Agamir Somoy E-Paper
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
অরক্ষিত রেলক্রসিং পাহারায় ইসলাম
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় সাক্ষাৎকার

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ

ঈশ্বরত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটা মানুষের মাংস-রক্তের ভিতর দিয়ে যায়

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১০
ঈশ্বরত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটা মানুষের মাংস-রক্তের ভিতর দিয়ে যায়

ঢাকা প্রেসক্লাবে শিমুল সালাহ্উদ্দিনের সঙ্গে লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় (১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক বহুমুখী প্রতিভা— একই সঙ্গে রম্য লেখক, ব্যঙ্গশিল্পী, শিশু-কিশোর সাহিত্যের কারিগর, আত্মজৈবনিক উপন্যাসের রচয়িতা এবং রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ বিষয়ক গদ্যের সাধক। তার জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতায়। বাবা শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিজ্ঞানী, মাত তুলসী চট্টোপাধ্যায়। তার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন মা মারা যান। এর কয়েক বছর পর বাবা সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। শৈশবের অনেকটা সময় তিনি ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বাবার সঙ্গে কাটিয়েছেন। পরিবারে ঠাকুরদা ছিলেন শাক্ত, বাবার জীবনাচরণ ছিল গৃহী সন্ন্যাসীর মতো; অন্যদিকে মায়ের মৃত্যুর পর ঈশ্বরচিন্তার প্রভাব— এই সব মিলিয়ে তার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই এক আধ্যাত্মিক মনন গড়ে ওঠে।

তিনি ১৯৪৭ সালে বরানগরের কুঠিঘাট সংলগ্ন ভিক্টোরিয়া স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ওই স্কুলে ফরিদপুরের দীনেশবাবুর শিক্ষণ-নৈপুণ্যে ইতিহাসের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে রসায়ন বিদ্যায় অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। কর্মজীবন শুরু করেন দেওঘর রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে; সেখানে পড়ানোর সময় সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছাও হয়, তবে তা সফল হয়নি। এরপর কলকাতায় ফিরে ক্যালকাটা কেমিক্যালসে কেমিস্ট হিসেবে যোগ দেন। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কটেজ অ্যান্ড স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রিজ ডিপার্টমেন্টে চাকরি নেন এবং পাবলিক রিলেশনশিপ ম্যানেজার পদে বাংলার বহু গ্রামে ঘুরে বেড়ান। এই অভিজ্ঞতাই তার ‘জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গ’ ধারাবাহিক লেখার উপাদান হয়ে ওঠে, যা ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘সঞ্জয়’ ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সাহিত্যজীবনের শুরুতেই তিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘চকমকি’ নামে গল্প প্রকাশ করেন। এর আগে ছোট পত্রিকায় তার প্রথম গল্প ছাপা হয়েছিল। ‘দেশ’-এ গল্প প্রকাশের পর গজেন্দ্রকুমার মিত্র, গৌরী আইয়ুব, আবু সয়ীদ আইয়ুব, বিমল মিত্র প্রমুখ তার লেখার প্রশংসা করেন। এরপর ‘দেশ’-এর শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘পায়রা’; পরে ‘শ্বেত পাথরের টেবিল’ও প্রকাশিত হয়। তার লেখায় বারবার ফিরে আসে যৌথ পরিবার, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক টানাপোড়েন, বাঙালি মধ্যবিত্তের নস্ট্যালজিয়া এবং পশু-পাখির উপস্থিতি। ‘রুকু-সুকু’, ‘পায়রা’—এসব রচনায় তা স্পষ্ট। তার হাস্যরসের ভিতরে তীক্ষ্ণ শ্লেষ, পীড়িতের প্রতি করুণা, শোক ও উচ্ছ্বলতা মিলেমিশে এক অন্যতর আবহ তৈরি করে। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘ক্যানসার’, ‘দুটি চেয়ার’, ‘রশে বশে’, ‘তুমি আর আমি’, ‘একা একা’, ‘কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই’, ‘শিউলি’, ‘মাপা হাসি চাপা কান্না’, ‘উজান বেয়ে যাই’, ‘হালকা হাসির চোখের জল’ ইত্যাদি। মেজমামা ও বড়মামাকে কেন্দ্র করে লেখা গল্পগুলো ‘মামা সমগ্র’ নামে সংকলিত। তার সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় রচনা দুই খণ্ডের ‘লোটাকম্বল’—একটি উৎকৃষ্ট আত্মজৈবনিক উপন্যাস। গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি নাট্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় তিনি বেশ কিছু নাটকও লেখেন। রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের জীবন অবলম্বনে তার ধারাবাহিক লেখা ‘পরমপদকমলে’ পরে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়।

তিনি ১৯৮১ সালে আনন্দ পুরস্কার পান; ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে বঙ্গবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০১৮ সালে ৮২ বছর বয়সে ‘শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। ব্যক্তিজীবনে তিনি সহজ, নির্জন ও নিয়মনিষ্ঠ; ভোরে উঠে লেখেন, গান-বাজনা-প্রকৃতি-পাখি দেখে সময় কাটান। মৃত্যু, ধর্ম, মানুষের একাকীত্ব ও মুক্তি—এই বিষয়গুলো তার লেখায় গভীরভাবে জড়িত। তিনি নিজে বলেছেন, হাসি তার কাছে প্রতিবাদের প্রথম স্তর; আর সাহিত্য মানে এমন কিছু যা ‘আমার সঙ্গে আছে’। বাংলা সাহিত্যে তিনি হাসির আড়ালে জীবনের নির্মম সত্যগুলোকে ধরার এক অসামান্য কারিগর। সেই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ৯০তম জন্মদিন আজ। 

