রবীন্দ্রনাথ কী খেতেন

শিবব্রত বর্মন
শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ নাকি আম খুব পছন্দ করতেন। বিদেশযাত্রার সময় সঙ্গে করে আম নিয়ে যেতেন। তিনি নিরামিষভোজী ছিলেন না মোটেও। মাছ-মাংস দুটিই খেতেন আয়েশ করে। ঠাকুরবাড়িতে দেশি এবং ইউরোপীয়— দুই ধরনের খাবারেরই চল ছিল। এ-ও শোনা যায়, তিনি মাঝেমধ্যে নিজে রান্না করতেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নানারকম নতুন নতুন পদ উদ্ভাবন করতেন। রবীন্দ্রনাথের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চালু কথাবার্তার বেশিরভাগই জনশ্রুতি। তবে কবিগুরুর খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে আমার একটা পুরনো কৌতূহল: তিনি অ্যালকোহলজাতীয় পানি খেতেন কি না, এ বিষয়ে কোথাও কোনো উল্লেখ দেখি না। রবীন্দ্রনাথের জীবনাচরণ বিষয়ে ওয়াকিবহাল লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে যে জবাব পেয়েছি, তার মর্মার্থ: কবিগুরু মদ খেতেন না। তিনি ঋষিতুল্য সাত্ত্বিক ধরনের মানুষ ছিলেন। নেশাদ্রব্য ছুঁতেন না।
কিন্তু তারুণ্যে বা যুবা বয়সে বন্ধুদের আড্ডায় অথবা পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে জ্যোৎস্না রাতে একাকী বজরায় বা বোটে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে তিনি কি কখনো অমৃতসুধা পান করতেন না? আগ্রহই হতো না? হলে কী পরিমাণে করতেন? কতটুকু পানি মেশাতেন?
কথা হলো, অ্যালকোহল বা মদ রবীন্দ্রনাথের কাছে কোনো দূরবর্তী পানীয় ছিল না। হাতের কাছেই বোতল ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার এলিট সমাজে সাহেবদের অনুকরণে মদ্যপানের চর্চা ছিল। নিচু সমাজে এটার ছড়াছড়ি ছিল আরও আগে থেকে। আর ধর্মীয় বিধিনিষেধের দ্বিধা ডিঙিয়ে মধ্যবিত্ত সমাজ মদ্যপানের ট্যাবু থেকে শুধু যে বেরিয়ে এসেছে তা-ই নয়— তাদের তখন ট্যাবু ভাঙার নেশায় পেয়েছে। কলকাতায় তখন পানশালা বা ট্যাভার্ন বা বার কোনো নিষিদ্ধ গন্তব্য ছিল না।
উনিশ শতকের কলকাতায় ডিরোজিওর ইয়াং বেঙ্গল শিষ্যরা তো পথেঘাটে মাতলামি করার উদ্দেশ্যে মদ খেতেনই, এমনকি রামমোহন রায়ের মতো সমাজ সংস্কারকরাও নাকি পরিমিত পরিমাণে পানাহার করতেন, তবে চিত্তভ্রম ঘটিয়ে নয়।
রবীন্দ্রনাথের বন্ধু নবীনচন্দ্র সেন মদপান করতেন। মদ নিয়ে রাখঢাক ছিল না দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের। বিদ্যাসাগর মদ না খেলেও আফিমের নেশা জীবনভর ছাড়তে পারেননি। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিখ্যাত মদারু ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কবি নির্মলেন্দু গুণ যেমন বলেছেন, তার মদ খাওয়ার মানস শিক্ষক মাইকেল ও নজরুল। রাতে শোবার আগে লোকে যেমন এক গ্লাস দুধ খায়, মাইকেলের নাকি সে রকম এক গ্লাস ওয়াইন না খেলে ঘুম আসত না। মাইকেল অ্যালকোহলিক ছিলেন।
ঠাকুরবাড়িতে মদ কোনো অস্পৃশ্য পানীয় ছিল না; বরং উল্টোটাই হওয়ার কথা। অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’তে বলা হয়েছে, ঠাকুরবাড়ির চাকর-বাকররাও মদপানের ব্যাপারে শৌখিন ছিলেন। শৌখিন মানে তারা বিলেতি মদ খেতেন।
রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ভালোই মদপান করতেন। শুধু খেতেন না, তিনি রীতিমতো মদ বিক্রি করতেন। নথিপত্রে দেখা যায়, তার প্রতিষ্ঠিত ‘কার টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’ মদ আমদানি ও রপ্তানি— দুটোই করত। এ কোম্পানিতে ফ্রান্স, স্পেন ও বিভিন্ন দেশ থেকে দামি ব্র্যান্ডের মদ এলে তার নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো পত্রপত্রিকায়। এসবের ভিত্তিতে জানা যায়, দ্বারকানাথের ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছিল মদ আমদানি করে। তিনি তার অনুগত এক বাঙালি ব্যবসায়ীকে দিয়ে ধর্মতলা স্ট্রিটে একটি খুচরো মদের দোকান খুলেছিলেন। আবার দ্বারকানাথের কোম্পানির মাধ্যমে জাহাজভর্তি দেশি রাম বুয়েন্স আয়ার্সে রপ্তানিও হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে সন্ন্যাসীজীবন বেছে নেওয়ার আগে যৌবনে বিলাস-ব্যসনে কাটিয়েছেন। তারও মদে আসক্তি ছিল।
এ পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ মদ যে স্পর্শও করেননি— এরকম মনে করার আমি কোনো কারণ দেখি না। ‘ছিন্নপত্রে’র এক চিঠিতে দেখেছি, রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টিস্নাত নরম রোদকে মদের নেশার সঙ্গে তুলনা করছেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছাড়া এরকম উপমা কীভাবে দেওয়া সম্ভব? ফলে এমন ভাববার অবকাশ আছে যে, তিনি মদ খেতেন; কিন্তু মদ্যপ ছিলেন না। তবে চিঠিপত্রে বা ব্যক্তিগত উল্লেখে তা সযত্নে এড়িয়ে চলতেন।
১৮৭৮-৮০ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে থাকাকালে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সামাজিক জীবন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তার চিঠি ও স্মৃতিকথায় ডিনার, ক্লাব, সামাজিক আড্ডার উল্লেখ আছে; কিন্তু ‘আমি মদ খেলাম’— এমন সরাসরি স্বীকারোক্তি নেই। ভিক্টোরিয়ান ডিনারে ওয়াইন পরিবেশিত হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। সে পরিবেশে তিনি ওয়াইন গ্রহণ করেছিলেন বলেই ধরে নিতে হবে। কারণ আর যা-ই হোক, রবীন্দ্রনাথ গোঁড়া বা অসামাজিক ছিলেন না। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর স্মৃতিকথায় রবীন্দ্রনাথের খাদ্যাভ্যাসের নানা বর্ণনা আছে। কোথাও কোথাও ওয়াইনের প্রসঙ্গ এসেছে, তবে সেটি ছিল সামাজিক রীতি, ব্যক্তিগত আসক্তি নয়।
রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ ভ্রমণের যাত্রাসঙ্গী নির্মলকুমারী মহলানবিশের স্মৃতিকথায় বিদেশ সফরকালে খাওয়া-দাওয়ার বিবরণ আছে। তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, কবি মাঝেমধ্যে সামান্য ওয়াইন নিতেন; কিন্তু সেটি অভ্যাসগত ছিল না।
পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথ আহারের ব্যাপারে খুব পরিমিতি মেনে চলতেন। আর প্রকাশ্যে লেখালেখিতে মদ খাওয়ার বিরুদ্ধেই লিখে গেছেন। বিশেষ করে ইংরেজ শাসকদের অনুকরণ করতে গিয়ে মদ খাওয়ার কুফল প্রসঙ্গে তিনি এক প্রবন্ধে লিখেছেন: ‘সুশিক্ষিত টিয়াপাখি যত উচ্চৈঃস্বরে কানে তালা ধরায়, তাহার শিক্ষকের গলা ততটা চড়া নয়। শোনা যায়, যেসব জাতির মধ্যে বিলাতি সভ্যতা নতুন প্রবেশ করে, তাহারা বিলাতের মদ ধরিয়া একেবারে মারা পড়িবার জো হয়, অথচ যাহাদের অনুকরণে তাহারা মদ ধরে তাহারা মদে এত বেশি অভিভূত হয় না।’




