সম্পাদকীয়
দাবি আদায় হোক শপথও রক্ষা করুন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নানা সংকটে জর্জরিত দেশের হাসপাতালগুলো। অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের অপ্রতুলতা এবং সেই সঙ্গে আধুনিক রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতির অভাব তো রয়েছেই। তার ওপর নিয়মিত বিরতিতে কখনো চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক, কখনো নার্সদের আন্দোলন; রোগীরা পড়েন ভোগান্তিতে। সোমবার ‘দৈনিক আগামীর সময়’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা, রোগী ভোগান্তি’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে সেই চিত্র আবারও সামনে এসেছে। সরকারি নির্দেশনা প্রত্যাখ্যান করে সারা দেশে কর্মবিরতি পালন করছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ছয় দাবিতে এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে সমন্বিত ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐক্য পরিষদ। দাবিগুলো হলো— ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা বৃদ্ধি, এফসিপিএস পলিসি বাতিল, ভর্তি ফি হ্রাস, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার সার্ভিসে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য েবতন কাঠামো প্রণয়ন।
ভারত, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কায় চিকিৎসক ও নার্সরা যেখানে তুলনামূলকভাবে সম্মানজনক বেতন ও সুবিধার অধিকারী, সেখানে বাংলাদেশে তাদের উপার্জন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা এর বাইরে নন। বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পান। বর্তমান উচ্চমূল্যের বাজারে এ টাকায় জীবনযাপন ভীষণ কঠিন, পরিশ্রম অনুযায়ী অপ্রতুলও। একজন চিকিৎসক যখন জানেন তার জ্ঞান, দক্ষতা ও পরিশ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য প্রাপ্তি নেই, তখন তার মনে জন্ম নেয় বঞ্চনার বোধ। এই বঞ্চনাই কর্মস্পৃহা নিঃশেষ করে এবং অগণিত মেধাবী চিকিৎসক-নার্সকে প্রবাসমুখী করে তোলে। এভাবে যদি শ্রমের অবমূল্যায়ন হতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো একসময় দক্ষ জনশক্তিহীন হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা যৌক্তিকভাবেই বাড়ানো দরকার। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইন্টার্ন চিকিৎসক, নিয়মিত চিকিৎসক কিংবা নার্সদের আন্দোলনে রোগী ও তার স্বজনদেরই ভুগতে হয়। চরম অব্যবস্থাপনা, অবহেলার শিকার হওয়ার পরও মানুষ হাসপাতালে যান। বাধ্য হয়েই যেতে হয়। এ মানুষগুলোর প্রতি চিকিৎসকদের আরও মানবিক আচরণ আমরা প্রত্যাশা করি। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের চলমান আন্দোলনেও রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দাবি আদায় করতে গিয়ে রোগীদের ভোগান্তির মধ্যে ফেলা চিকিৎসকদের পেশাগত শপথেরও পরিপন্থী। চিকিৎসক পেশা শুধু চাকরি নয়; বরং এটি এক অনন্ত মানবিক ব্রত। মানুষের দুঃখ লাঘব ও প্রাণ রক্ষায় সর্বদা নিয়োজিত থাকার মধ্যেই এ পেশার মহত্ত্ব। তাই ইন্টার্ন চিকিৎসক ও সার্বিকভাবে চিকিৎসা সেবাদানকারীরা এ বিষয়ে আরও সতর্ক ও মানবিক হবেন বলে আমরা আশা রাখি।
একটি জাতি কীভাবে তার জ্ঞানবাহক ও জীবন রক্ষাকারীদের মর্যাদা দেয়, তার দ্বারা সেই জাতির সভ্যতার মান নির্ণীত হয়। চিকিৎসকদের অবহেলা করা মানে মানবিকতাকেই অবহেলা করা। তাদের প্রতি বৈষম্য ও বঞ্চনা যদি অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধীরে ধীরে অকার্যকরতায় নিমজ্জিত হবে এবং একদিন শুধু রোগীর দেহ নয়, জাতির মননও অসুস্থ হয়ে পড়বে। এ কারণে রাষ্ট্রীয় নীতিতে মৌলিক সংস্কারও প্রয়োজন। চিকিৎসক-নার্সদের জন্য আলাদা ও সময়োপযোগী বেতনকাঠামো প্রণয়ন করা যায় কি না, সে বিষয়েও ভাবতে হবে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম বেতনকাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এটা শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা নয়; বরং মানবিক দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। এতে হাসপাতাল ও রোগীদের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ ও সেবার মানও বাড়বে। আমরা এ বিষয়ে দ্রুত সমাধান প্রত্যাশা করি।