আজ লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ৯০তম জন্মদিন২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় তলার হলঘরে সকালের আলো ঢুকে পড়েছে, জানালা দিয়ে। টেবিলে চায়ের কাপ, একটি সিগারেটের প্যাকেট, আর ছড়ানো কিছু কাগজ। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এসেছেন কলকাতার বরানগর থেকে, প্রথমবারের মতো অমর একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিক অতিথি হয়ে। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে একটা পুরনো চামড়ার ব্যাগ। তিনি চেয়ারে বসে আছেন। তার সামনে বসে আছি আমি। সংবাদ সম্মেলন শেষ হলেও কয়েকজন সাংবাদিক পাশে দাঁড়িয়ে, তার মধ্যেই আমি আলাপ শুরু করার চেষ্টা করছি। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় চা থেকে চুমুক দিয়ে হাসলেন, প্রশ্রয়ের হাসি। আমি প্রশ্ন করা শুরু করলাম—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সঞ্জীবদা, ঢাকায় আসতে কেমন লাগছে? আপনি তো বহুবার এসেছেন বাংলাদেশে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (হেসে) আসি। আসি মানে… আমি তো এখানে খুব স্বচ্ছন্দ। তোমাদের এখানে একটা জিনিস আছে যেটা কলকাতায় এখন কমে গেছে—মানুষের মুখে হাসি। আমি সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে রিকশায় উঠলাম, রিকশাওয়ালা গান গাইছিল। কলকাতায় রিকশাওয়ালারা গালি ছাড়া তেমন কিছু দেয় না। (সবাই হাসেন) আমি বললাম, ভাই গান গাইছেন কেন? বলে, ‘আজ কেমনে আছেন?’ আমি বললাম ভালো। বলে, ‘তাহলে গান গাইব না কেন?’ এই দর্শনটাই তো বাঙালির। এটা এখনো বাংলাদেশে আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার লেখা শুরু করার কথা বলুন। ‘জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে ‘লোটাকম্বল’—এই যাত্রাপথটা কেমন দেখেন এখন পেছন ফিরে তাকালে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: দেখো, লেখা শুরু করার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল—সমাজের নানা অনাচারের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা। সমাজে চারিদিকে যখন বৈপরীত্য দেখি। যে লোকটি অপরকে বলছে সৎ হতে, সে নিজে অসৎ। যে বলছে মদ খাওয়া কমান, সে নিজে মাতাল। এসব দেখতে দেখতে মনে একটা ক্রোধ জন্মাল— সারা পৃথিবীটা কি চিরকাল এমন ভণ্ডামি করেই চলবে? আমি তখন সরকারি চাকরিতে ছিলাম। সরকারি অফিসে বসে মানুষের ভণ্ডামিটা সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়। ফলে এইসব আরও বেশি চোখে পড়ত। ভাবলাম, এর বিরুদ্ধে কিছু করতে হবে। আমার হাতে যে অস্ত্রটা আছে, সেটা হল ব্যঙ্গ। স্যাটায়ার। হাসির আড়ালে সত্যটুকু তুলে ধরার চেষ্টা।

শ্বেতপাথরের টেবিল (১৯৭৭)শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার প্রথম লেখাটার কথা বলুন। আপনি বলেছিলেন ‘শ্বেতপাথরের টেবিল’-এ সেই সময়ের কথা আছে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: হ্যাঁ। তখন আমি একটা কেমিক্যাল ফার্মে কাজ করতাম কেমিস্ট হিসেবে। যার কাছে আমি রিপোর্ট করতাম সেই ভদ্রলোক আমার প্রথম লেখাটি পড়ে বললেন—ঠিক আছে, চালিয়ে যাও। ‘শ্বেতপাথরের টেবিল’-এ পরিতোষ নামে একটা ছেলে আছে, যে আমার সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল—সেই গল্পটা আমার প্রথম লেখা। খুব ছোট একটা ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিল। তারপর আমি সেই চাকরি ছেড়ে সরকারি অফিসে যোগ দিই। সরকারি চাকরির শেষের দিকে আবার লেখালেখি শুরু করেছি। তখন ‘দেশ’ পত্রিকায় গেলাম। সম্পাদক বললেন—একটা গল্প ছেপে কী হবে, আপনি বরং একটা ধারাবাহিক লিখুন। তখন ‘জীবিকার সন্ধানে পশ্চিমবঙ্গ’ এক বছর ধারাবাহিকভাবে বেরোল। সঞ্জয় ছদ্মনামে। তারপরে আস্তে আস্তে গল্প, উপন্যাস।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে তো আপনার লেখক জীবনে দেশ পত্রিকার বড় ভূমিকা আছে। তা আলাপ পরে হবে, আপনার বাবার কথা বলুন। আপনি বলেছিলেন সেন্স অফ হিউমার আপনি পারিবারিক সূত্রে পেয়েছেন।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: আমার বাবা শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু তিনি খুব রসিক মানুষও ছিলেন। তার সঙ্গে কথা বললে মানুষ ভুলতে পারত না। তিনি বলতেন—’ইউ মাস্ট নো সামথিং অফ এভরিথিং।’ সবকিছু অল্প করে হলেও জানো। উনি নিজে ফাউন্টেন পেনের কালি বানাতেন, সাবান বানাতেন, সেগুলো ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিলি করতেন। বাড়িতে তার নিজস্ব গবেষণাগার ছিল। আমি ছোটবেলায় সেখানে তাকে সাহায্য করতাম। আমার মামা ছিলেন সেকালের বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী জহর মুখোপাধ্যায়—খেয়াল আর ঠুংরিতে খুবই পারদর্শী। মাতুল বংশ থেকে আমি সংগীতবোধ পেয়েছি। এইসব মিলিয়ে আমার মধ্যে একটা জিনিস তৈরি হয়েছিল—পড়াশোনা, গান, বাজনা, খেলাধুলা, সব বিষয়ে একটা ওয়েল-কালচার্ড এবং কিশোরসুলভ অতিআগ্রহ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার মাতো আপনার খুব কম বয়সে মারা গেলেন। আপনার বয়স যখন পাঁচ, তখন। তারপর বাবা সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এই ঘটনাগুলো কি আপনার ভিতরের আধ্যাত্মিক মননটাকে তৈরি করেছিল?

