সম্পাদকীয়
অবহেলায় অপচয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কৃষক যখন মাঠে বীজ বোনেন, তখন তিনি শুধু একটি ফসল উৎপাদন করেন না; নিজের শ্রম, সময়, অর্থ এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেন। নিজ পরিবারের জন্য নয়, সবার খাদ্য নিরাপত্তা তিনি বহন করেন। সেই ফসল মাঠ থেকে ঘরে ওঠার পর কিংবা বাজারে যাওয়ার পথে যদি বিনষ্ট হয়, নিরাপদ সংরক্ষণের অভাবে গুণগত মান হারায় কিংবা বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতায় অবিক্রীত পড়ে থাকে, তাহলে কৃষকের সেই পরিশ্রমের একটি বড় অংশ কার্যত মাটিতেই মিশে যায়।
গতকাল শুক্রবারের আগামীর সময়ের প্রধান শিরোনাম ‘হেলায় ক্ষতি বছরে ২৯ হাজার কোটি’ এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বছরে ২৯ হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য নানা পর্যায়ে নষ্ট হওয়া শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিরও বিরাট অপচয়। কৃষক উৎপাদন করছেন, অথচ উৎপাদিত পণ্যের একটি বড় অংশ ভোক্তার পাতে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তাকে অনেক সময় বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। মাঝখানে অপচয় হচ্ছে বিপুল সম্পদ। এই ক্ষতি নিশ্চয়ই অনিবার্য নয়। উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফসলও বাঁচাতে হবে।
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ধান-সবজি, ফল-মাছসহ নানা কৃষিপণ্যের উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফসল সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং, পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক করার কাজ একই গতিতে এগোয়নি। ফলে কৃষক মাঠে ভালো ফলন পেলেও অনেক সময় তার সুফল পান না, বিশেষ করে ফল ও সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেত থেকে তোলার পর উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, দ্রুত পরিবহন, সঠিকভাবে বাছাই ও প্যাকেটজাত করা না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই পণ্যের মান কমে যায়। আবার অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত হিমাগার নেই। যেখানে আছে, সেখানেও সব ধরনের কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উপযোগী ব্যবস্থা নেই।
একজন কৃষক যখন তার উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ পচে যেতে দেখেন, তখন সেটি শুধু কয়েক কেজি সবজি বা কয়েক ঝুড়ি ফলের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রম, জমির খাজনা বা ইজারা, পরিবহন এবং কৃষকের ঋণের বোঝা। অর্থাৎ একটি পণ্য নষ্ট হওয়ার সঙ্গে তার পেছনে বিনিয়োগ করা পুরো অর্থনৈতিক মূল্যশৃঙ্খলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আর এই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ যদি মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়, তাহলে একই পরিমাণ চাহিদা পূরণে আরও বেশি উৎপাদনের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ অপচয় কমাতে পারলে নতুন জমি বা অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহার না করেও কার্যকর খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।
কৃষিপণ্যের জন্য অঞ্চলভিত্তিক সংরক্ষণাগার, আধুনিক হিমাগার, কোল্ড চেইন, উন্নত প্যাকেজিং, দ্রুত পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। কোন অঞ্চলে কোন পণ্য বেশি উৎপাদিত হয়, কোন সময়ে বাজারে সরবরাহ বাড়ে এবং কোথায় সংরক্ষণ সুবিধার ঘাটতি রয়েছে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি।
বছরে ২৯ হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য বিনষ্ট হওয়া আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এই ক্ষতি সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি কৃষিব্যবস্থার সামনে ঝুলে থাকা একটি বড় প্রশ্ন। এজন্য আগে প্রয়োজন কৃষিনীতির সংস্কার। কৃষক উৎপাদন করবেন আর অব্যবস্থাপনায় তার ফসল নষ্ট হবে— এই চক্র ভাঙতেই হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ আর তার সঙ্গে নিশ্চিত বাজার— এই চারটি স্তম্ভকে শক্তিশালী করা গেলে কৃষকের আয় বাড়বে, অপচয় কমবে, ভোক্তাও উপকৃত হবেন এবং অর্থনীতিতে যোগ হবে বিপুল মূল্য।



