অসম লড়াই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দৌরাত্ম্য কীভাবে আমাদের কৃষি অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে, তার নমুনা পত্রিকার পাতায় মাঝেমধ্যেই উঠে আসে। গতকাল সোমবার আগামীর সময়ে ‘হাজার লাউ বেচেও মিলছে না ১ কেজি মাংস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি এই বেদনাদায়ক বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে। পঞ্চগড়ের আটোয়ারীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে কৃষকরা মাত্র ১ টাকায় চারটি লাউ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেখানে ১ কেজি গরুর মাংস কিনতে তাদের সহস্রাধিক লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ চরম পরিহাসের বিষয় হলো, ঠিক একই সময়ে ঢাকা কিংবা জেলা শহরের খুচরা বাজারে সাধারণ ভোক্তাকে একেকটি লাউ কিনতে হচ্ছে ৩০-৫০ টাকায়। এ বৈষম্য গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগামহীন নৈরাজ্যেরই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবতার এ নির্মম চিত্র আমাদের সব উন্নয়নের স্লোগানকে ফাঁপা ও অর্থহীন প্রমাণ করে।
কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর ভর করেই দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। অথচ বছরের পর বছর কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সার, বীজ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে যখন উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী, তখন ফসল ঘরে তোলার পর কৃষক তার ন্যায্যমূল্য পাওয়া তো দূরের কথা, মূল পুঁজিটুকুও হারাচ্ছেন। বাজারে যখন কোনো সবজির বাম্পার ফলন হয়, তখন তা কৃষকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। হিমাগারের অভাব, দ্রুত পচনশীল পণ্যের সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার অভাব এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় প্রান্তিক চাষিরা পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছেন ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের কাছে।
মাঠপর্যায়ে যে লাউয়ের দাম ২৫ পয়সা, তা মাত্র কয়েক হাত ঘুরে শহরের খুচরা বাজারে কীভাবে ৫০ টাকায় বিক্রি হয় এবং মাঝখানের বিপুল পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির লভ্যাংশ কার পকেটে যায়, সেটা একটা প্রশ্ন। উত্তরটা যে আমাদের খুব অজানা, তাও নয়— পরিবহন খাতের অবৈধ চাঁদাবাজি, আড়তদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার তদারকির অভাবই একদিকে ভোক্তাকে চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে; অন্যদিকে উৎপাদক কৃষক থেকে যাচ্ছেন নিঃস্ব। এ বৈষম্য শুধু অনৈতিকই নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষি খাতের জন্য এক আত্মঘাতী পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এভাবে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে থাকলে এবং শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন না পেলে কৃষকরা একদিন চাষাবাদে ইস্তফা দিতে বাধ্য হবেন। কৃষকরা যদি ক্ষেতবিমুখ হয়ে যান, তবে তা পুরো দেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে, ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে, যা পুরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
এই চরম নৈরাজ্য ও সংকট উত্তরণে সরকারকে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি উপজেলায় সরকারি উদ্যোগে কোল্ডস্টোরেজ বা বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপন করতে হবে, যাতে কৃষকরা দাম কম থাকলে সবজি সংরক্ষণ করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ‘কৃষক অ্যাপ’ বা সরাসরি উন্মুক্ত সরকারি ক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এবং ঢাকা ও বড় বড় শহরের পাইকারি বাজারগুলোতে নিয়মিত ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষাই যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি, তবে উন্নয়নের সব সূচকই অর্থহীন হয়ে পড়বে। সরকার অতিদ্রুত এই বাজার সিন্ডিকেট ভাঙবে এবং কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করবে— এটিই আমাদের প্রত্যাশা।