লোটাকম্বল (অখণ্ড সংস্করণ) (২০০৯)সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: তুমি এতোকিছু জেনে এসেছো! অবাক হলাম। (কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর ধীরে) মায়ের মৃত্যু— সেটা এমন একটা শূন্যতা যা কখনো পূর্ণ হয় না। আমি একাকী একটা শৈশব কাটিয়েছি। বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি। এটি ছিল একটি বড় যৌথ পরিবার, যা সবসময় কর্মকাণ্ডে মুখরিত থাকত। আমরা একটি পুরনো ধাঁচের ডাচ ভিলায় থাকতাম, যা লোকেরা ভুতুড়ে বাড়ি বলে ডাকত। একাকী বালক হিসেবে আমি এক ঘর থেকে অন্য ঘরে চলাচল করে ঘুরে বেড়াতাম। আমি দেখতাম সন্ধ্যার শেষ সূর্যরশ্মি অন্ধকার ইস্পাতের নীরবতার কাছে হার মেনে নেমে যাচ্ছে। আমি বাবার অফিস থেকে ফেরার জন্য অপেক্ষা করতাম। সেই নিঃসঙ্গ পরিবেশে আমি নিজেকে একটি ‘ভূত’ বা আত্মায় রূপান্তরিত হতে কল্পনা করতাম, নিজেকে অন্য ব্যক্তির চর্মে স্থানান্তরিত করতাম এবং দূর থেকে তার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতাম। ‘আমি’ হয়ে উঠতাম ‘অন্য কেউ’। আমার ঠাকুরদা ছিলেন শাক্ত। বাবার জীবনাচরণ ছিল গৃহী সন্ন্যাসীর মতো। একদিকে ঠাকুরদার পূজা-অর্চনা, অন্যদিকে বাবার ঈশ্বরচিন্তা— এই দুইয়ের মধ্যে আমি বড় হয়েছি। ছোটবেলায় সাধু-সন্তদের জীবনের প্রতি একটা আকর্ষণ জন্মেছিল। মনে মনে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণের ইচ্ছাও হয়েছিল। দেওঘর রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা করার সময় সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য মনস্থিরও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। এখন মনে হয়, সেটা ভালোই হয়েছে। সংসারে না থেকে যদি সন্ন্যাসী হয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো ‘লোটাকম্বল’ লেখা হত না। সংসারের ভিতরে থেকেও তো একটা দূরত্ব তৈরি করা যায়। রামকৃষ্ণদেব বলতেন, যত মত, তত পথ। আমি সেই পথটাই খুঁজেছি— সংসারের মধ্যেই থেকে সংসারকে দেখার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দাদা, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ নিয়ে আপনার লেখা ‘পরমপদকমলে’। এই লেখাগুলো কি আপনার কাছে ধর্মপ্রচার, নাকি সাহিত্য?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: কোনোটাই না। এগুলো আমার কাছে মানুষের জীবনকে বোঝার চেষ্টা। রামকৃষ্ণ ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ঈশ্বরকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি মজা করেছেন। তিনি ভক্তদের নিয়ে হাসতেন, নিজেকে নিয়েও হাসতেন। তার জীবনটাই একটা বিরাট হাসির উপাদান—কিন্তু সেই হাসির ভিতরে কী একটা গভীর শোক আছে। বিবেকানন্দকে দেখো—তিনি ছিলেন একদিকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী, অন্যদিকে ভিতরে ভিতরে খুব একা। এই মানুষগুলোর জীবনী লেখার সময় আমি কোনো পৌরাণিক কাহিনী লিখতে চাইনি। আমি চেয়েছি তাদের মানুষ হিসেবে দেখতে। তারা যদি মানুষ না হন, তাহলে তাদের দিয়ে কিছু হয় না। ঈশ্বরত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটা মানুষের মাংস-রক্তের ভিতর দিয়ে যায়। আমি ‘পরমপদকমলে’ টানা পনেরো বছর লিখেছি। লিখতে লিখতে দেখলাম এই রাস্তা দিয়েই আমি প্রচুর ইতিহাসের অঙ্গনে চলে যেতে পারি। নুন ছাড়া যেমন তরকারি হয় না, ঠিক তেমনই ধর্ম ছাড়া জীবন চলে না। লেখকরা যদি ধর্মের লেখা না লেখেন, তা হলে ধর্মীয় লেখা তো একপেশে হয়ে যাবে।

পরমপদকমলে (২০০০) ও শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন (২০১৫)শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি ‘শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ লিখেছেন। এই বইটা নিয়ে অনেকের কৌতূহল আছে। কৃষ্ণকে নিয়ে এমন একটা বই লেখার ভাবনা কোথা থেকে এল?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: একদিন যখন আমি মানুষের জীবনের সমাপ্তি নিয়ে চিন্তা করছিলাম, তখন এই ভাবনাটি আমার মনে আসে। মৃত্যু অনিবার্য। এটি অবতারদের কাছেও এসেছে, গৌতম বুদ্ধের কাছেও, স্বয়ং প্রভু কৃষ্ণের কাছেও। শেষ সময়ে তাদের সকলকেই একজন সাধারণ মানুষের মতো যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। তাই কৃষ্ণের শেষ সময় নিয়ে লেখার ভাবনা আমার মনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। কৃষ্ণের পায়ে তীরের আঘাত লেগেছিল এবং গ্যাংগ্রিন ও সেপসিসের কারণে তিনি এক অগৌরবজনক মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর আগে শেষ দিনগুলো নিয়ে লেখার সময় আমি তার সেবক হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপর, আমি ভাবলাম রাধার কী হলো এবং এটি একটি বড় পরিসর তৈরি করল— সময়ের মৃত্যু। আমি বইটি নিয়ে সত্যিই কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমি কখনোই পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে কথা বলতে চাই না। বইটির অতি সাধারণ শিরোনামই সেটি দেখায়। এটি সহজ এবং যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে, এমনকি একটি শিশু বা সবজি বিক্রেতাও। যারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করেন, আমি দেখেছি তাদের সাধারণ মানুষের প্রতি উদাসীন হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আমি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলি এবং তাদের গল্প বলি, যা সবাই সমানভাবে উপভোগ করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার ‘পায়রা’ উপন্যাসটা নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের আগ্রহের কথা পড়েছি। গৌরী আইয়ুব নাকি সত্যজিৎ রায়ের কাছে গিয়ে বলেছিলেন ‘পায়রা’ থেকে ছবি করা যায় কি না। শেষ পর্যন্ত ছবি হয়নি। এই নিয়ে আপনার কি কোনো আক্ষেপ আছে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (মুচকি হেসে) আক্ষেপ? একটু তো থাকতেই পারে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় যদি ‘পায়রা’ থেকে ছবি করতেন, তাহলে সেটা তার ছবি হত, আমার উপন্যাসের ছবি নয়। আমি সেটা জানতাম। আর একটা কথা—সত্যজিৎ রায় আমার লেখা পড়তেন কি না, জানি না। কিন্তু গৌরীদি যখন তার কাছে গিয়েছিলেন, তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘পায়রা খুব ভালো উপন্যাস, কিন্তু এটা থেকে ছবি করা কঠিন।’ সেটাই সত্যি। আমার লেখায় ঘটনা কম, মানুষের ভিতরের টানাপোড়েন বেশি। সিনেমায় সেটা দেখানো সহজ নয়। সত্যজিৎ রায় যদি সেটা করে দেখাতেন, তাহলে সেটা একটা বিস্ময় হত। কিন্তু বিস্ময় ঘটেনি। তাই বলে ‘পায়রা’ কম কিছু নয়। ওটা একটা সময়ের ছবি—যৌথ পরিবার ভাঙার সময়ের ছবি। সেটা বইয়ের পাতায় থেকে যাওয়া এক ধরণের ভালোই হয়েছে।

