রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একক দলের কাজ নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরনো সমস্যা হলো— আমরা প্রায়ই সরকার পরিবর্তনকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সমার্থক মনে করি। একটি সরকার যায়, আরেকটি সরকার আসে; কিন্তু প্রশাসনের কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত চরিত্র অনেকাংশে একই থেকে যায়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই ছিল জুলাইয়ের বড় প্রত্যাশা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছে, যেখানে চাকরি পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় প্রয়োজন হবে না; প্রশাসনিক সেবা পেতে ক্ষমতাবানের সুপারিশ লাগবে না; বিচার পেতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হবে না; সংবাদ প্রকাশের জন্য সাংবাদিককে অনুমতি নিতে হবে না; বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, দলীয় আধিপত্যের ক্ষেত্র নয় এবং পুলিশ রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে নাগরিকের নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান হবে। অর্থাৎ জনগণের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তন।
এই পরিবর্তন শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, সাংবিধানিক ভারসাম্য, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে মৌলিক পরিবর্তন। এ জন্য প্রয়োজন ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য। ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য মানে সব রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ এক হয়ে যাওয়া নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটি সম্ভবও নয়, প্রয়োজনও নেই।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাম, ডান, মধ্যপন্থী, জাতীয়তাবাদী, ধর্মভিত্তিক কিংবা উদারনৈতিক— বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অস্তিত্ব থাকবে। মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, নির্বাচনী লড়াই থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের। আজ যারা ক্ষমতায়, তাদের মনে রাখতে হবে— আগামীকাল তারা বিরোধী দল হতে পারে
কিন্তু এর পাশাপাশি কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য থাকা অপরিহার্য। সেগুলো হলো— জনগণের ভোটাধিকার, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি। এই ন্যূনতম জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য তৈরি করতে পারলে মতপার্থক্য গণতন্ত্রের শক্তিতে পরিণত হবে; আর ঐকমত্য না থাকলে সেই মতপার্থক্যই আবার সংঘাতের কারণ হতে পারে। ঐক্য হবে নীতির, ক্ষমতার নয়।
অতীতে আমরা দেখেছি, স্বৈরাচার বা কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই ঐক্য ভেঙে গেছে। পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে এসেছে নতুন মুখে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে এই ভুলের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। নেতা যত জনপ্রিয়ই হোন, তিনি রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নন। কোনো দল যত বড়ই হোক, জনগণের ভোটের বাইরে তার কোনো বৈধতা নেই। কোনো সরকার যত শক্তিশালীই হোক, সংবিধান ও আইনের সীমারেখা অতিক্রম করার অধিকার তার নেই। এটাই হতে হবে জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রথম শর্ত।
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের। আজ যারা ক্ষমতায়, তাদের মনে রাখতে হবে— আগামীকাল তারা বিরোধী দল হতে পারে। আজ যারা বিরোধীদল, আগামীকাল তারা ক্ষমতায় যেতে পারে। তাই এমন প্রতিষ্ঠানই গড়ে তুলতে হবে, যা ক্ষমতাসীন ও বিরোধী— উভয়ের অধিকার রক্ষা করে।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো— ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদের জন্য কতটা রাজনৈতিক জায়গা রাখে এবং বিরোধীরা ক্ষমতায় গেলে আজকের ক্ষমতাসীনদের অধিকার কতটা রক্ষা করে।
জুলাই আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন চোখে দেখেছে। তারা শুধু চাকরিতে বৈষম্যের অবসান চায়নি; তারা মর্যাদা চেয়েছে। তারা শুধু কোটা সংস্কার চায়নি; তারা সমান সুযোগ চেয়েছে। তারা শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি; তারা রাষ্ট্রের জবাবদিহি চেয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একক দলের কাজ নয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। আর এসব সংস্কার টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য অপরিহার্য। একটি দল ক্ষমতায় এসে নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠান সাজাবে, পরবর্তী সরকার এসে আবার সবকিছু পাল্টে দেবে— এভাবে কোনো রাষ্ট্র এগোতে পারে না।
প্রয়োজন এমন কিছু জাতীয় নীতি ও প্রতিষ্ঠান, যেগুলো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে আনতে না পারলে শুধু নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
এখন আমাদের সামনে দুটি পথ। একটি পথ হলো পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়া— ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয়করণ, প্রতিহিংসা, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি।
অন্য পথ হলো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ— গণতন্ত্র, আইনের শাসন, জবাবদিহি, সহনশীলতা, মানবিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের বাংলাদেশ। দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কিন্তু এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিরাপদ করার একটি জাতীয় প্রয়োজন। সহজ পথে সমাধান নেই। কঠিন পথেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই ঐক্যের লক্ষ্য কোনো একটি দলকে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতার বাইরে রাখা নয়; বরং যে দলই ক্ষমতায় আসুক, যাতে কেউ আর রাষ্ট্রকে নিজের দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করতে না পারে— সেই নিশ্চয়তা তৈরি করা। কারণ, গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা যেন শুধু স্মৃতিতে না থাকে— রাষ্ট্রের কাঠামোতে, রাজনৈতিক আচরণে এবং নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন ঘটুক। এ লক্ষ্যেই প্রয়োজন এমন এক জাতীয় ঐক্য, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে; কিন্তু গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে থাকবে অটুট ঐকমত্য। কারণ শেষ পর্যন্ত লড়াই কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়। লড়াই এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে জনগণ রাষ্ট্রের মালিক হয়েও রাষ্ট্রের কাছে অসহায়। আর সেই লড়াইয়ের স্থায়ী বিজয় তখনই সম্ভব, যখন জুলাইয়ের বাংলাদেশে আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাবের সুযোগ থাকবে না।
লেখক: উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়






