উত্তেজনা নয় চাই স্বচ্ছতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভারতের সঙ্গে আগে সম্পাদিত শতাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চুক্তি পর্যালোচনার আওতায় আনার কথা বলেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো বিষয় থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এমন সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়ের চাহিদা। একই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও বজায় রাখার যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, সেটিও প্রণিধানযোগ্য। এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তি পর্যালোচনা মানেই সম্পর্কের অবনতি নয়। বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটি একটি স্বাভাবিক ও দায়িত্বশীল প্রক্রিয়া। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জাতীয় প্রয়োজনও বদলায়। তাই পুরনো চুক্তিগুলোর কার্যকারিতা ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। এর মধ্যে নেতিবাচক কিছু অনুসন্ধান করা বৃথা।
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নদীব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি বাড়লে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই চুক্তি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া যেন উত্তেজনা বা রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় না হয়ে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক এবং কূটনৈতিক শালীনতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বারবার বলছে— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই স্লোগানের মধ্যে কোনো বৈরিতা নেই; বরং রয়েছে রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। পৃথিবীর প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। যে চুক্তি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বন্দর, পানি, জ্বালানি বা সার্বভৌম স্বার্থের জন্য উপকারী, তা অবশ্যই বহাল থাকবে বলে সবার প্রত্যাশা; আর যেসব বিষয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন বা উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা হওয়াই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের জনগণ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে। দেশবাসী চায়, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিক, আবার একই সঙ্গে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুক। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই— জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
বাংলাদেশের উচিত প্রতিটি চুক্তির আর্থিক, কৌশলগত, পরিবেশগত ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত প্রভাব বিশ্লেষণ করে একটি স্বচ্ছ মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা। সংসদীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং জনস্বার্থের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উপকার হবে। একই সঙ্গে ভারতেরও উচিত বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোকে সম্মান করা।
বাংলাদেশের সামনে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। একদিকে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
আমাদের প্রত্যাশা, ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তির পর্যালোচনা হবে স্বচ্ছতা, যুক্তি ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক হোক বন্ধুত্বপূর্ণ, সম্মানজনক ও ভবিষ্যৎমুখী; আর সেই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকুক দুই দেশের জনগণের কল্যাণ এবং বাংলাদেশের ন্যায্য জাতীয় স্বার্থ।



