারিস থেকে একটা চিঠি পেলেন যে ব্রেসোঁ তাকে সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন; তিনি বললেন, ‘হায় ভগবান, ব্রেসোঁ! এই মানুষগুলো! আমার মনে হয় না, আমি এমন মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে পারব। আমি কীভাবে, একটা ছোট ছেলে, এদের সঙ্গে কাজ করতে যাব!’ তিনি ১৯৭২ সালে আর উত্তর দেননি। তিনি তখনো স্টেটসম্যান-এ কাজ করছিলেন, যেটা তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পত্রিকা ছিল। ১৯৭৭ সালে তিনি পত্রিকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যখন তিনি তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর নেগেটিভ গুছিয়ে নিচ্ছেন, এই চিঠিটা আবার চোখে পড়ল। যেহেতু তিনি পত্রিকা ছাড়ছেন। তিনি প্যারিসে ম্যাগনামের ডিরেক্টর জিমি ফক্সকে একটা টেলেক্স বার্তা পাঠালেন। তাকে জানালেন যে তিনি তার পত্রিকা ছাড়ছেন আর জিজ্ঞেস করলেন, প্রস্তাবটা এখনো খোলা আছে কিনা। তিনি উত্তর দিলেন যে আছে। এভাবেই তিনি ম্যাগনামে যোগ দেন। মানুষ ম্যাগনামের আলোকচিত্রী হওয়ার জন্য কত কিছুই না করে, তাকে কখনো সেসব করতে হয়নি।
একবার তার স্ত্রী আর তিনি আর্ল উৎসবে (রঁকোঁত্র দার্ল) যাচ্ছিলেন। এটা জানতে পেরে ব্রেসোঁ তাকে তার কাছাকাছি থাকা খামারে নিমন্ত্রণ করলেন। তিনি উৎসবে তাদের জন্য তার গাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। তার খামারে একরের পর একর জমি ছিল। রঘু রাই জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কিছু ফলাচ্ছেন না কেন, যেহেতু পুরোটাই ফাঁকা মাঠের মতো। ব্রেসোঁ বললেন, ‘জানেন, এটাই আপনার পৃথিবীর অংশে আর এখানকার সমস্যা। ওখানে আপনাদের যথেষ্ট খাবার নেই; কিন্তু এখানে আমার সরকার আমাকে কিছু না ফলানোর জন্য টাকা দিচ্ছে। কারণ তারা এত খাবার সামলাতে পারে না।’
প্রভাবের কথা বলতে তিনি বলেন, না। তিনি মানুষ হিসেবে আর আলোকচিত্রী হিসেবে ব্রেসোঁকে শ্রদ্ধা করেছেন। কিন্তু যখন তিনি ছবি তোলেন, কারও অস্তিত্ব তার কাছে থাকে না। পরিস্থিতির সঙ্গে এটা তার সরাসরি সংযোগ। তিনি বলেন, কারও সৃজনশীলতা আপনার ভেতরে কিছু জ্বালিয়ে দিতে পারে; কিন্তু আপনি যদি কোনো একজন ব্যক্তিকে অনুসরণ করেন, আপনি তার দ্বিতীয় শ্রেণির নকল হয়ে যান। তিনি এই সত্যটা ভালো করেই জানতেন। তাই যখন তিনি সহজাত প্রতিক্রিয়ার কথা বলেন, তিনি বোঝান যে সহজাত প্রতিক্রিয়া হলো মন থেকে, ধারণা থেকে, মনের ওই সব ফাঁদ থেকে মুক্ত। তাই আপনি যদি ব্রেসোঁ বা তার ভাইয়ের বা অন্য কারও একটা দারুণ ছবি দেখে থাকেন, সেটা আপনার মাথায় থাকে। কিন্তু আপনার সহজাত বৃত্তি থাকে আপনার মাথার বাইরে। আপনি যদি আপনার সহজাত বৃত্তি দিয়ে পৃথিবীর ছবি তোলেন, তাহলে কোনো প্রভাব আপনার পথে দাঁড়াতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকজন আলোকচিত্রীর কাজের প্রশংসা করি; কিন্তু যখন আমি ছবি তুলি, তখন কারও অস্তিত্ব আমার কাছে থাকে না। আমার ধর্ম আমার অন্বেষণের সাথে সম্পর্কিত, পৃথিবীর সাথে নয়।’