নিজের আত্মজীবনী ‘আমি ও আমি’ হাতে লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সঞ্জীবদা, আপনার ‘লোটাকম্বল’ পড়ে অনেকের মনে হয় এটা আপনার আত্মজীবনী। কিন্তু আপনি বলেছেন এটা উপন্যাস। আত্মজৈবনিক উপন্যাস আর আত্মজীবনীর মধ্যে পার্থক্যটা আপনি কীভাবে দেখেন? যেখানে আপনিও প্রচুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বড় বড় মানুষদের।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: আত্মজীবনীতে আপনি যা ঘটেছে তাই লেখেন। আত্মজৈবনিক উপন্যাসে আপনি যা ঘটেনি, তা-ও লেখেন। ‘লোটাকম্বল’-এ অনেক ঘটনা আছে যা আমার জীবনে ঘটেনি, কিন্তু ঘটতে পারত। আমি সত্যকে বদলে দিইনি, কিন্তু সত্যের সঙ্গে কল্পনাকে মিশিয়েছি। এটা একটা শিল্প। আত্মজীবনী হল দর্পণ, আত্মজৈবনিক উপন্যাস হল জানালা। জানালা দিয়ে আপনি বাইরে তাকান, কিন্তু কাচে নিজের প্রতিবিম্বও দেখতে পান। ‘লোটাকম্বল’ আমার কাছে অন্য জায়গায়। ওটা আমার নিজের জীবনের বই। ওখানে আমি নিজেকে লুকিয়ে রাখিনি। পুরস্কার একটা স্বীকৃতি, কিন্তু ‘লোটাকম্বল’ হল আমার আত্মার টুকরো। সেই টুকরোটার জন্য কোনো পুরস্কারের দরকার নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার লেখায় বারবার যৌথ পরিবার, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, বাঙালি মধ্যবিত্তের নস্ট্যালজিয়া ফিরে আসে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনার এত আকর্ষণ বা মনযোগ কেন?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: কারণ আমি সেই পরিবারেই বড় হয়েছি। যৌথ পরিবারটা হল একটা ছোটখাটো সমাজতন্ত্র— সেখানে সবাই একসঙ্গে থাকে, কিন্তু সবাই আলাদা। সেখানে ভালোবাসা আছে, হিংসা আছে, ঈর্ষা আছে, ত্যাগ আছে। এই জিনিসগুলো আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। আমার ঠাকুমা ছিলেন তোমাদের ঢাকার, বিক্রমপুরের, দিদিমা ছিলেন যশোরের জমিদার কন্যা। আমার জ্যাঠাইমা আমাকে খেলাধুলো, ছবি আঁকা, এমনকি নিজের প্রসাধন নিয়েও উৎসাহ দিতেন। তিনি স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করতেন। সেই স্বাধীনতা আমাকে ভিতর থেকে গড়ে তুলেছে। এক সময় কারও বাড়ি গেলে মহিলারা আমায় ভিতরে ঢুকতে দিতেন না। বলতেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে ভিতরে যেতে দিলে অন্দরের সব কথা বেরিয়ে আসবে। (হাসি) আর বাঙালি মধ্যবিত্তের নস্ট্যালজিয়া— সেটা হল একটা হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্য ভালোবাসা। আমরা যে পরিবারগুলোতে বড় হয়েছি, সেগুলো আর নেই। সেই না-থাকাটাই লেখার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কখনো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার লেখায় পশু-পাখিও জায়গা করে নেয়। ‘রুকু-সুকু’, ‘পায়রা’—এই রচনাগুলোতে পশু-পাখিরা প্রায় মানুষের মতোই চরিত্র। এই পশু-পাখিদের প্রতি আপনার এই টান কোথা থেকে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: পশু-পাখিরা মানুষের চেয়ে বেশি সৎ। তারা ভান করে না। একটা কুকুর যখন লেজ নাড়ে, তখন তুমি জান সে খুশি। একটা বিড়াল যখন গর্জন করে, তখন তুমি জান সে রাগী। মানুষের ক্ষেত্রে সেটা বলা যায় না। আমি পশু-পাখিদের নিয়ে লিখতে ভালোবাসি, কারণ তাদের মাধ্যমে আমি মানুষের কথা বলতে পারি—কিন্তু সরাসরি না বলে, একটু আড়ালে থেকে। ‘রুকু-সুকু’ আসলে দুটো পাখির গল্প নয়, দুটো মানুষের গল্প—যারা পাখির ছদ্মবেশে আছে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা হাস্যরসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক গল্প নিয়ে মেগা সিরিয়াল ‘ঘেঁটে ঘ’শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার হাসির গল্পেরা ‘ঘেঁটে ঘ’ নাম নিয়ে এখন মেগা সিরিয়ালে। এই জীবনে মেগা সিরিয়াল কেমন করে চলে এল?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: আমি যদি মানুষ না হয়ে একটা প্রোডাক্ট হতাম? আমি ভাবি আমি একটা মেটিরিয়াল, আমি একটা প্রসেসিংয়ের মধ্যে আছি। সেটা যে ভাবে নিয়ে যায় আমি চলি। লেখা না থাকলে পড়ি, পড়া না থাকলে লিখি, চকোলেট খাই, পাখি দেখি। একঘরে একটা বিষয় লিখতে গিয়ে মনে পড়ে অন্য ঘরে খোলা খাতায় একটা অংশ যোগ করতে হবে। ছুটে যাই। রাতে শুতে গিয়েও মনে হয় না সময় অপচয় করেছি আমি। ‘ঘেঁটে ঘ’ প্রথম দিকের কয়েকটা এপিসোড দেখেছি। অবশ্য লোকে এসে খুব বলছে আমায় যে তাদের ‘ঘেঁটে ঘ’ ভাল লাগছে। বাংলাদেশেও তো আমার ‘লোটা কম্বল’ নিয়ে সিরিয়াল হচ্ছে। ওরা কিন্তু খুব সিনসিয়ার। এখানে ডেপথ্-টা কম। নিজের গান, বলা আমি কোনও দিন শুনতে চাই না। মনে হয় ইশ! কী বাজে! আর সন্ধেবেলা যে সময়টা ‘ঘেঁটে ঘ’ সম্প্রচার হচ্ছে, সেটা আমার পুজোর সময়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বললেও লোকের মুখে একটা হাসি ফুটে ওঠে। হাসির গল্প লিখতে কী লাগে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: আমি কোনও দিনই হাসির গল্প লিখব ভেবে কিছু লিখিনি। আমি জীবনের কথা লিখতে চেয়েছি। অঙ্গভঙ্গি, ক্যারিকেচার করে লোক হাসানো যায়। কিন্তু লিখে হাসি ফোটানো একটু শক্ত কাজ। শিব্রাম চক্কোত্তির পানিং নিয়ে অনেকেই নাক কুঁচকেছেন। দেখাক না কেউ ও রকম করে! আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ‘শ্বেতপাথরের টেবিল’ গল্পগ্রন্থটি যখন বেরলো তখন বিজ্ঞাপনে বলা হল এটি একটি হাসির সংকলন। অথচ ওই লেখায় যেমন হিউমারাস অ্যাপ্রোচ আছে, তেমনি সিরিয়াস অ্যাপ্রোচ আছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? হাসির লেখক হয়ে ফেঁসে গেলাম আমি। হাসির লেখক কি সামনের সারির লেখক বলে বিবেচিত হন না? আমার পাঠকদের কথা আলাদা। কিন্তু আজকের গোমড়া জীবনের কেবল দু’টো শব্দ। গন্তব্য আর মন্তব্য। ভোগবাসনা, টাকাপয়সা নিয়ে শীর্ষে ওঠার জন্য আমরা একে অপরকে গুঁতোচ্ছি। তাই লোকে হয়তো বলছে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় লোককে বড্ড হাসাচ্ছেন। ব্যাটা জানে না এখন হাসির গল্প লেখার দিন নয়।

