বীরের পতন ও রাষ্ট্রের দায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার ফরহাদের মৃত্যু দেশ ও জাতিকে আবার প্রশ্নের মুখোমুখি রেখে গেল। মাদকবিরোধী তরুণ সমাজকর্মী ফরহাদকে পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার খবর শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের সংবাদ নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য এক সতর্কবার্তা। সমাজের অবক্ষয়ের এক নগ্ন প্রকাশও।
একজন তরুণ, যিনি সমাজকে মাদকমুক্ত করার জন্য লড়াই করছিলেন বীরের মতো, তিনি যদি এমন নৃশংসতার শিকার হন, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিরাপদে থাকবে? বাস্তবতার নিরিখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— ফরহাদের হত্যার পেছনে কি মাদক কারবারি চক্রের হাত রয়েছে? যারা মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের কি ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই বর্বরোচিত বারতা? তরুণ সমাজের যে অংশটা বখে যাওয়ায় আমরা হতাশা প্রকাশ করি, সেখানে সাধারণ এক সবজি বিক্রেতা তরুণ আশার আলো দেখাচ্ছিলেন। স্থানীয় নানা সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার সেই তরুণের পুড়িয়ে হত্যাকে মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।
গণমাধ্যম বলছে, মাদকবিরোধী নানা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন ফরহাদ। সম্প্রতি মুক্তাগাছা ভূমি অফিস থেকে বস্তা ভরে কাগজপত্র চুরি হওয়ার সময়ও তিনি বাধা দেন। সেটির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে কিছু লোকের সঙ্গে ফরহাদের বিরোধ ছিল। ফরহাদ যে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এবং দেশ-জাতি, সমাজের কল্যাণাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, সেটি স্পষ্ট।
হত্যাকারীদের বিষয় তদন্তে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, দেশের বহু এলাকায় মাদক কারবার একটি শক্তিশালী অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকে স্থানীয় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, সমাজবিরোধী এবং কখনো কখনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া। ফলে যারা মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে, তারা প্রায়ই হুমকি, হামলা কিংবা সামাজিক নিপীড়নের শিকার হন। ফরহাদের হত্যাকাণ্ড সেই অশুভ বাস্তবতাই সামনে নিয়ে এসেছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সমাজে এমন একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে যে মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে জীবন দিতে হতে পারে। এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র হতে পারে না। একজন সমাজকর্মীকে যদি পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তির মৃত্যু নয়; আইনের শাসনের প্রতি চ্যালেঞ্জ এবং অপরাধীদের প্রকাশ্য দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।
এখন প্রশ্ন, স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী একজন তরুণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল কার? কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, যেখানে অপরাধীরা এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠল? যদি ধরে নেওয়া হয় মাদক কারবারিরা এর সঙ্গে জড়িত, তবে এটি প্রমাণ করবে যে তারা শুধু মাদক বিক্রিই করছে না; বরং পুরো সমাজকে জিম্মি করার শক্তিও অর্জন করেছে। আর যদি রাষ্ট্র এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক ফরহাদকে প্রাণ দিতে হতে পারে।
দেশের প্রতিটি এলাকায় মাদক ব্যবসার গডফাদারদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। শুধু মাদকসেবী বা ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না; মাদকের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তিকে ধ্বংস করতে হবে সবার অাগে।
ফরহাদের মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। তার আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব। যারা সমাজকে মাদকমুক্ত করতে এগিয়ে আসে, তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।



