সম্পাদকীয়
অবহেলায় প্রাণ যায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে অবহেলাজনিত মৃত্যুর যে অভিযোগ উঠেছিল, তা স্পষ্ট ও প্রমাণিত হলো। গতকাল বৃহস্পতিবার আগামীর সময়ে এক বিশেষ প্রতিবেদনে তদন্ত রিপোর্টের বরাত দিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা ভয়াবহ দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। বিষাক্ত গ্যাস, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ এবং চরম অবহেলার কারণে ১০ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাতের ভয়াবহ বাস্তবতাকে আবারও উদোম করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সতর্কবার্তা, আদালতের নির্দেশনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সরকারি নীতিমালা থাকার পরও যদি একসঙ্গে ১০ জন শ্রমিককে প্রাণ দিতে হয়, তাহলে এটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলা চলে না; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, অবহেলা এবং দায়হীনতার নির্মম উদাহরণ।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্যাসমুক্ত না করেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরু করা হচ্ছিল। নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি, গ্যাসমুক্ত ঘোষণা ছাড়াই জাহাজে শ্রমিকদের প্রবেশ করানো হয়েছে কিংবা প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল। তাহলে প্রশ্ন ওঠে— এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করছিল? ট্যাংক পরীক্ষা না করেই গ্যাসমুক্ত সনদ নেওয়া মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কিছু নয়। এমন সনদ যারা দিয়েছেন তারাও সমানভাবে দায়ী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একের পর এক প্রাণহানির পরও শিক্ষা গ্রহণের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), পরিবেশবাদী সংগঠন এবং মানবাধিকারকর্মীরা বহু বছর ধরে এ শিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। আদালতও বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। তারপরও যদি বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে, তাহলে বোঝা যায় সমস্যা শুধু কারিগরি নয়; সমস্যা দায়বদ্ধতার অভাব, তদারকির দুর্বলতা এবং আইন প্রয়োগে অনীহা।
এখানে শুধু মালিকপক্ষকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, পরিদর্শন কর্তৃপক্ষ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং শ্রম অধিদপ্তরেরও জবাবদিহি রয়েছে। কোনো জাহাজ কাটার আগে সেটি নিরাপদ কি না, বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত কি না, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা আছে কি না— এসব নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও। যদি এসব সংস্থা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত, তাহলে হয়তো ১০টি পরিবারে সারা জীবনের জন্য হাহাকার নেমে আসত না। পরিবারে শুধু কিছু টাকা বা চেক ধরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কি সব চুকেবুকে যায়?
এখন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদন আলমারিতে তুলে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই সময়ের চাহিদা।
একই সঙ্গে প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। গ্যাসমুক্ত সনদ ছাড়া কোনো জাহাজ কাটার অনুমতি দেওয়া যাবে না। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ও স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তে যে গাফিলতি ও অদক্ষ উদ্ধারকাজের অভিযোগ উঠে এসেছে, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আবার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে না, সেটার নিশ্চয়তা দেবে কে?
সীতাকুণ্ডের ১০ শ্রমিকের মৃত্যু নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় তদারকি, শিল্পব্যবস্থাপনা এবং মানবিক মূল্যবোধের কঠিন পরীক্ষাও। এ মৃত্যুগুলোকে যদি আমরা আরেকটি পরিসংখ্যান হিসেবে ভুলে যাই, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক শ্রমিকের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের শিল্পোন্নয়নের গল্প লিখতে হবে। সেই লজ্জা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে এখনই কঠোর জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং মানবজীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।