বাংলা সাহিত্যের বহুমুখী প্রতিভা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি একবার বলেছিলেন— আপনি যে হাসির গল্প লেখেন, তার ভিতরে একটা কান্না থাকে। সেই কান্নাটা কোথা থেকে আসে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: পৃথিবীতে যখন এসেছিলাম তখন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদেছিলাম। আর যে শিশু জন্মানোর পর কাঁদে না তাকে নিয়ে সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করে। তখন তাকে কাঁদানোর জন্য পিঠে চাপড় দেওয়া হয়—একটু কাঁদ বাছা। এক্ষেত্রে তুলসী দাস বলছেন, ‘তুলসী যাব যগ মে আয়ো, তুলসী রোয়ে জাগ হাসে!’ সবাই তো খুশি—ছেলে হয়েছে, ছেলে হয়েছে। কিন্তু তুলসী বলে—যগ মে যায়ো, তুলসী হাসে যগ রয়ে। অর্থাৎ তুমি জীবনটাকে এমন করো যাতে সবাই কাঁদে। এই দোঁহাই আমার জীবনে কাজে লেগেছিল। আর চারদিকে তাকাই—তখন যতই গণতন্ত্র-প্রজাতন্ত্রের বুলি আওরালেও জগতে একটা কথা আছে Have’s ও Have-not’s। মানে এক শ্রেণীর মানুষ খেয়ে শেষ করতে পারছে না, আর এক শ্রেণীর মানুষ দু’বেলা খেতেই পারছে না। আর যারা খেয়ে শেষ করতে পারছে না, তারাই গণতন্ত্রের মাথায় বসে আছে। তাদের মুখে বড় বড় কথা। আমি প্রচুর শ্রুতি নাটক করতাম। তুলসী রায় ছিলেন সেসব শ্রুতি নাটকে। এইসব নাটক রবীন্দ্রসদন, মহাজাতি সদন, নিরঞ্জন সদন-সহ বিভিন্ন জায়গায় হত। একদিন নাটক শেষে বললেন—আপনি আজ তেমন হাসাতে পারেননি! রাগান্বিত হয়ে বলে ফেললাম—আজকে আমি হাসাতে আসিনি। কাঁদাতেই চেয়েছি। মোহিত লাল মজুমদারের কবিতা বলতে ইচ্ছে করছে—যত ব্যথা পাই তত গান গাই, গাঁথি যে সুরের মালা! ওগো সুন্দর! নয়নে আমার নীল কাজলের জ্বালা! এই লাইনের মতো সবাই আমাকে বলে বসল—তুমি বাংলা সাহিত্যের চার্লি চ্যাপলিন। বিষন্নতা খুব পবিত্র জিনিস। বিষন্নতা মানুষের anchor, বা খোঁটা। একটা মানুষ হৈ হৈ করে সারা জীবন বেঁচে মারা যেতে পারে, কিন্তু সে যদি একটু পেনসিভ হয়, তবে তার একটা খোঁটা থাকবে, সেটা হবে তার keynote। সে নিজে কখনও বাচাল হবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭—এই সময়টায় নকশাল আন্দোলনের ভয়াবহতা আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন। ‘গ্রেট বরানগর কিলিং’ আপনি নিজের চোখে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কি আপনার লেখায় কোনোভাবে জায়গা পেয়েছে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (দীর্ঘ নিঃশ্বাস) দেখো, ওই সময়টায় আমি বরানগরেই ছিলাম। রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকত। লাশ টেনে নিয়ে যাওয়ার ছবি আমার চোখে ভাসে। সেটা এমন একটা সময় ছিল যখন তুমি জানো না, কখন তোমার দরজায় কেউ knock করবে। আমি সেসব সরাসরি লেখিনি। কারণ, সেসব লেখা যায় না। সেসব লেখার ভাষা এখনো আমি খুঁজে পাইনি। কিন্তু ওই সময়ের একটা ছায়া আমার লেখায় আছে। ‘শ্বেতপাথরের টেবিল’-এ যে অসহায়ত্বটা আছে, সেটা ওই সময়েরই। মানুষ যখন চারপাশে এত মৃত্যু দেখে, তখন তার ভিতরে একটা ঠান্ডা ভয় ঢুকে যায়। সেই ঠান্ডা ভয়টাকে আমি আমার চরিত্রদের ভিতরে রেখেছি।

