সম্পাদকীয়
হাসপাতালেই রোগের জন্ম কেন

কোনোভাবেই থামছে না হামের আগ্রাসন। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে শিশুমৃত্যুর মিছিল। প্রায় প্রতিদিনই আসছে ভয় ধরিয়ে দেওয়া তথ্য। হামের সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকরা যে কার্যত ‘ব্যর্থ’ হয়েছেন, তা এর মধ্যেই স্পষ্ট। গতকাল সোমবার আগামীর সময় পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে হাম’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের ‘ব্যর্থতার’ দিকেই শক্তভাবে ইঙ্গিত করছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া অধিকাংশ শিশুর পরিবারের অভিযোগ, শুরুতে অন্য রোগের চিকিৎসার জন্যই তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসা চলাকালেই শিশুদের শরীরে হামের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এই হাসপাতালে গত মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৯ শিশু মারা গেছে। তাদের অভিভাবকদের নিবিড় সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে হাসপাতাল থেকে হাম ছড়ানোর এ চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকার অন্যান্য হাসপাতাল থেকেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। হাসপাতাল থেকেই যে হাম ছড়াচ্ছে, এ অভিযোগের পক্ষে সায় দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও।
ঢাকার এ চিত্র থেকেই অনুমান করা যায়, সারা দেশের হাসপাতালগুলো হামের হটস্পট হয়ে উঠেছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রবিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ছয় শিশু মারা গেছে। এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৯ জন। এর মধ্যে ৭৫ শিশু হামে মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭ হাজার ৬৪৬। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা প্রদানে ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই দেশে হাম সংক্রমণের বীজ বোনা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর যখন হাম সংক্রমণ তীব্র আকার নিয়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করল, তখনো স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীলদের কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়নি। যেখানে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হাম সংকটের প্রথম থেকেই সতর্ক করে আসছেন, হাম খুবই উচ্চ সংক্রামক রোগ এবং এটি বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়, হামে আক্রান্ত এক শিশু থেকেই ১২ থেকে ১৮ জনের মধ্যে সংক্রমিত হওয়া সম্ভব। এখন প্রশ্ন আসে, স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকরা সংক্রমণের বিষয়টি কেন গুরুত্বসহকারে দেখলেন না? আর কেনইবা এ সংক্রমণকে দেশের স্বাস্থ্য খাতের ‘জরুরি পরিস্থিতি’ হিসেবে ঘোষণা দিলেন না?
বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের সময় আমরা আইসোলেশন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। করোনাভাইরাস অতিসংক্রামক হওয়ায় সম্ভাব্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার ঘরে কিংবা হাসপাতালের আলাদা একটি কক্ষে চারপাশের অন্যান্য মানুষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হতো। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অনেকখানি রোধ করা সম্ভব হয়েছিল। হাম যেহেতু শুধু শিশুদের মধ্যেই প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে, সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই যদি আইসোলেশন ব্যবস্থায় চিকিৎসা প্রদান সম্ভব হতো, তাহলে এত এত কোমল শিশুকে হারাতে হতো না। সংক্রমণও হয়তো অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
হাম সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছিল অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য ২০ শয্যার ফিল্ড ওয়ার্ড চালুর অপেক্ষায় রয়েছে বলেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এই ফিল্ড হাসপাতালের ধারণাটি হামের চিকিৎসা ও সংক্রমণ ঠেকাতে এ মুহূর্তে যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমরা মনে করি।
আমরা আরও মনে করি, হামের টিকা কর্মসূচিতে যারা অবহেলা করেছেন তাদের জরুরি ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা দরকার। তবে এ মুহূর্তে হাম সংক্রমণ প্রতিরোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।






