সাক্ষাৎকার
শিশুর সম্মতি ও অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিতে শিখতে হবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় কিংবা বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হয়, সেই দেশের শিশুরা কতটা নিরাপদ, তারা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে কি না, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, কিংবা তাদের বেড়ে ওঠার মতো সামাজিক পরিবেশ আছে কি না। এগুলোর সঙ্গে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সম্পর্ক রয়েছে। এ সংকট নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন সামাজিক অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী
প্রশ্ন: গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকলেও শিশুদের পুষ্টি ও বিকাশের ক্ষেত্রে উদ্বেগ রয়েছে। অর্থনীতির বাইরে সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: প্রথমে বৈশ্বিক পরিস্থিতিটা দেখতে হবে। বিশ্ব জুড়ে ক্ষুধা ও খাদ্যনিরাপত্তার পরিস্থিতি নাজুক। কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। খাদ্য সরবরাহের শৃঙ্খল বিঘ্নিত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঝড় ও বন্যাও কৃষির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন বলি, ভারত বা পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের অবস্থান ভালো, তখন সাধারণত গড় হিসাবের কথা বলি। কিন্তু শুধু সামগ্রিক সূচক দিয়ে পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। জনসংখ্যার কোন অংশ কেমন আছে, সেটিও বিশ্লেষণ করতে হবে। শিশুদের বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে সামাজিক পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশ্ন: শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তো একসময় উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। সে জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?
হোসেন জিল্লুর রহমান: শিশুস্বাস্থ্যে আমাদের বেশ কিছু ভালো অর্জন ছিল। টিকাদান কর্মসূচি তার একটি উদাহরণ। কিন্তু কোভিডের সময় যে ধাক্কা এলো, সেখান থেকে পুনরুদ্ধার হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যু সে দুর্বলতা আবার সামনে এনেছে। এর সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা যুক্ত হয়েছে।
আরেকটি বিষয় দ্রুত নগরায়ণ। শিশুদের উপযোগী সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আমরা ধরে রাখতে পারছি না। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, তা সংকুচিত হচ্ছে। প্রযুক্তির সামাজিক পরিণতিও বুঝতে হবে। ছোট শিশুরাও এর প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ যুক্ত হয়েছে। পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। আয় কমে গেলে পরিবারকে ব্যয় সংকোচন করতে হয়। আর এ সংকোচনের চাপ শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা ও বিকাশের ওপরও পড়ে।
সমাজকে মানবিক করে তোলার উদ্যোগ দরকার। এর প্রভাব শিশুদের ওপর পড়ে। যে সমাজে মানুষ একে অন্যকে অসম্মান করে, বৈষম্যকে স্বাভাবিক মনে করে, সেখানে শিশুরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পায় না। আমাদের গভীরভাবে নিজেদের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা সত্যিই মানবিক সমাজ চাই কি না, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ চাই কি না, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করতে চাই কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে
প্রশ্ন: মূল্যস্ফীতির চাপ আছে; কিন্তু তারপরও শিশুদের খাবারের দিকে, মানে পুষ্টির জোগানের জন্য একটা ন্যূনতম মনোযোগ তো থাকার কথা, সেখানে কী কোনো ঘাটতি রয়েছে?
হোসেন জিল্লুর রহমান: এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। একটি হলো শিশুদের প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়া, অন্যটি হলো মনোযোগ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়া। দুটো এক নয়। ধরা যাক, অর্থনৈতিক চাপের কারণে একটি পরিবার খাবারের মান ও পরিমাণের সঙ্গে আপস করছে। এটা সবসময় শিশুদের প্রতি উদাসীনতার কারণে হচ্ছে না; অনেক সময় পরিবারের সক্ষমতাই কমে যাচ্ছে। দুধসহ শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক খাবারের দাম বেড়েছে। আমদানিনির্ভর গুঁড়া দুধের বাজারেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছে।
অর্থাৎ পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট শিশুদের বিকাশের পরিবেশ সংকুচিত করছে। শিশুদের খাবার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় কমে যাচ্ছে। এ কারণে শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি বুঝতে হলে শুধু গড় আয় কিংবা গড় দারিদ্র্যের হিসাব দেখলে হবে না; পরিবারের ভেতরে সম্পদের বণ্টন এবং শিশুদের জন্য বরাদ্দের বিষয়টিও দেখতে হবে।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় নীতিতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে শিশুদের বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে কি?