রঘু রাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পোট্রেইট ফটোগ্রাফিতে তার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব কে? তিনি সত্যজিৎ রায়কে তার পোর্ট্রেট তোলার জন্য সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিদের একজন বলে মনে করেন। তিনি বলেন, সত্যজিৎ রায় ছিলেন বর্তমানকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা। অনেকে ছিলেন, কিন্তু একমাত্র তিনিই সিনেমার ভাষা জানতেন। শুধু সংলাপই কোনো চলচ্চিত্র তৈরি করে না; এটা হলো সিনেমার দৃশ্যভাষা। আর সত্যজিৎ রায় সেটা সবচেয়ে ভালো জানতেন।
আমি রঘু রাইয়ের কাছে এরপর জানতে চেয়েছিলাম সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় মনের ভূমিকা প্রসঙ্গে। তিনি মনে করেন, ‘মানুষের মন প্রকৃতির দেওয়া সবচেয়ে বড় কম্পিউটার, যা প্রকৃতি আমাদের সবার মধ্যে বসিয়েছে। আর মনের আছে দৃশ্য, শব্দ, ছবি, ধারণা; সবকিছু জমা রাখার অপার ক্ষমতা। কিন্তু যখন সৃজনশীলতার কথা আসে, তখন সেই ভাণ্ডার হলো বাড়তি বোঝা, যা তোমাকে চালাতে চেষ্টা করে। তুমি শুরু করো কঠিন পরিশ্রম। কঠিন পরিশ্রম থেকে আসে গভীর মনোযোগের মুহূর্তগুলো, গভীর মনোযোগের মুহূর্তগুলোর সাথে আসে নীরবতার মুহূর্তগুলো, কিছুটা ধ্যানের মতো। যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কি ধ্যান করতে পারেন? তিনি বলবেন, না। তবে যখন তিনি পৃথিবীর সাথে মিথস্ক্রিয়া করেন আর সহজাতভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, তখন তার নিজের চেনা নিজের জানা ধ্যানমান নিজের সাথে থাকা আত্মার মুহূর্তটি আসে। আর সেটা তার ভেতর নীরবতা তৈরি করে। নীরবতা হলো যখন তুমি তোমার মাথা থেকে মুক্ত। মাথা গোলমাল করছে। কারণ ও তোমার সাথে কথা বলছে, বলছে, ‘দেখো ওটা ভালো ছবি, ওটা না, এটা এমন, ওটা তেমন।’ যখন তুমি তোমার মাথাকে চুপ করতে বলো, যখন তুমি তোমার চোখকে মাথা থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করো আর তোমার চোখকে তোমার আত্মার, তোমার হৃদয়ের সাথে সংযোগ করো, তখন মাথার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তখন প্রকৃতি সেই ধ্যানের নীরবতা দিতে শুরু করে। এখান থেকেই অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটতে শুরু করে। এটা বেশিরভাগ আলোকচিত্রী বুঝতে পারে না। এই হলো সমস্যা’।
ফ্রেমের মধ্যে থাকা স্থানের প্রতিটি ইঞ্চির সঙ্গে সংযোগের প্রক্রিয়াটাও রঘু রাইয়ের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে তিনি বলছিলেন ‘যখন তুমি এখানেও এখন থাকো, তুমি স্থানের প্রতিটি ইঞ্চির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারো। আর সেই মুহূর্তে যখন তুমি স্থানের প্রতিটি ইঞ্চির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছ, তোমার মনের গোলমাল থেমে যায়। সেই