নিজের লেখার ঘরে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। ছবি: আনন্দবাজারের সৌজন্যেশিমুল সালাহ্উদ্দিন:আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আপনি লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেই সময়টা কেমন ছিল?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (একটু থেমে) আমার স্ত্রীর ব্রেন ক্যান্সার, মৃত্যু… ভেবেছিলাম আর লিখব না। মনে আছে ‘সাধের ময়না’ লিখছি, একটা হাত ওর মাথায় তো আর এক হাতে কলম! খুব বাজে সময় গেছে তখন… আসলে প্রফেশনাল লেখক হওয়ার মতো দুঃখ আর কিছুতে নেই। সমরেশ বসু বলেছিলেন আমায়—লেখা না এলে কোনও দিনও যেন জোর করে সেক্স-এ ঢুকে পড়ো না। যদিও এখন তাই হচ্ছে। এখন বাচ্চা ছেলের সঙ্গে মায়ের কথোপকথনে মায়ের শরীরের বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে। লিখতে গিয়ে যদি সকলে এখন ভাবে বাজারে চলবে তো? তা হলে সে আর লেখা থাকে নাকি?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সঞ্জীবদা, আপনার লেখায় ধর্ম নিয়ে গভীর আলোচনা থাকে, কিন্তু কখনো গোঁড়ামি থাকে না। এই ভারসাম্য আপনি কীভাবে বজায় রাখেন?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: ধর্ম আমার কাছে কখনোই নিয়ম-কানুন না, এটা আসলে অনুভব। ঈশ্বর মানে কারো ওপর চিৎকার করা নয়, বরং চুপ করে মনটাকে খোলা রাখা। স্বামীজি, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ— তাদের পাঠ করে আমি শিখেছি, ধর্ম আসলে নিজের ভিতরের আলো জ্বালানো। আমি চেষ্টা করি সেই আলোটা একটু পাঠকের ভেতরেও জ্বালাতে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি একবার আমার সাহিত্যিক প্রচেষ্টা সম্পর্কে আমাকে বলেছিলেন: ‘সঞ্জীব, তুমি গোলাপে ঢাকা পথে হাঁটতে যাচ্ছো না, তুমি হাঁটছো কাঁটায় ঢাকা পথে।’ স্বামী বিবেকানন্দ একবার বলেছিলেন, ‘সন্ন্যাসের অর্থ মৃত্যু। তোমার বর্তমান সত্তা একটি নতুন আধ্যাত্মিক সত্তা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। মৃত্যুকে ভয় পেয়ো না, নইলে তুমি কখনোই সাধু হতে পারবে না।’ আমি সেখান থেকেই আমার শিক্ষা নিয়েছি। আমি সর্বদা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত। দক্ষিণেশ্বরে, রামকৃষ্ণ পরমহংস একবার তার ভক্তদের বলেছিলেন: ‘তোমার যদি ইচ্ছা হয় আমার কাছে আসতে পারো, নইলে রানি রাসমণির বাগানে যেতে পারো। আমি তোমাকে সুখ-দুঃখ সমভাবেই মোকাবেলা করার শক্তি দিতে পারি।’ একজন লেখক যদি জীবন ও মৃত্যুকে সমভাবেই মোকাবেলা করতে পারেন, তাহলে তা সাহিত্যিক সৃজনশীলতার পরিধি বাড়িয়ে দেয়। ‘সাহিত্য’ মানে এমন কিছু যা ‘আমার সঙ্গে আছে’। তাই, ‘এটি আমার সঙ্গে আছে’।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কিছু বইশিমুল সালাহ্উদ্দিন: সঞ্জীবদা, আপনি জীবনে অনেক কিছু পেয়েছেন—পুরস্কার, স্বীকৃতি, পাঠকের ভালোবাসা। কিন্তু কিছু কি হারিয়েছেন? কিছু কি অধরা থেকে গেলো?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (দীর্ঘক্ষণ চুপ। তারপর) মাকে হারিয়েছি। সেটা আর কোনোদিন পূরণ হবে না। আর একটা জিনিস—আমি চেয়েছিলাম সন্ন্যাসী হতে। সেটা পারিনি। কিন্তু এখন মনে হয়, সন্ন্যাসটা বাইরের জিনিস নয়। সন্ন্যাস মানে আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করা। আমি সংসারে থেকেও একটা দূরত্ব তৈরি করেছি। সেই দূরত্বটাই আমার সন্ন্যাস। আর সবচেয়ে বড় পাওনা—আমার পাঠকরা। যখন কোনো পাঠক এসে বলে, ‘ আপনার ‘লোটাকম্বল’ পড়ে আমি আমার পরিবারকে নতুন করে দেখতে শিখেছি,’ তখন মনে হয়, এই জীবনের সার্থকতা। এই যে তুমি যেভাবে এসে আমার লেখারই কথা আমাকে বললে, আমার ব্যর্থ লেখক জীবন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্বার্থক মনে হচ্ছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার বয়স এখন সাতাত্তর। আপনি একা থাকেন। আপনার দিন কীভাবে কাটে? সারাদিন কী করেন?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (হেসে) আমার দিনটা খুব সাধারণ। রাত ন’টায় ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে উঠে যাই। উঠে প্রথমে ঘরটা গুছিয়ে নিই, ঔষধপত্র ঠিক করি। তারপর পাঁচটায় বই-খাতা নিয়ে লিখতে বসে যাই। সাড়ে সাতটা পর্যন্ত লিখি। তারপর একটু হাঁটতে যাই। ফিরে স্নান করি, নাস্তা করি। তারপর আবার একটু পড়াশোনা, খবরের কাগজ দেখি। এখন লেখাটাই আমার মূল কাজ। তাগিদ বোধ করলে লিখতে বসি। সন্ধ্যার পর আর বিশেষ কাজ করি না। বসে থাকি। বাড়িতে তিনতলার ওপরে ঘোরানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলে একটা শিব ঠাকুরের মন্দির আছে, ওই জায়গাটায় যাই। ওটা আমার সব চেয়ে প্রিয় জায়গা, কারণ ওখানে একটা ওয়াশ বেসিন আছে সেখানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুবের নীল আকাশে পায়রা দেখতে পাই। ওখানেই স্নান সেরে শিবের মাথায় জল ঢালা যায়। এর পর আরেকটু নীচে নামি, তিনতলায় আমার লেখার ঘরে, সেখানে পাখা নেই কিন্তু। ওখানে একটু লিখে নিয়ে পাশে পুজোর ঘরে যাই। ওখানে ছাদে প্রচুর রেয়ার গাছ এনে রেখেছি। পশ্চিমের বারান্দাটাও আমার প্রিয়। ওখানে যে বেলগাছ আছে, তার নাম দিয়েছি হরগৌরী। ওর ফাঁক দিয়ে গঙ্গা দেখি। ওখানেই প্রচুর পাখি আর কাঠবিড়ালিকে ঝুরিভাজা খাওয়াতে হয় আমায় রোজ। ওখানেই বসে বসে রেডিয়োয় নানা খবর শুনি। এ ভাবেই কেটে যায়।