সম্পাদকীয়
সক্রিয় চক্র অসহায় শিশু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তার শিশুদের প্রতি আচরণে। যে সমাজ শিশুদের নিরাপত্তা, পুষ্টি ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সে সমাজ উন্নয়নের যত বড় দাবিই করুক না কেন, তার ভিত দুর্বল থেকে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি উদ্বেগজনক ঘটনা আমাদের সেই নির্মম বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে। একদিকে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তায় দেওয়া ফর্টিফায়েড বিস্কুট প্রকাশ্যে চোরাইপথে বাজারে বিক্রি হচ্ছে; অন্যদিকে বরিশালের গৌরনদীর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য সরবরাহ করা পাউরুটিতে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুটি ঘটনা আলাদা হলেও একটি জায়গায় এসে মিলেছে— শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা ভয়াবহভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। দুটি ঘটনাই প্রকাশিত হয়েছে গতকাল শুক্রবারের ‘আগামীর সময়’-এ।
অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বরাদ্দকৃত উচ্চমাত্রার পুষ্টিকর বিস্কুট গোপনে সংগ্রহ করে কালোবাজারে বিক্রি শুধু চুরি নয়; এটি মানবিকতার বিরুদ্ধে অপরাধ। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য যে খাদ্য বরাদ্দ, তা লুটে মুনাফা অর্জনের মানসিকতা সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার দিক প্রকাশ করে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এ অপকর্মের ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অপরাধীরা মনে করছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বা সদিচ্ছা নেই। এই দুঃসাহস প্রশাসনিক দুর্বলতারই প্রতিফলন।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের খাবারে ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ আরও ভয়াবহ। একটি শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন অভিভাবক ধরে নেন সে নিরাপদ পরিবেশে রয়েছে। সেখানে যদি খাবারের মধ্যে ধারালো ব্লেড পাওয়া যায়, তবে সেটি শুধু অবহেলা নয়; দায়িত্বহীনতার চরম উদাহরণ। এমন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী, তদারকি কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ভূমিকা কঠোরভাবে তদন্ত করা জরুরি। একটি দুর্ঘটনাই একটি শিশুর সারা জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে উন্নত বিশ্বের তুলনায় নানা অনিয়ম-বঞ্চনা, যৌন সহিংসতাসহ শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার বেশি হয় শিশু। এটি সাধারণ দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধেও অপরাধ। শিশুর প্রতি অনিয়ম, বঞ্চনা ও নিপীড়নের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মনোজগৎ বিক্ষিপ্ত থাকে, যা সুনাগরিক হয়ে ওঠার পথে অন্তরায়।
এখন সময় এসেছে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। রোহিঙ্গা শিশুদের খাদ্য কীভাবে বাজারে পৌঁছাল, এর সঙ্গে কারা জড়িত, কোথায় কোথায় এই চক্র সক্রিয়— সবকিছু দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে বিদ্যালয়ের খাবার সরবরাহ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা দরকার। উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষার পাশাপাশি আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
শিশুর মুখের খাবার নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি, অবহেলা বা দুর্নীতির সুযোগ থাকতে পারে না। যারা শিশুদের প্রাপ্য খাদ্য চুরি করে কিংবা তাদের জন্য অনিরাপদ খাবার সরবরাহ করে, তারা কেবল আইন ভঙ্গ করছে না— তারা জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। আজ শিশুদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনের সুস্থ, সক্ষম ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও নিরাপদ থাকবে না।