মুহূর্তে ওর আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তাই যখন তুমি ‘হেয়ার অ্যান্ড নাউ’-এ বিদ্যমান থাকো, তুমি স্থানের প্রতিটি ইঞ্চির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাও। প্রতিটি স্থানের নিজস্ব অভিব্যক্তি আর নিজস্ব অলৌকিকতা আছে, যা আসে-যায় আর অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই এ সবই খুব সম্পর্কিত। প্রতিটি পরিস্থিতি এক আন্তঃসম্পর্কিত অলৌকিক শক্তি নির্গত করে’।
তিনি মনে করেন, আলোকচিত্রীর উচিত জিনিসগুলোর রহস্য ধরা বা রহস্য উন্মোচন করা। বাকি সবই তথ্য। আলোকচিত্র, শুরুতে ছিল মানুষ, ব্যক্তি আর জায়গার দলিল। এটা একটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। যেকোনো পরিস্থিতিতে, প্রতিটি পরিস্থিতি তার নিজস্ব আধ্যাত্মিক আবহ বহন করে, তার নিজস্ব মুগ্ধতা সম্পর্কে, তার নিজস্ব নীরবতা সম্পর্কে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তাহলে আপনার ক্যামেরায় শাটার টেপার নির্ণায়ক মুহূর্তটি কোনটা? তিনি বলেন, ‘নির্ণায়ক মুহূর্ত’ অভিব্যক্তিটা ব্রেসোঁর। কিন্তু আমি মনে করি, নির্ধারক মুহূর্ত ঘটার আগে আরও নির্ধারক মুহূর্ত আছে, আছে নির্ধারক মুহূর্তের পরের মুহূর্তও। আর ভারতের অভিজ্ঞতা বহুস্তরীয়, অনেক মুহূর্ত একই সময়ে জীবন্ত। তাই আমি নির্ধারক মুহূর্তেরও ওপারে যেতে চেষ্টা করি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রী হিসেবে রঘু রাই সারাবিশ্বে সমাদৃত; ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সময় তোলা ছবির জন্যও। তিনি বলছিলেন, ট্র্যাজেডি বা দুর্যোগের মুখোমুখি হলে তিনি নিজের আবেগকে প্রশ্রয় দেন না। ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সেই ছবিটা এখনো মানুষের আত্মাকে পুড়িয়ে দেয়। তবে তিনি বলেন, একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে আপনার হৃদয়ের কেন্দ্র হতে হবে পরিষ্কার ও পবিত্র, যা পরিস্থিতির সত্যকে প্রতিফলিত করে। আপনি সেটা প্রতিফলিত করেন। আপনি সেটা ধরেন। আপনি সেটা একইভাবে প্রতিফলিত করেন। আপনি যদি আবেগে রঙিন হয়ে যান, তাহলে আপনার মন, আপনার আত্মা তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়। তাই পরিস্থিতির, ভালো, খারাপ বা উদাসীন যা-ই হোক না কেন; একজন অত্যন্ত নির্মল, সৎ পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি একই তীব্রতা আর সত্যতা দিয়ে বাকি বিশ্বের সঙ্গে ট্র্যাজেডিটা ভাগ করে নিতে চান, তাহলে আপনি নিজের আবেগের রঙ দিয়ে একে মাখতে পারেন না।’
রঘু রাইয়ের তোলা ইন্দিরা গান্ধীর ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, অনেক পুরুষে ঘেরা এক রাগী নারী। অন্যদিকে, মাদার তেরেসাকে তিনি অত্যন্ত কোমল আর শান্তভাবে উপস্থাপন করেছেন। দুটি ছবি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘তিনি কখনোই ইচ্ছা করে তা করেননি। তার কোনো এজেন্ডা নেই। তিনি এজেন্ডায় বিশ্বাস করেন না। তিনি সত্য আর পরিস্থিতির গভীরতর স্পন্দন ধরায় বিশ্বাস করেন। সেই পরিস্থিতির নিজস্ব প্রতিফলন যদি ভালো, খারাপ, শান্তিপূর্ণ, রাগান্বিত বা অন্য কিছু হয়, সেটা ভিন্ন ব্যাপার’।