হোসেন জিল্লুর রহমান: রাষ্ট্রের প্রচলিত খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিগুলোতে সাধারণত চাল, ডাল কিংবা মৌলিক খাদ্যসামগ্রীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু শিশুদের শুধু পেট ভরলেই পুষ্টি নিশ্চিত হয় না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও শিশুদের বিশেষ প্রয়োজনকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে টিকাদান, ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি, নারীস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য— সবকিছুকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে জনবল সংকট রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর।
প্রশ্ন: পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির দুর্বলতার সাথে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটি কত দূর বিস্তৃত?
হোসেন জিল্লুর রহমান: নীতিগত অবস্থানের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে। পতিত রেজিমের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ করে বললেন যে, জনস্যংখ্যা সমস্যা নয় শক্তি। তার এ বক্তব্যের প্রভাব পড়েছিল পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্পে। জনসংখ্যা অবশ্যই সম্পদ হতে পারে; কিন্তু সেই জনসংখ্যার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। সীমিত জমি ও সম্পদের দেশে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব নারীস্বাস্থ্য ও শিশুসেবার ওপর পড়ে। এখানে মূলকথা, সন্তানসংখ্যা নিয়ে বিতর্ক নয়; মূলকথা দায়িত্বশীল পরিবার গঠন, নারীস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় যত্নের ব্যবস্থা করা। পরিবার পরিকল্পনা কোনো বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নয়।
প্রশ্ন: স্কুলে শিশুদের মিডডে মিলের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা সামনে আসে। এই উদ্যোগ কার্যকর জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হচ্ছে না কেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: মিডডে মিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতির স্পষ্টতা, বাস্তবায়নের উপযুক্ত কাঠামো এবং জবাবদিহি। আমরা এখনো বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পাইলট প্রকল্পের স্তরে রয়েছি। এটিকে কার্যকর জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে পারিনি। আমরা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় স্কুলের খাবার নিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরির গবেষণায় যুক্ত ছিলাম। সেখানে দেখেছি, এ কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, কোথায় সফলতা আসে এবং কোথায় সমস্যা তৈরি হয়— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
গুড টাচ ও ব্যাড টাচ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক শিশু নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। কখনো তারা সেটিকে স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নেয়, কখনো ভয় বা লজ্জার কারণে চুপ থাকে
কিন্তু নীতিমালার বদলে কখনো কখনো এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যায়। যেমন, শিশুদের স্কুলে খাবার নিশ্চিত করার পরিবর্তে টিফিন বক্স দেওয়ার মতো উদ্যোগ সামনে এসেছে। টিফিন বক্স সরবরাহকারীর সুবিধা তৈরি হয়েছে, কিন্তু তাতে শিশুদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সমস্যার সমাধান হয় না।
মিডডে মিলের ক্ষেত্রে ঠিকাদার, খাদ্য সরবরাহকারী, শিক্ষক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং অভিভাবকদের ভূমিকা কী হবে, তা পরিষ্কার করতে হবে। এখানে কমিউনিটির সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। কর্মসূচি শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পনা করে দিলেই হবে না; স্কুলপর্যায়ে কীভাবে খাবার সরবরাহ ও বিতরণ করা হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদকদের যুক্ত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে। যেমন, দুধকে খাবারের তালিকায় রাখলে দুধ উৎপাদকদের জন্য একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি হতে পারে। কিন্তু এসব করতে হলে আগে নীতি পরিষ্কার করতে হবে। শিশুদের সামনে রেখে একটি সুসংহত জাতীয় কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন, সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই ত্রুটি রয়েছে। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: সরকারের প্রকল্প গ্রহণের ইকোসিস্টেমই এখানে একটি বড় সমস্যা। নীতি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত থাকছেন— এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প গ্রহণের আগে যেমন গবেষণা দরকার, তেমনি বাস্তবায়নের সময় এবং শেষে ফলাফল মূল্যায়নও দরকার। কী অর্জন করার কথা ছিল, বাস্তবে কী অর্জিত হলো, কারা উপকৃত হলো, কারা বাদ পড়ল— এসব বিষয়ে স্পষ্ট সূচক থাকতে হবে। সেই সূচকের জন্য তথ্য কারা দিচ্ছে, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কতটা, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। এটি শুধু শিশুদের খাদ্য বা স্বাস্থ্য কর্মসূচির সমস্যা নয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে শুরু করে সড়ক— সবক্ষেত্রেই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে পর্যালোচনা করা দরকার। শিশুদের জন্য প্রকল্প নেওয়া হলে সেই প্রকল্পের কেন্দ্রে শিশুদের কল্যাণ থাকতে হবে।
প্রশ্ন: শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি আবাসিক প্রতিষ্ঠানেও সামনে আসছে। এগুলো কি বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি আরও গভীর সামাজিক সমস্যার লক্ষণ?
