আগামীর চোখ
মহাজন সর্বভূতেষু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
মাননীয় অর্থমন্ত্রী
আমি একজন কৃষক। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে আপনারা মাঝেমধ্যে আমাদের যে সম্মানটুকু দেন, তা শুনে বুক ফুলে ওঠে। অবশ্য সার কিনতে গেলে বুকের সেই বাতাস বেরিয়ে যায়, আর ঋণ চাইতে গেলে মেরুদণ্ডটা বাঁকা করে ব্যাংকের দরজায় দাঁড়াতে হয়।
শুনলাম, গ্রামীণ ঋণের চার ভাগের তিন ভাগই জোগান দেয় এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক দেয় ১০ শতাংশ সুদে, এনজিও কার্যকর হিসাবে ২৭ শতাংশে, আর মহাজন দেন মাত্র ৫০-৬০ শতাংশে। বাহ্, কী চমৎকার প্রতিযোগিতামূলক বাজার! শুধু প্রতিযোগিতাটুকু নেই। সুদের হার এক দশক ধরে প্রায় একই। অর্থাৎ বাজার স্থিতিশীল, মহাজন স্থিতিশীল, শুধু কৃষকের সংসারটাই অস্থিতিশীল।
মন্ত্রী মহোদয়, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে কাগজ লাগে, জামিনদার লাগে, নিয়মকানুন লাগে। মহাজনের কাছে গেলে লাগে শুধু বিপদ। বিপদটা আমার স্থায়ী সম্পদ। তাই ব্যাংকের কাছে আমি অযোগ্য, মহাজনের কাছে আমি অত্যন্ত যোগ্য গ্রাহক। আমার দুঃখের বাজারমূল্য আছে, শুধু ফসলের ন্যায্যমূল্য নেই।
ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে কাগজ লাগে জামিনদার লাগে নিয়মকানুন লাগে। মহাজনের কাছে গেলে লাগে শুধু বিপদ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. গোলাম রসুল যথার্থই লিখেছেন, ‘ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সহজে ব্যাংকঋণ পান না। জটিল প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক হয়রানি এবং নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা তাদের নিরুৎসাহিত করে।’ কথাটা শুনে সাহস পেলাম। এতদিন ভাবতাম, ঋণ না পাওয়ার দোষ বুঝি আমারই। এখন বুঝলাম, ব্যবস্থাটাই এমন।
আপনাদের কৃষক কার্ডের উদ্যোগের কথাও শুনেছি। কার্ড পেলে নাকি কৃষক চিহ্নিত হবেন। বিনীত প্রশ্ন, আমরা কি এতদিন অচেনা ছিলাম? ভোটের সময় বাড়ি বাড়ি এসে চিনতেন, সারের দোকানে দাঁড়ালে চিনতেন, ফসলের দাম পড়ে গেলে চিনতেন না কেন? কার্ডে আমার নাম, ছবি, পরিচয় সব থাকবে— শুধু ব্যাংকের ঋণটা থাকবে কি?
ড. গোলাম রসুল আরও বলেছেন, ‘কৃষি কার্ড বা সহায়তা কর্মসূচি চালু করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না’— কৃষক বাস্তবে কত সহজে ঋণ, সার, বীজ, জ্বালানি ও সেচসুবিধা পাচ্ছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কথাটা কার্ডের গায়ে ছাপিয়ে দিলে ভালো হয়। অন্তত কার্ড দেখিয়ে মহাজনের কাছে গেলে তিনি বুঝবেন, সরকার আমাকে চিনেছে, কিন্তু ঋণ দিতে রাজি হয়নি।
সবশেষে একটি বিনীত অনুরোধ। আগামী বাজেটে কৃষকের জন্য ভর্তুকি না রাখলেও চলবে। শুধু মহাজনের সুদের ওপর ভ্যাট বসাবেন না। ওই সুদ থেকেই তো আমার পরের বছরের বীজ কেনা হবে!
ইতি
আপনার অর্থনীতির মেরুদণ্ড