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কিছু বইশিমুল সালাহ্উদ্দিন: একা থাকতে কষ্ট হয় না?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (মুচকি হেসে) একা থাকা আর নিঃসঙ্গতা—দুটো আলাদা জিনিস। আমি একা থাকি, কিন্তু নিঃসঙ্গ নই। আমার বই আছে, আমার স্মৃতি আছে, আমার লেখা আছে। যখন লিখতে বসি, তখন আমি একা নই—আমার চরিত্ররা আমার পাশে বসে থাকে। তারা কথা বলে, তারা হাসে, তারা কাঁদে। আমি শুধু তাদের কথাগুলো লিখে রাখি। এটা একটা companionship। আর একটা কথা—একা থাকলে আপনি নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারা যায়। সেই কথাগুলোই তো লেখা হয়ে যায়। লেখকদের জন্য একা থাকা আবশ্যক বলেই আমি মনে করি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ২০১৪ সালে বসে বলছি— বাংলা সাহিত্যের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আপনি কী ভাবেন? যখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে বাংলা ভাষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে আসছে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: বাংলা ভাষা মরেনি, বরং তার মুখটা বদলেছে। এখনকার লেখকরা সাহসী, তারা সমাজ নিয়ে, নিজের জীবন নিয়ে সৎ কথা বলছে। তবে একটা কথা বলব— ভাষাকে অবহেলা করো না। ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, সে-ই আমাদের অস্তিত্বের ধারক। বাংলা ভাষায় লেখো, তাকে ভালবাসো, যত্ন করো। আমি বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু নিজের দেশ নিজের ভাষা তার উপরে কিছু নেই। তবে বাঙালির মৃত্যু হয়েছে। সবজান্তা বাঙালি অনুকরণ করে মরেছে। কিন্তু বাঙালিকে কেউ আজ আর অনুকরণ করতে চায়? চায় না। আর নির্বোধ মাথামোটা বাঙালি অভিভাবকরা গর্ব করে বলছেন আমার ছেলে বাংলা বলতেই পারে না! স্বামীজি বলে গেছেন ‘সভ্যতা ধ্বংস হলে তা পুনরায় আর সৃষ্টি হয় না।’ মানববোমা আর সন্ত্রাসের পরে এখন ‘way of no return’-এ আমরা দাঁড়িয়ে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা কিছু বইশিমুল সালাহ্উদ্দিন:এখনকার রাজনীতি নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়:দেখুন রাজনীতি নিয়ে লিখেছিলাম আমি, ‘কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই’। এই লেখার জন্যেই বার বার তখন খুনের হমকি শুনে এসেছি। এখন অবস্থা আরও খারাপ। অমানুষের গণতন্ত্র। পারলে মানুষ মানুষকে কামড়ে দেবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অস্বস্তি হয় না সঞ্জীবদা? এই কারণেই কি অন্ধকারে একলা হাঁটেন?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: অস্বস্তি হয়। প্রকৃতি কিন্তু যে কোনও মুহূর্তে আমাদের ধ্বংস করে দেবে। বিজ্ঞান তো তাই বলছে। আমরা তা জেনেও দিব্যি আছি। অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে দেখতে পাই আমার ভেতরটা বড্ড অসুস্থ। এখন সব কৃত্রিম হাসি…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না না দাদা, আমার হাসি আসল। ভাল করে তাকালে ভেতরটাও দেখতে পাবেন। আপনি এতো হতাশ হচ্ছেন, আপনার পাঠকরা কী কেবল ধ্বংসের অপেক্ষাতেই থাকবে?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: না তা নয়। মানুষকে একলাই নিজের মরুদ্যানে আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে। তার চলে যাওয়ার পরেও যেন সেই আলোয় দেশ না হোক, শহর না হোক, অন্য একজন মানুষ আলোকিত হতে পারে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আজকের যুগে যে ডিজিটাল মিডিয়া এবং টেকনোলজি সাহিত্য প্রচার ও সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, আপনি সেটিকে কীভাবে দেখেন?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: সামাজিক মাধ্যম এখন জরুরি এক বাস্তবতা, তবে তার দুঃখজনক দিকও আছে—এটা অনেক সময়েই বাণিজ্যিক হয়ে পড়ছে। প্রচারের যন্ত্রণা এত বেশি যে সাহিত্য হারিয়েই যায় বেশিরভাগ সময়। তবুও, কেউ যদি সত্যিকারভাবে সৃষ্টি করতে চায়, সে উপায় বের করেই নেবে। আর একটা কথা—এখনকার মিডিয়া সাহিত্যকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। আপনি একটা দীর্ঘ কবিতা লিখুন, তিন-চার পৃষ্ঠার। কোন দৈনিক পত্রিকা সেটা ছাপবে? ছাপবে না। কারণ তারা জানে না কীভাবে সেটা পড়তে হয়। এখন সবকিছু ছোট করতে হবে। একুশ লাইনের মধ্যে কবিতা শেষ করতে হবে। এই চাপটা লেখকদের উপর প্রবল। ফলে লেখকরা যা লিখতে চান, তা আর লিখতে পারেন না। যা লিখলে সহজে ছাপা হয়, তাই লিখতে বাধ্য হন। এটা সাহিত্যের স্বাধীনতাকে খুন করে।