হোসেন জিল্লুর রহমান: এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গণমাধ্যম বিষয়গুলো সামনে আনছে, জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে— এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে অপরাধ বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিশুরা দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকে। ফলে তদারকি, নিয়মকানুন, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার— কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাব্যবস্থা বা ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা এক বিষয়, আর শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন একটি নির্দিষ্ট অপরাধ। এই দুটিকে এক করে ফেলা উচিত নয়। যে প্রতিষ্ঠানেই অপরাধ ঘটুক, সেই প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কোনো পরিচয় রাজনীতি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য অপরাধের দায় থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না।
আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত তদারকি এবং দায়িত্বশীল জনবল প্রয়োজন। মেয়েদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে কারা থাকবেন- এ প্রশ্নও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হবে। অনেক সময় বড়রা যে আচরণকে স্বাভাবিক বা স্নেহ প্রকাশের অংশ মনে করেন, শিশু সেটিকে অস্বস্তিকর হিসেবে অনুভব করতে পারে। শিশুর সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমানা এবং তার অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়া শেখাতে হবে। গুড টাচ ও ব্যাড টাচ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক শিশু নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। কখনো তারা সেটিকে স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নেয়, কখনো ভয় বা লজ্জার কারণে চুপ থাকে। তাই অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং শিশুদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পদক্ষেপ নিতে অবহেলা করেছে কি না এবং সে কারণেই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কি সামাজিক প্রতিরোধ বলা যাবে?
হোসেন জিল্লুর রহমান: রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি বা দুর্বলতা থাকলে অনেক সময় সমাজ এগিয়ে আসে। অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে; কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
রাষ্ট্রকে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে, অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দিতে হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো অপরাধকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় বানিয়ে মূল ঘটনাকে আড়াল করা উচিত নয়।
এখানে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে— অপরাধ, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের সংকট। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এক জিনিস নয়। অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি এমন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশুদের প্রতি অসম্মান বা নির্যাতনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হবে না। শিশুদের নিরাপত্তা কোনো জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রশ্ন: শিশুদের আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর পেছনে দারিদ্র্য, শৃঙ্খলা কিংবা ধর্মীয় শিক্ষার মতো বিভিন্ন বিবেচনা কাজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ও তদারকি নিয়ে কীভাবে ভাবা উচিত?