রঘু রাই বলছিলেন— ‘প্রত্যেক ব্যক্তিরই কোনো না কোনো রকমের আধ্যাত্মিক আবহ থাকে—ভালো, খারাপ বা উদাসীন। আর অন্বেষণ ও প্রকাশের মুহূর্তগুলোতে; এমন কিছু মুহূর্ত আছে, কিছু পরিস্থিতি আছে, যখন হঠাৎ সেই আধ্যাত্মিক আবহ নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করে আর সেটা আসে একটা সহজাত বৃত্তির সঙ্গে। মানুষ আর পরিস্থিতির প্রতি সহজাত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই আপনি জিনিসগুলোর আধ্যাত্মিক আবহ ধরতে পারেন। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জীবন তো ভর্তি এতসব দ্বন্দ্বে। ভারত সেই সভ্যতাগুলোর মধ্যে একটা, যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানাজন পাশাপাশি, একই সময়ে বাস করতে শিখেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই সব ধরনের বৈপরীত্য আছে। একই জায়গায় সব ধরনের মুগ্ধকর, অদ্ভুত, বিপরীতমুখী, সমান্তরাল পরিস্থিতি। এটাই ভারতের অলৌকিক ব্যাপার’।
নিজের ছবির মূল্যায়ন বা বিশেষ কোনো ছবিকে সেরা হিসেবে চিহ্নিত করা তার ধাতে নেই। তিনি বলেন, ‘আমি আজ, প্রায় ৫৫ বছর পর, ছোট-বড় সব অভিজ্ঞতার একটা ফসল মাত্র।’ প্রতিমুহূর্তের, প্রতি মিথস্ক্রিয়ার নিজস্ব অলৌকিকতা আছে, বড় বা ছোট। আর তিনি সেই সব বড় আর ছোট মুহূর্তেরই ফসল। কেউ তার প্রিয় ছবি কোনটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন তুমি একটা অতি সুন্দর দালান দেখো, এটা বলা সম্ভব নয় যে এই বিল্ডিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইট কোনটা। সবার সমান মর্যাদা। সব সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রখ্যাত মানুষের পোর্ট্রেট তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, মাদার তেরেসা, দালাই লামা বা তার গুরুজির মতো খুব কম মানুষই আছেন, যারা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন। তিনি এই ঐশ্বরিক উৎসগুলোর আশীর্বাদ পেয়েছেন। সে জন্যই তার অন্বেষণের অলৌকিক ব্যাপার এই বয়সেও ঘটে চলেছে।
তার বেশিরভাগ ছবি সাদা-কালো কেন— তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে যে রঙিন ফিল্ম ব্যবহার করা হতো, তা কিছু রঙকে বাড়িয়ে দেখাত। ডিজিটাল টেকনোলজি ছবিকে এত উজ্জ্বল আর রঙিন করে তোলে। সে জন্যই সবাই মনে করে, তারা বড় আলোকচিত্রী। রঙের গোলমালটা এত জোরালো। একজন চিত্রশিল্পী হয়তো আকাশকে সবুজ রঙ করতে পারেন, প্রশ্ন তোলার সুযোগ ছাড়াই। কিন্তু তার এলাকায় সব ধরনের রঙ থাকে। এই রঙগুলো হয়তো একে অপরের সঙ্গে খাপ খায় না। পরিস্থিতিটা খুব মজার। তিনি রঙ বদলাতে পারেন না আর এরা একে অপরের বিরোধী। প্রতিটি রঙের একটা আবেগগত মূল্য আছে, প্রতিটি রঙের নিজস্ব দৃশ্যগত উপস্থিতি আছে। আপনি এদেরকে একটা সীমার বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। তাই আপনি যখন এটাকে সাদা-কালোতে রূপান্তর করেন, এটা রঙগুলোর নয়েজকে চুপ করিয়ে দেয়। (নয়েজ মানে ছবিতে রঙের ঝাপসা বা অপ্রয়োজনীয় দানা দানা ভাব আসা)
