কাবার পথে হৃদয়ের সফর

আর কয়েক দিন পরই শুরু হবে হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আল্লাহ-প্রেমের বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে কাবাপানে ছুটে আসছেন লাখ লাখ মুসলিম নারী-পুরুষ। বাইতুল্লাহ চত্বরসহ মক্কার পথঘাট এখন ঢেকে আছে ইহরামের শুভ্রতায়। সমধুর কণ্ঠে চলছে কোরআন তিলাওয়াত। নামাজের সময় কাবার চারপাশের গোলাকার সিজদা আর তাওয়াফের নয়নাভিরাম দৃশ্য প্রচার হচ্ছে নানান আধুনিক গণমাধ্যমে, যা মোবাইল বা টিভির পর্দায় দেখে ভক্তি আর আবেগ নিয়ে চোখের কোণ ভেজাচ্ছেন হজে যেতে না পারা অনেক মুসলিম।
অন্য সবার মতো বৃদ্ধ আবদুল কাদেরও ফজরের নামাজের পর জানালার পাশে বসে মোবাইল ফোনে লাইভ সম্প্রচার দেখছেন। কাবা চত্বরের সাদা ইহরামের ঢেউ, তালবিয়ার ধ্বনি তাকে উদাস করে দেয়। পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ ভিজে যায়। বয়স সত্তর পেরিয়েছে। বহুবার নিয়ত করেছেন, ‘একবার আল্লাহর ঘরটা দেখে আসব।’ হয়তো অসুস্থতা, নয়তো ঋণ কিংবা সংসারের দায়ের কোনো এক কারণে সে নিয়ত পূরণ করতে পারেননি।
সেদিন ফজরের পর তার নাতি এসে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু, তুমি হজের ভিডিও দেখে খুব কষ্ট পাও? তুমি যখনই হজের ভিডিও দেখো, তখনই তোমার চোখে আমি পানি দেখি।’
তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘না ভাই, আল্লাহর পথে পৌঁছাতে সবসময় বিমানের টিকিট লাগে না। কখনো চোখের পানিও মানুষকে আরাফাতের ময়দানে পৌঁছে দেয়।’
এই কথাটির ভেতর ইসলামের এক বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। ইসলাম শুধু সামর্থ্যবানদের ধর্ম নয়; এটি এমন এক ধর্ম, যেখানে অক্ষম মানুষের দীর্ঘশ্বাসও ইবাদত হয়ে যায়। কারণ, আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখেন, পাসপোর্ট নয়; তাকওয়া দেখেন, টাকার অঙ্ক নয়।
পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
এই আয়াতে ‘সামর্থ্য’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম কাউকে অসম্ভব বোঝা চাপিয়ে দেয় না। যে মানুষ হজে যেতে পারেনি, আল্লাহ তার অপারগতা জানেন। বরং অনেক সময় অন্তরের বুকভরা কান্নাই কবুল হজের সওয়াব এনে দেয়।
ইমাম ইবনুল কাইয়েম আল-জাওযি (রহ.) মাদারিজুস সালিকিন গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অনেক মানুষ কাবার চারপাশে তাওয়াফ করে, অথচ তাদের হৃদয় দুনিয়ার চারপাশে ঘুরে। আবার অনেক মানুষ দূরদেশে বসেও এমন হৃদয় নিয়ে আল্লাহকে ডাকে, যা আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।’
হজের মৌসুম এলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে অদ্ভুত এক আবেগ তৈরি হয়। কেউ বিমানবন্দরে বিদায় দেয়, কেউ টেলিভিশনের পর্দায় কাবা দেখে কাঁদে, কেউ আবার নিজের অক্ষমতার কথা মনে করে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিন্তু এ সময়টাকে শুধু বঞ্চনার ঋতু মনে করলে ভুল হবে। কারণ, এই দিনগুলো শুধু হাজিদের জন্য নয়; বরং পৃথিবীর প্রত্যেক মুমিনের জন্য রহমতের দিন। যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্য প্রথম করণীয় হলো— হতাশ না হয়ে হৃদয়ে হজের আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখা।
হজের এই দিনগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলের একটি হলো রোজা, বিশেষত আরাফার দিনের রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২) এখানে নবীজি আরাফাতের ময়দানে অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্যও দুই বছরের গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিয়েছেন।
এ ছাড়া হজের দিনগুলোতে বেশি বেশি তাকবিরে তাশরিক পড়া, তাসবিহ-তাহলিল করা, কোরআন তিলাওয়াত করা, দোয়া ও ইস্তিগফার করা; আপনার ঘরকে হজের বরকতের উৎসে পরিণত করতে পারে।
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমল বছরের অন্য দিনের তুলনায় অধিক মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।’ (বুখারি, হাদিস: ৯৬৯) এখানে শুধু হাজিরা নন; বরং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য দরজা খোলা রাখা হয়েছে।
হজের মৌসুমের আরেকটি শিক্ষা হলো কোরবানি ও ত্যাগ। অনেক মানুষ আছেন, যাদের হজে যাওয়ার সামর্থ্য নেই; কিন্তু তারা নিজের কষ্টের টাকা থেকে কোরবানি করেন, দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটান। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এই কোরবানি শুধু হাজিদের জন্য নয়; বরং সব মুসলিম তাতে শরিক হতে পারেন।
একজন মানুষ যখন নিজের পরিবারের জন্য নতুন কাপড় কিনতে না পারলেও পাশের এতিম শিশুটির হাতে খাবার তুলে দেন, তখন আল্লাহর কাছে তার সেই আমল কোনো ধনী হাজির নফল ইবাদতের চেয়েও প্রিয় হয়ে যেতে পারে।
হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘তুমি যদি আল্লাহর ঘরে যেতে না পারো, তবে আল্লাহর বান্দার হৃদয়ে পৌঁছাও। কারণ, ভাঙা হৃদয় জোড়া দেওয়া অনেক বড় আমল।’ হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিনে তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
আজ পৃথিবীতে লাখো মানুষ আছে, যারা হজে যেতে পারেনি। কেউ অর্থের অভাবে, কেউ অসুস্থতার কারণে, কেউ বয়সের ভারে। কিন্তু তাদের জন্য আকাশের দরজা বন্ধ হয়নি।
হয়তো কোনো বৃদ্ধ মা কাবার ছবি দেখে কাঁদছেন। কোনো শ্রমিক কাজের ফাঁকে মোবাইলে তালবিয়া শুনছেন। কোনো রিকশাচালক বাসায় ফিরে ইউটিউবে তাওয়াফ দেখছেন। তাদের এই অশ্রুও বৃথা যায় না।
শেষ রাতে আবদুল কাদের আবার জানালার পাশে বসেন। পাশের রুমে নাতির চালানো টিভির স্পিকার থেকে ভেসে আসছে তালবিয়ার ধ্বনি। তিনি দুই হাত তুলে ধীরে ধীরে বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার ঘরে যেতে পারিনি। কিন্তু তুমি আমার হৃদয়কে তোমার ঘর থেকে ফিরিয়ে দিও না।’
যা হয়তো পৃথিবীর সেরা দোয়াগুলোর একটি হিসেবে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






