দুর্ভোগের দীর্ঘ মরণছায়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন শায়লা আক্তার। চলন্ত মাহিন্দ্র গাড়ির পেছনের কোনায় বসেছিলেন। হাত দিয়ে শক্ত করে ধরেছিলেন লোহার রড। কিন্তু সেই হাতের জোর কি পুলিশের গাড়ির ধাক্কার চেয়ে বেশি হতে পারে? পারল না। ছিটকে পড়লেন পিচঢালা রাস্তায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচার হলো। ১৩ দিন পর পাঠানো হলো ঢাকার সিআরপিতে। কিন্তু ততক্ষণে নিয়তি তার খেলা খেলে দিয়েছে। কোমর থেকে পা পর্যন্ত পুরোটাই অবশ, অসাড়। শরীরের স্বাভাবিক কোনো সংকেতও আর পৌঁছায় না মস্তিষ্কে।
অন্য এক বিষণ্ণ দুপুরে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন পরিদর্শক আব্দুস সোবহান। একটি অপরাধের তদন্তে যাচ্ছিলেন। পথে একটা অচেনা দানব গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে পিষে দিয়ে চলে গেল। শায়লার মতো সোবহানও আজ হুইলচেয়ারে বন্দি। একাকী ঘরে জানালার বাইরে তাকিয়ে কাটে দিন।
এ দুই দুর্ঘটনা কারও জীবন কেড়ে নেয়নি ঠিকই, কিন্তু জ্যান্ত মানুষকে বানিয়ে দিয়েছে একেকটা জীবন্ত লাশ। কেড়ে নিয়েছে বেঁচে থাকার কোলাহল। তাদের পরিবারগুলোকে ঠেলে দিয়েছে এক অন্তহীন, অতল অন্ধকারের গহ্বরে।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষরা আমাদের সমাজে এক অদৃশ্য অধ্যায়। কোথাও মৃত্যু হলে খবরের কাগজে বড় বড় হরফে শিরোনাম হয়। কিন্তু যারা আজীবন পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে রইলেন? রাষ্ট্রের নীতিগত মনোযোগটাই এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত।
সংকটটা শুধু টাকার নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সহমর্মিতার বড় অভাব। এসব পঙ্গু, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো সমন্বিত সামাজিক কাঠামো দেশে গড়ে ওঠেনি। যাওবা কাগজে-কলমে একটু আছে, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জাঁতাকলে পিষ্ট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমাদের ভঙ্গুর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সমাজের এক চরম উদাসীনতা।
দেশে দুর্ঘটনায় ‘পুনর্বাসন’ শব্দটা কেবল কাগজে-কলমে। জরুরি চিকিৎসা হয়তো মেলে, কিন্তু তারপর? দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি মানসিক কাউন্সেলিং কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ— সবই শূন্য
আমাদের রাজনীতিতেও মৃত্যুর চর্চা বেশি। রাজনৈতিক মৃত্যু নানাভাবে আলো পায়। কিন্তু দুর্ঘটনার পর বেঁচে থাকার যে আর্তনাদ, যে চরম হতাশা, তা আড়ালেই থেকে যায়।
দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একজনের চলে যাওয়া নয়; এটি আসলে একটি গোটা পরিবারের আজীবন কষ্ট টানার শুরু। শোকের ঘোর কাটার আগেই উনুন নিভে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় রোজগার। পরিবারের বেঁচে থাকা মানুষগুলোর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান— সব অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কেবল শোক নয়, একে বলে ‘অর্থনৈতিক ধাক্কা’। একটা পরিবারের সঞ্চয়, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ— সব একসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পরিবারটি তলিয়ে যায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আর সামাজিক অপমানে।
