সম্পাদকীয়
সতর্ক সংকেতের পরও সেই বিপর্যয়

কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার এবারও ছিল ব্যাপক বিশৃঙ্খলায় পূর্ণ। আর্থিক ক্ষতির মুখ থেকে বাঁচানো যায়নি মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের। ন্যায্য দাম ও ক্রেতার অভাবে বহু জায়গায় চামড়া রাস্তায় ফেলে যাওয়া ও মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি হয়েছে কাঁচা চামড়া। সোমবার ‘আগামীর সময়’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘চামড়া রহস্য’ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৩ সালে কোরবানির পশুর প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়ার (গরু) দাম ছিল প্রায় ৯০ টাকা। এ বছর সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় ৬৫ টাকা। অর্থাৎ ১৩ বছরে দাম বাড়া তো দূরের কথা, উল্টো কমেছে ২৫ টাকা। প্রায় ২৮ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় কমেনি, বরং বেড়েছে। এখানে প্রশ্ন আসে, যে খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, সেই খাতের মূল কাঁচামাল কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ১৩ বছর ধরে কেন কমছে? বিশ্লেষকরা এক্ষেত্রে সিন্ডিকেটভিত্তিক বাজার কাঠামোকে দায়ী করছেন। এবার ঈদুল আজহার আগে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এ সংকটের বিষয়ে অতীতের উদাহরণ টেনে গণমাধ্যম থেকে দায়িত্বশীলদের সতর্ক করা হয়েছিল। আগামীর সময় পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। তার পরও দায়িত্বশীলরা কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার ফলে অতীতের মতোই চামড়ার বাজারের পুরনো সিন্ডিকেট তাদের স্বার্থ হাসিল করেছে। বিপরীতে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম দামটুকুও জোটেনি কোরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে।
ট্যানারি মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, বাংলাদেশের চামড়া আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানতে পারছে না। বিশেষ করে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উন্নত বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার প্রবেশ সীমিত। চীন ছাড়া বড় ক্রেতা নেই। তবে এ বক্তব্যের মধ্যেই বড় অসংগতি রয়েছে বলে আমরা মনে করি। যদি আন্তর্জাতিক বাজার এত খারাপ হয়, তাহলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় প্রতি বছর বাড়ছে কীভাবে? যদি বাজার সংকুচিতই হয়, তাহলে ট্যানারি খাতের বড় উদ্যোক্তারা কেন নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত সমস্যা আন্তর্জাতিক বাজারে নয়; বরং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার কাঠামোতেই। মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, কাঁচা চামড়ার বাজার মূলত কয়েকটি বড় গ্রুপ ও ট্যানারি মালিকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ঈদের সময় তারা জোট বেঁধে কম দামে চামড়া কিনে থাকেন। ফলে গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজার পায় না। অনেক এলাকায় পাইকাররা ইচ্ছা করেই দেরিতে বাজারে আসে, যাতে বাজারে চামড়া পচে যাওয়ার ভয় তৈরি হয় এবং কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন সংগ্রাহকরা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য মূলত পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্পের ওপর অত্যধিক মাত্রায় নির্ভরশীল। চামড়াশিল্প এক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক বাজার এখনো তৈরি হয়নি। সে তুলনায় ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে কাঁচা চামড়ার বাজার বেশি প্রতিযোগিতামূলক। দেশের চামড়া খাত দীর্ঘদিন ‘লো-ভ্যালু ট্র্যাপ’-এ আটকে আছে। অর্থাৎ কম দামে কাঁচামাল কিনে সীমিত মূল্য সংযোজন করে রপ্তানি করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে আগামীতে কোরবানির চামড়ার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে লাভবান হবে মুষ্টিমেয় চামড়া ব্যবসায়ীর দল। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। সম্ভাবনাময় চামড়া খাতের বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারকে কঠোর হতে হবে বলে আমরা মনে করি।




