সম্পাদকীয়
আস্থায় আঘাত

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। অসুস্থ মানুষ হাসপাতালের দরজায় যায় জীবন বাঁচানো ও সুস্থ হওয়ার আশায়, নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে ব্যবসায়ীর হাতে টাকা তুলে দিতে নয়। অথচ দেশের কিছু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার নামে যে বাণিজ্য চলছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই মানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গতকাল রবিবার আগামীর সময়-এর প্রধান শিরোনাম— ‘৫০ হাজারের চুক্তি বিল দেড় লাখ’— এই ভয়াবহ বাস্তবতারই চিত্র। রোগীর সঙ্গে একটি অঙ্কে চিকিৎসার চুক্তি, কিন্তু হাসপাতাল ছাড়ার সময় হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি বিল। প্রশ্ন হচ্ছে— রোগী কি চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, নাকি খরচের ফাঁদে পড়তে?
বেসরকারি হাসপাতাল মানেই অনিয়ম, ফাঁদ, গলাকাটা বা রোগীর প্রতি অমানবিক আচরণ ইত্যাকার নেতিবাচক অভিধা গায়ে সেঁটে আছে। সব হাসপাতালই যে এমন, সে কথা বলা যাবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। কিন্তু যেখানে রোগীর অসহায়ত্বকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে আপত্তি তোলার ভাষা অবশ্যই কঠোর হওয়া উচিত। কারণ রোগী দরকষাকষির অবস্থায় থাকেন না। স্বজনরা আতঙ্কিত থাকেন, দ্রুত চিকিৎসা চান এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন। এই দুর্বল অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অতিরিক্ত ওষুধ, বাড়তি চিকিৎসা চার্জ কিংবা অস্পষ্ট বিল চাপিয়ে দেওয়া নিছক বাণিজ্যিক অনিয়ম নয়, এটি রোগীর আস্থার সঙ্গে প্রতারণা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় প্রসূতিদের ক্ষেত্রে। স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবশ্য চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে সিজার জীবন রক্ষাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু প্রয়োজন না থাকলেও শুধু হাসপাতালের আয় বাড়ানোর জন্য অস্ত্রোপচারে উৎসাহিত করা চিকিৎসা নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়। একজন মা এবং অনাগত শিশুর শরীরকে কোনো প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হিসাবের অংশ বানানো গ্রহণযোগ্য নয়।
একই প্রবণতা অন্য রোগের ক্ষেত্রেও নানাভাবে বিরাজমান। রোগীর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরীক্ষা, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, একাধিক চিকিৎসা প্যাকেজ, অতিরিক্ত বেড চার্জ কিংবা এমন সব খরচের তালিকা দেওয়া হয়, যার ব্যাখ্যা রোগী বা স্বজনরা সহজে বুঝতে পারেন না। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, জমিজমা বিক্রি করে হয়ে পড়ে নিঃস্ব।
প্রকাশিত প্রতিবেদনটি শুধু একটি হাসপাতালের অভিযোগ নয়; পুরো বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন। যদি রোগীকে আগে এক ধরনের ব্যয় জানিয়ে পরে নানা খাতে কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়া হয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থের প্রতিটি খাতের স্বচ্ছ হিসাব থাকা আবশ্যক। রোগীর স্বজনকে অন্ধকারে রেখে চিকিৎসা-ব্যবসা চলতে পারে না।
এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। একটি হাসপাতালের নির্দিষ্ট ধরনের রোগে অস্বাভাবিক হারে সিজার বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রবণতা থাকলে সেটিও নজরদারির আওতায় আসা উচিত।
প্রসূতি চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। অস্ত্রোপচার কেন করা হলো, এর চিকিৎসাগত কারণ রোগীর নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। সরকারিভাবে এমন নির্দেশনাও রয়েছে। অস্বাভাবিক হারে সিজার করছে— এমন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিরীক্ষা করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসকদের স্বাধীন পেশাগত সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত না করে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ ও বাণিজ্যিক প্রণোদনা ঠেকানোই হবে নীতির লক্ষ্য।
রাষ্ট্রকে তাই স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে— বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবসা ও মুনাফা করতে পারবে; কিন্তু রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে প্রতারণা করতে পারবে না। চিকিৎসার মূল্য থাকতে পারে, কিন্তু রোগীর জীবন ও আতঙ্কের কোনো বাজারদর নেই।