রঘু রাইয়ের মতো বড় আলোকচিত্রী হতে গেলে কী করতে হবে আর কী থাকতে হবে— জিজ্ঞেস করেছিলাম রঘু রাইকে। তিনি বলেন, ‘একজন বড় আলোকচিত্রী হতে গেলে ‘পেটে আগুন’ থাকতে হবে। বেশিরভাগ মানুষই পেশাদার, কারণ এভাবেই তারা জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু যার আগুন লেগেছে, যে ভুখা-পিয়াসা, তার ক্ষুধার তৃপ্তি হতে পারে না, যতক্ষণ না তুমি একজন অভিযাত্রী হও। রঘু রাই বলেন, ‘যার জীবনে বাঁচার ভুখ লেগেছে, প্রকৃতিকে বোঝার ভুখ, দর্শন করার বা দেখার ভুখ, দেখুন তার ভগবানের, মীরাবাঈর মতো প্রীতি লেগে যায়। আমাদের যে প্রীতি, তা এই ধরিত্রী থেকে আসমান পর্যন্ত আর আমার ভেতর থেকে এই দুনিয়ার বাইরে, প্রতিটি জিনিসকে জানার-বোঝার ভুখ, এক্সপ্লোরেশনের ভুখ। এই ভুখই অন্বেষণের প্রয়োজন জাগিয়ে তোলে। এই হলো আসল কথা। শেখার ভুখ থাকতে হবে। সেই ভুখ না থাকলে তুমি একজন সংবাদকর্মী, নথিভুক্তকারী। তুমি শুধু জিনিসপত্র পুনরুৎপাদন করছ আর পুনরুৎপাদন করছ।’
আলোকচিত্রীদের প্রতি পরামর্শ থাকবে কী— জানতে চাইলে তিনি জানান, বেশিরভাগ তরুণ আলোকচিত্রী আত্মসচেতন নয়। এই হলো সমস্যা। প্রতিমুহূর্তের আত্মসচেতনতা। যার আত্মসচেতনতা আছে, তার দুনিয়া বেঁচে থাকে, জেগে থাকে। রঘু রাই জানাচ্ছিলেন, আজও যখন তার ৮০ বছর বয়স, যখন তার হাতে ক্যামেরা থাকে, তিনি প্রতি মিনিটে এত সতর্ক আর সজীব থাকেন, আর তিনি এভাবেই বাঁচেন। যদি তিনি দিনে আট ঘণ্টা বা এ রকম ছবি তোলেন, শারীরিকভাবে একটু ক্লান্ত হতে পারেন; কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে তিনি শক্তিতে ভরে ওঠেন, কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার সতেজ আর শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচেন। তিনি বলেন, ‘যার ভগবানের দর্শনের অভিলাষা, তাকে যখন হতেই থাকে দর্শন, তখন তার মধ্যে কি পাগলপান বা পাগলামির এনার্জি থাকে। আমি সেই মানুষ। আমার দর্শন জীবন-প্রকৃতির হতেই থাকে, প্রত্যেক নতুন প্রান্তে। আমি সেই মানুষ, দিওয়ানা, মাস্তানা।’
রঘু রাই মনে করেন, ঐশ্বরিক আশীর্বাদ তার সঙ্গে আছে, তাই তিনি আগের মতোই একই পাগলপানি, আসক্তি আর শক্তি নিয়ে ছবি তোলেন। তিনি বলেন, ‘আলোকচিত্রই আমার ধর্ম। আলোকচিত্র আমাকে জীবন, প্রকৃতি, ঈশ্বর, বাস্তবতা সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তাই আমার যাত্রা ছিল খুবই পরিপূর্ণ। আমি একজন অনুসন্ধানকারী। আর ঐশ্বরিক অনুগ্রহে, আমি এখনো বেড়ে উঠছি।’
আমরা একে অপরকে ধন্যবাদ জানাই। এমন মুগ্ধতা নিয়ে খুব কম কোনো পারস্পরিক আলাপ শেষ হয়।



















