আগামীর চোখ
ভূমিহীন ভূমি অফিস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মহাত্মন
ভূমি অফিসার, ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ
শুভেচ্ছা নেবেন। আপনি ভূমি অফিসার। আপনার কাজ ভূমির হিসাব রাখা। অথচ আপনার নিজেরই কোনো ভূমি নেই। এমনকি আপনার দপ্তরে যাওয়ার রাস্তাও নেই।
সংবাদটি পড়ে প্রথমে একটু হেসেছিলাম, স্যার। তারপর সত্যটা বুঝে কেঁদে ফেললাম।
এ যেন এক গহিন দর্শন! যে দপ্তর আমাদের মাটির মালিকানা শেখায়, সে নিজেই বাতাসে ভেসে আছে। যে মানুষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ইঞ্চি ইঞ্চি মাপ নেয়, তার নিজের দাঁড়ানোর মতো একটু জমি নেই। ঈশ্বরগঞ্জের সোহাগী ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন পরম সত্য প্রকাশ করছে—‘মানুষ খালি হাতে আসে, খালি হাতে যায়।’ আপনি সেই অনিত্যতারই জীবিত প্রতীক।
শুনলাম, আগে নাকি এক বিশাল চওড়া পথ ছিল। গরুর গাড়িও চলত। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর, স্যার। মানুষের লোভ সে পথ খেয়ে ফেলেছে। রাস্তার জায়গায় ঘর উঠেছে, কাগজ-কলমে দখল হয়েছে। মায়াজাল বটে! আপনি অসাধু চক্রের দলিল বানালেন, আর সে চক্রই আপনার যাতায়াতের পথ গিলে খেল। এ যেন নিজের খোদাই করা গর্তে নিজেই পড়ে যাওয়া!
আমি ভূমিহীন কারণ আমার কোনো খতিয়ান নেই। আর আপনার আস্ত একটা অফিস আছে; কিন্তু তার নিচে কোনো ভিত্তি নেই
এখন শুনছি, পুকুরপাড়ের একচিলতে সরু মেঠো পথই আপনার ভরসা। সেবাগ্রহীতারা সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে যায়। বর্ষা এলে পুকুরের জল আর রাস্তার কাদা এক হয়ে যায়। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রবীণ আব্দুল্লাহ আল বাকীর কাঁপা পা দুটো যেন থমকে দাঁড়ায়।
নায়েব সাহেব বলেন, বরাদ্দ নাকি আসবে। ইউএনও ম্যাডাম বলেন, বরাদ্দ নাকি আসেনি। এক মহাকাশীয় দূরত্ব! বরাদ্দের এই আসা-না-আসার দোলাচল যেন এক অন্তহীন মরীচিকা। আর ঈশ্বরগঞ্জের এসিল্যান্ড সাহেবের ফোন বাজে, বাজতেই থাকে... কিন্তু সাড়া মেলে না। তিনি যেন ইহলোকের সব হট্টগোল এড়িয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন।
একটি ছোট্ট প্রশ্ন স্যার: যে অফিস নিজের পথটুকু চিহ্নিত করতে পারে না, সে কীভাবে অন্যের সীমানা ঠিক করে?
আসলে আমরা দুজনেই এক নদীর দুই তীর, স্যার।
আমি ভূমিহীন, কারণ আমার কোনো খতিয়ান নেই।
আর আপনার আস্ত একটা অফিস আছে; কিন্তু তার নিচে কোনো ভিত্তি নেই।
পার্থক্য শুধু একটাই— আমি গৃহহীন গৃহস্থ, আর আপনি গৃহহীন রাজা।
ঈশ্বর আপনার অফিসে আসার জন্য অন্তত এক ফুট মাটির ব্যবস্থা করুন, আর ঈশ্বরগঞ্জের
মহতী আমলাতন্ত্রকে জাগিয়ে দিন।
ইতি
একজন ছায়াহীন, পথহীন ও ভূমিহীন নাগরিক




