সম্পাদকীয়
ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক দেশ

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। পাঁচটি অবশ্যপালনীয় বিধান রয়েছে ইসলামে। অবশ্যপালনীয়র মধ্যে অন্যতম ‘হজ’। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের হজ পালন করা ফরজ। আর এই হজের অন্যতম অনুষঙ্গ কোরবানি। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ লাখের বেশি মুসলমান হজ পালন করছেন। বাংলাদেশ থেকে ৭৯ হাজার ১৬৪ জন হজ পালন করেছেন। এর মধ্যে ২৮ হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
ত্যাগের মধ্যেও আনন্দ আছে। এটাই ঈদুল আজহার শিক্ষা। আল্লাহতায়ালা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে তার প্রিয় বস্তু কোরবানি করার আদেশ দিয়েছিলেন। এরপর হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি দেওয়ার জন্য নিয়ে যান। নিজ পুত্রকে কোরবানি দেওয়ার সময় আল্লাহর নির্দেশে তাৎক্ষণিক একটি দুম্বা কোরবানি হয়। এ ঘটনার অনুসরণে সামর্থ্যবান মুসলমানরা কোরবানি দিয়ে থাকেন। যারা কোরবানি দিতে পারেন না, সামর্থ্যবানদের কোরবানির মাংসের ওপর তাদের হক রয়েছে। এ কারণে কোরবানির মাংসের একটি অংশ গরিব মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তাই ঈদুল আজহার দিন এ মাংস বিতরণে কোনো অভাবী মানুষ যাতে বাদ না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত দামের কারণে বহু মানুষ সারা বছর মাংস খেতে পারেন না। ফলে তারা কোরবানির মাংসের জন্য বছরভর অপেক্ষা করেন। এ মানুষগুলো যাতে নিরাশ না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বের মধ্যে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এ সময় দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সাময়িকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও জোয়ার আসে এ সময়। সোমবার ‘দৈনিক আগামীর সময়’ পত্রিকায় ‘লেনদেনের জোয়ারে চাঙ্গা গ্রামীণ অর্থনীতি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি গবাদি পশু। প্রতিটি গবাদি পশুর আর্থিক মূল্য ধরলে কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন ছাড়াবে এ বাজারে। এই একটি মৌসুমেই সারা বছরের আয়ের বড় অংশ উঠে আসে গ্রামের খামারিদের। পশু পালন ছাড়াও গ্রামের মুদি দোকান, ভুসিমালের আড়ত, পশুখাদ্য ব্যবসায়ী, ভ্যানচালক, ট্রাকমালিক, স্থানীয় শ্রমিক— সবাই ঈদুল আজহাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। পশু বিক্রির টাকার একটি অংশ কৃষিতে বিনিয়োগ হয়। এভাবে টাকার প্রবাহ অনেকাংশে বেড়ে যায়। এরই ইতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে।
ঈদুল আজহার দিন পরিবেশের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্যের কারণে যাতে পরিবেশ নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণের কাজটি হলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে তা হয় না বললেই চলে। তাই ঈদের দিন ব্যক্তি উদ্যোগে হলেও বর্জ্য দ্রুত ধুয়েমুছে ফেলতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবেন।
কোরবানির চামড়াও বেশি সময় ফেলে রাখা যাবে না। চামড়া সংরক্ষণের ওপরও আমাদের জোর দিতে হবে। কোরবানির পশুর চামড়া দেশের চামড়াশিল্পের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। গত কিছু বছর কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে মন্দা চলছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতে ফেলা কিংবা বাজারে ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এবার যেন অতীতের পরিস্থিতি ফিরে না আসে, দায়িত্বশীলদের দৃঢ় পদক্ষেপ আশা করছি। এ ছাড়া চামড়াশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা তৈরিতে সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ঈদ মোবারক।