প্রতি বছর এই দেশে তিন থেকে চার লাখ মানুষ দুর্ঘটনায় জখম হন। মৃত্যুর তুলনায় এই সংখ্যা ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি। আহত হয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটা অনেক গভীর এবং দীর্ঘ। আজীবন চলাচলের এই সীমাবদ্ধতা সহজে শেষ হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ২-৩ শতাংশ। বাংলাদেশও এ তালিকার বাইরে নয়।
এই পঙ্গুত্ব মৃত্যুর চেয়েও কঠিন এক বাস্তব। কর্মক্ষমতা হারালে আত্মসম্মান কমে; মানসিক চাপ আর অবসাদ বাড়ে। এটি এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আমাদের দেশে বেশিরভাগ পরিবার একজনের আয়ের ওপর বাঁচে। দুর্ঘটনা এলে সম্পদ বিক্রি করতে হয়। শেষ ঠিকানা হয় দারিদ্র্যসীমার নিচে।
দেশে দুর্ঘটনায় ‘পুনর্বাসন’ শব্দটা কেবল কাগজে-কলমে। জরুরি চিকিৎসা হয়তো মেলে, কিন্তু তারপর? দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি, মানসিক কাউন্সেলিং কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ— সবই শূন্য।
সরকারি ক্ষতিপূরণের নিয়ম আছে বটে, কিন্তু তার প্রক্রিয়া গোলকধাঁধার মতো। সাধারণ মানুষ তা জানেই না। নিহতের পরিবারকে ৫ লাখ আর গুরুতর আহতকে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে কজন পান? আবেদনের সময়সীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামের গরিব মানুষ জরুরি কাগজপত্রই পারেন না জোগাড় করতে। ফলে সিংহভাগ মানুষ আবেদনই করতে পারেন না।
আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু আহত মানুষের জন্য সেখানে ঠাঁই নেই। অভিযোগ ওঠে, এই ফান্ডের টাকা প্রশাসনের একাংশ আর চাটুকাররা নানা কৌশলে আটকে রাখে।
এদিকে, চালকদের কোনো পরিবর্তন নেই। প্রশিক্ষণ নিয়েও তারা বেপরোয়া। ক্লান্ত শরীর, ঘুম ঘুম চোখ নিয়েই মাইলের পর মাইল চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন। এক ট্রিপ শেষ করেই আরেক ট্রিপের তাড়া। চোখে বাড়তি উপার্জনের স্বপ্ন। এই বাড়তি পয়সার লোভ গতি বাড়ায়, বাড়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি। আমরা চালকদের বোঝাতে পারিনি যে শরীরের ওপর এই জুলুম অন্যায়। রাষ্ট্র যে তাদের বৃদ্ধ বয়সের দায়িত্ব নেবে, সেই ভরসা দেওয়া যায়নি।
দক্ষ চালকের অভাব থাকায় অনভিজ্ঞরাই বসছেন স্টিয়ারিংয়ে। এদিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যেন চাঁদ পাওয়ার মতো কঠিন। লাখ লাখ আবেদন ঝুলিয়ে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয় উপরি আয়ের আশায়। যাত্রীদের ভাগ্য ঝোলে সুতায়। ক্ষয়ে যাওয়া টায়ারে জোড়াতালি দিয়ে দূরপাল্লায় রওনা দেয় বাস। লুকিং গ্লাসে পেছনের গাড়ি দেখা যায় না; শুধু দেখা যায় অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনার ভয়।
অনিয়ম শুধু চালকরা করেন না, অনিয়ম মিশে আছে ফাইলে ফাইলে। যে ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তার জন্য নাকি ঘুষের রেট ঠিক করা থাকে। গাড়িতে যত সমস্যা, ঘুষের অঙ্ক তত বেশি। গাড়ি কেনাবেচাতেও গলদ। হাতবদল হয়, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন হয় না।
যারা ইচ্ছা করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জট তৈরি করছেন, যাদের মদদে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামছে, চালকদের বিশ্রামের ব্যবস্থায় যারা হতে দিচ্ছেন না— তাদের শাস্তির আওতায় আনতেই হবে। তা না হলে সড়কের এই রক্তের হোলিখেলা কোনোদিন থামবে না।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়