হোসেন জিল্লুর রহমান: কোনো পরিবার অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল; সেখানে খাবার ও শিক্ষার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার মনে করে, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশু শৃঙ্খলা শিখবে। কেউ ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগকে গুরুত্ব দেয়।
এসব কারণকে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। কিন্তু আবাসিক পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা, তদারকি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। সব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা, উপযুক্ত তদারকি ও শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন কার্যকর করা এবং সব প্রতিষ্ঠানের জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেটিকে শুধু প্রতিষ্ঠানটির সুনাম রক্ষার প্রশ্ন হিসেবে দেখা যাবে না। প্রথমে দেখতে হবে শিশুটির কী হয়েছে, তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং ন্যায়বিচার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, খাবার, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ— সবক্ষেত্রেই শিশুদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারেও সচেতনতা সৃষ্টি প্রয়োজন। অভিভাবকদের শিশুর অভিজ্ঞতা শুনতে হবে এবং সে নিরাপদ আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিশুদের কথা বলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদের অস্বস্তি, ভয় কিংবা অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সময় শিশুরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না, কারণ তারা মনে করে বড়রা তাদের কথা শুনবে না। এ মানসিকতা বদলাতে হবে।
প্রশ্ন: আপনি শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের কথাও বলছেন। সমাজে এই সংকটের ব্যপ্তি বা পরিধি কতটা বিস্তৃত?
হোসেন জিল্লুর রহমান: বাংলাদেশে শিক্ষার অবস্থা একটি জাতীয় সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি শুধু একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; পুরো ব্যবস্থার মান, বৈষম্য এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কভিডের পর থেকে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবনে যে বিঘ্ন ঘটেছে, তা যথাযথভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়নি। শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের জন্য কতটা উপযোগী, সেখানে তারা কী শিখছে, কী ধরনের পরিবেশে বেড়ে উঠছে— এসব প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানুষকে অসম্মান করার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম এসব দেখে অন্যায় ও অবিচার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে। তাদের এ প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। শিশুদের জন্য আমরা যে সমাজ তৈরি করছি, সেই সমাজের নৈতিক পরিবেশও তাদের বিকাশকে প্রভাবিত করে।
প্রশ্ন: আমরা বলি শিশুরাই ভবিষ্যৎ; কিন্তু তাদের বর্তমানকে বিপদগ্রস্ত করে এ কথার মানে কী হয়? তাদের বর্তমানকে নির্বিঘ্ন করতে রাষ্ট্র কী করতে পারে?
হোসেন জিল্লুর রহমান: আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্দেশ্য কী। আমরা পুলিশ, অর্থনীতি, শিক্ষা কিংবা অন্য খাত সংস্কারের কথা বলি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব সংস্কার মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করবে, শিশুদের জন্য কী পরিবর্তন আনবে, সেটি বিবেচনা করতে হবে।
আমাদের এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দরকার, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, বাস্তবায়নের জবাবদিহি থাকবে এবং মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা কোনো একটি মন্ত্রণালয় কিংবা একটি প্রকল্পের দায়িত্ব নয়। এর সঙ্গে একাধিক খাতের সম্পর্ক রয়েছে।
একই সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তনও জরুরি। শিশুদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের উদ্যোগে খেলতে ও সামাজিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে। এটি জাতীয় দায়িত্ব। রাষ্ট্র, সরকার, বিরোধী দল, রাজনৈতিক শক্তি, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠন— সবারই ভূমিকা রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি শিশুবান্ধব রাষ্ট্র ও সমাজের কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র ক্রমেই শিশুবৈরী হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। উত্তরণের পথ কী?
হোসেন জিল্লুর রহমান: বাস্তবতার মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে শুধু বড় প্রকল্প বা নতুন কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে হবে না। আমাদের সমাজের গভীর সংকটগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো সমস্যার পাশাপাশি মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পরও সমাজের এ মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সমাজকে মানবিক করে তোলার উদ্যোগ দরকার। এর প্রভাব শিশুদের ওপর পড়ে। যে সমাজে মানুষ একে অন্যকে অসম্মান করে, বৈষম্যকে স্বাভাবিক মনে করে, সেখানে শিশুরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পায় না। আমাদের গভীরভাবে নিজেদের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা সত্যিই মানবিক সমাজ চাই কি না, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ চাই কি না, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করতে চাই কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শিশুবান্ধব সমাজ গঠন কোনো একটি সরকারের আলাদা প্রকল্প হতে পারে না। এটি পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুদের শৈশব, নিরাপত্তা ও বিকাশকে আমাদের উন্নয়নচিন্তার কেন্দ্রে আনতে হবে। নিজেদের মুখোমুখি হওয়াই আজ সবচেয়ে জরুরি।




