সম্পাদকীয়
উন্নয়ন অথবা ক্ষমতার তদারকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সংবিধান নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা করেছে। এর উদ্দেশ্য এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করা, যেখানে নারীরা নীতিনির্ধারণ, আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। আইন প্রণয়ন, বাজেট আলোচনা, প্রশ্নোত্তর, কমিটির কার্যক্রম কিংবা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের সাংবিধানিক মর্যাদা অন্য সংসদ সদস্যদের চেয়ে কম নয়। তদুপরি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের ভূমিকা, দায়িত্ব ও কার্যপরিধি নিয়ে অনেক সময় বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের কাজের ক্ষেত্র ও জবাবদিহির কাঠামো কী হবে? যেহেতু তারা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক আসন থেকে নির্বাচিত হন না, তাই কোনো এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমের তদারকি বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় দেখা যায়, একই এলাকায় সাধারণ আসনের সংসদ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যের মধ্যে দায়িত্বের সীমারেখা নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয়ের পরিবর্তে দ্বন্দ্ব বাড়ে, যা সম্প্রতি ঘটেছে। এ বিষয় নিয়ে গতকাল শনিবার ‘আগামীর সময়’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বিরোধী দলের আপত্তির পেছনেও কিছু যৌক্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাদের বক্তব্য, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ওপর অন্য কোনো প্রতিনিধি কর্তৃত্ব বা তদারকির ভূমিকা পালন করলে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদেরও যুক্তি, সংসদের সদস্য হিসেবে তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নয়, বাস্তব কাজের সুযোগও প্রয়োজন। এ অবস্থায় নির্বাচিত ও মনোনীতদের মধ্যে বিপরীতমুখী অবস্থান দেখা দিতে পারে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংবিধানের নির্দেশনা এবং আইনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা। কোনো সংসদ সদস্যের ক্ষমতা বা দায়িত্ব ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। যদি আইন বা বিধিমালায় সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট তদারকি বা অংশগ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা সবাইকে মানতে হবে। আবার যদি সে ক্ষমতা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত না থাকে, তাহলে প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে নতুন ক্ষমতা সৃষ্টি করাও সমীচীন নয়। আইনের শাসনের মূলনীতি হলো— ক্ষমতার উৎস হতে হবে আইন।
এখানে সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা দূর করতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা। কোন ক্ষেত্রে তারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন, কোন ক্ষেত্রে পরামর্শ দেবেন এবং কোথায় সরাসরি তদারকির সুযোগ থাকবে— এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে দ্বন্দ্ব নয়, সহযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার এ ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামো দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’-এ নতুন ২৬ক ধারা যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রস্তাবিত বিধানে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তাদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের এক বা একাধিক সাধারণ সংসদীয় এলাকায় উন্নয়নকাজের দায়িত্ব দিতে পারবে। এ বিষয়ে স্পিকারকে অবহিত করতে হবে। বিরোধী দল ও সমালোচকদের মতে, সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এখতিয়ারে এ ধরনের হস্তক্ষেপ ক্ষমতার পৃথককরণ নীতি ও সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের স্বাধীনতার পরিপন্থী। এ কথা সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সংঘাতে নয়, সমন্বয়ে। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা, জনপ্রতিনিধিদের পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন আইনের স্পষ্টতা, দায়িত্বের স্বচ্ছতা এবং সহযোগিতামূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। উত্তম পন্থা হলো, সংসদে আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি নিরূপণ করা।