২০১৮ সালে ‘শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমাদের সবার জন্য আপনার যদি কোনো বিশেষ বার্তা থাকে!

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: আমরা সবাই নিরাকার ব্রহ্মের অংশ, এবং বেদান্তে একটিই কথা বলা হয়েছে: ‘Know Yourself’—নিজেকে জানাই সবচেয়ে বড় রহস্য। যে ব্যক্তি নিজেকে জানে, কিন্তু অন্যকে খুশি করার জন্য নিজেকে সাজিয়ে রাখে, সে আসলে নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে। আমরা সবাই এক একজন অভিনেতা; আমরা যা করি, তা অনেক সময় অন্যের প্রিয় হওয়ার জন্যই করি। আসল কাজ হলো—নিজেকে আবিষ্কার করা, নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘আমি’ কে খুঁজে বের করা এবং ঠিক যেমনটা আমরা, সেভাবেই বাঁচা। এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজ হলো—‘দেওয়া’। ভগবান আমাদের মধ্যে সমস্ত গুণ ভরে দিয়েছেন। আমাদের নিজেদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা সেসব ভালো গুণ দিয়ে নিজেদের প্রস্ফুটিত করতে হবে। আমরা যখন এই পৃথিবীতে এসেছি, তখন একদিন এখান থেকে চলে যেতে হবেই। তবে যাওয়ার আগে যদি এই পৃথিবীকে নোংরা করে রেখে যাই, তাহলে সেটা পরিষ্কার করে যেতে হবে। আর যদি ফুল ফোটাতে পারি, তাহলে দরজাটা খুলে দিতে হবে, যাতে সেই সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, আর সকলে তা গ্রহণ করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মচিন্তন—নিজেকে জানার চেষ্টায় থাকা। জীবনকে ব্যালেন্স করে চলা খুব জরুরি; কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। প্রতিটি মানুষই জন্মায় ভগবান হওয়ার জন্য। এমনকি স্বয়ং ভগবানকেও ভগবান হওয়ার আগে মানুষ হতে হয়। আমাদের ভেতরে থাকা ঐশ্বরিক গুণাবলি দিয়েই আমাদের জীবনকে সাজিয়ে তুলতে হবে, যাতে আমরা অন্যকে আনন্দ দিতে পারি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সঞ্জীবদা, শেষ প্রশ্ন। আপনি যখন পেছনে তাকান, তখন কী দেখেন? একটা হাসি, নাকি একটা কান্না?

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: (বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে) দুটোই। হাসি আর কান্না আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। আপনি যখন খুব হাসেন, তখন চোখে জল আসে। আবার যখন খুব কাঁদেন, তখন একটু হাসি পায়। জীবনটা তো একটা ট্র্যাজিকমেডি। আমরা সবাই মঞ্চে আছি, সবাই অভিনয় করছি। কেউ জানে না কখন পর্দা নামবে। কিন্তু যতক্ষণ পর্দা না নামে, ততক্ষণ অভিনয়টা উপভোগ করা উচিত। আমি আমার অভিনয়টা উপভোগ করেছি। আর সেই অভিনয়ের একটা অংশ আপনাদের দিয়ে গেলাম—আমার লেখা। হাসি দিয়ে, কান্না দিয়ে, আর সেই অদ্ভুত জিনিসটা দিয়ে, যাকে আমরা জীবন বলি।

 শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কী দারুণ বললেন দাদা! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, বাংলাদেশে আপনার অনেক বই বিক্রি হয়, পাইরেটেড হয়েও বিক্রি হয়। আপনার পাঠকও অনেক, তাদের জন্য কিছু বলবেন!

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়: আমি এদেশেরই লোক, নকল বই হলেও পাঠকরা তো আমাকেই পড়ছে, মুফতে, বইয়ের দামের ভাগটুকু কেবল আমি পাচ্ছি না। আমার সব পাঠকদের জন্যই ভালোবাসা রইলো। তোমার প্রশ্নগুলো কিন্তু খাসা ছিল,অনেক আনন্দ নিয়ে কথা বললাম তোমার সাথে। ভাল থেকো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ধন্যবাদ দাদা, আপনিও ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।

(সংক্ষেপিত)

শিমুল সালাহ্উদ্দিনসঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    খালে পড়ে ছিল যুবকের দুই হাত রশি দিয়ে বাঁধা মরদেহ, সঙ্গে ইট বাঁধা বস্তা

    খালে পড়ে ছিল যুবকের দুই হাত রশি দিয়ে বাঁধা মরদেহ, সঙ্গে ইট বাঁধা বস্তা

    মাইকিং করে ঘোষণা হলো শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন

    মাইকিং করে ঘোষণা হলো শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন

    ওসির সঙ্গে বাদানুবাদ, ‘আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন’ বললেন রুমিন ফারহানা

    ওসির সঙ্গে বাদানুবাদ, ‘আপনি বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন’ বললেন রুমিন ফারহানা

    ওসির বিরুদ্ধে বিকাশে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

    ওসির বিরুদ্ধে বিকাশে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

    ভোট টানতে জোট ভাঙছে হেফাজত!

    ভোট টানতে জোট ভাঙছে হেফাজত!

    হাতছাড়া এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতেই সাজেক অস্থির

    হাতছাড়া এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতেই সাজেক অস্থির

    সাংবাদিকদের গাড়ি আটকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা যুবদল নেতার!

    সাংবাদিকদের গাড়ি আটকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা যুবদল নেতার!

    মনে রাখতে হবে আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি!

    মনে রাখতে হবে আমরা কী মন্ত্রে দেশ স্বাধীন করেছি!

    শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষককে মারধর

    শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষককে মারধর

    রাস্তার পাশে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ, কাভার্ড ভ্যানচাপায় এসআইসহ নিহত ২

    রাস্তার পাশে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ, কাভার্ড ভ্যানচাপায় এসআইসহ নিহত ২

    বনমালী

    বনমালী

    সন্তানের সামনেই মারধর, ন্যায়বিচার চান মা তানিশা

    সন্তানের সামনেই মারধর, ন্যায়বিচার চান মা তানিশা

    কৃষিপণ্যে হেলায় ক্ষতি বছরে ২৯ হাজার কোটি

    কৃষিপণ্যে হেলায় ক্ষতি বছরে ২৯ হাজার কোটি

    আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে দেশ চালাচ্ছে সরকার

    আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে দেশ চালাচ্ছে সরকার

    সৌদি কারাগারে বন্দি সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি : শামা ওবায়েদ

    সৌদি কারাগারে বন্দি সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি : শামা ওবায়েদ