আগামীর চোখ
সমাজটাই আসলে জীবন্ত লাশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
অভাগী মা নূরজাহান বেগম,
আপনার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করে কিছু বলতে চাই। স্মরণে আসছে প্রখ্যাত শিল্পী নচিকেতার গানের কটি লাইন, ‘নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি/সবচেয়ে কম দামি ছিলাম একমাত্র আমি।’ আপনার সন্তানসম এই নালায়েককে ক্ষমা করবেন, আপনার করুণ মৃত্যুর জন্য সমাজের মানুষ হিসেবে নিজেকেও অপরাধী মনে হচ্ছে।
আপনার সুন্দর একটা জীবন ছিল, ছিল চমৎকার সুখী সংসার। সন্তানদের ‘উচ্চশিক্ষিত মানুষ’ করে তুলেছেন। আশা ছিল শেষ জীবনে তারা আপনার প্রতি এগিয়ে দেবে নির্ভরতার হাত। কিন্তু বিধিবাম! জীবনের শেষ মুহূর্তে তারা পাশে তো ছিলেনই না। বরং অবহেলার মাত্রা এতটাই ছিল যে, পাশের ঘরে আপনি মরে পড়ে আছেন, সে খবরটুকুও সন্তান জানতে পারেনি। আপনার গলিত দেহের গন্ধেও তাদের টনক নড়েছে কি না কে জানে! সমাজের চাপে হয়তো তারা কিছুক্ষণ অধোবদন হয়ে থাকবেন, কিন্তু তাদের মনের গভীরে এ লজ্জার কোনো রেখাপাত ঘটবে কি না সন্দেহ। আপনার তিন সন্তানই শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত। ছাত্রদের তারা কী শিক্ষা দেবে কে জানে।
বৃদ্ধাশ্রমের চেয়েও ভয়ংকর-সন্তানদের তৈরি চার দেয়ালের ভেতরের একাকিত্ব
সমাজ যখন পচে যায়, তখন তার দুর্গন্ধ চারপাশের বাতাস ভারী করে তোলে। ‘শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত ও সভ্য’ সন্তানদের নৈতিকতার পচনও এ সমাজের শরীরে এক বড় দগদগে ঘা। যে মা নিজের রক্ত জল করে, জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের এই ‘যোগ্য’ স্তরে পৌঁছে দিলেন, মৃত্যুর পর তার কপালে জুটল একাকী ঘরের কোণে পচে গলে যাওয়া! ‘ব্যস্ত’ সন্তানদের মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় থাকে না, কিন্তু মায়ের পেনশনের টাকা কিংবা পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ নিতে ঠিকই তারা ঝড়ের গতিতে হাজির হন!
মাগো,
আমরা প্রায়ই বৃদ্ধাশ্রমের বাস্তবতা নিয়ে মায়াকান্না করি। কিন্তু আপনার ঘটনা প্রমাণ করল, বৃদ্ধাশ্রমের চেয়েও ভয়ংকর- সন্তানদের তৈরি চার দেয়ালের ভেতরের একাকিত্ব। বৃদ্ধাশ্রমে অন্তত সমবয়সী কিছু মানুষ ও কথা বলার কেউ থাকে। কিন্তু নিজের ঘরে, সন্তানদের পাশে রেখে যখন একজন মায়ের লাশ ঘরের ভেতর পচতে থাকে এবং প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পাওয়ার পর পুলিশ ডেকে সেই লাশ উদ্ধার করে, তখন বুঝতে হবে এ সমাজই আসলে এক জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছে।
আপনার এ ট্র্যাজেডি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি চারপাশের বহু চেনা ঘরের গোপন সত্য। আমরা প্রতিনিয়ত মা-বাবাকে বোঝা ভাবছি, করছি অবহেলা। ধিক্কার সেই সন্তানদের, ধিক্কার এই পঙ্গু সমাজকে!
ইতি
আপনার এক অযোগ্য সন্তান




