ব্ল্যাকবোর্ড, চকখড়ি আর এআই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্ল্যাকবোর্ডে চকের ঘষা খাওয়ার শব্দ। ক্যাঁচ ক্যাঁচ, ক্যাঁচ ক্যাঁচ কানে লাগে। চকের গুঁড়া বোর্ডের ধার ঘেঁষে পাউডারের মতো নেমে এসে জমা হয় নিচে বোর্ডের সীমানায়। জমা হতেই থাকে। কখনো খোলা জানালা দিয়ে হেমন্তের বাতাস এলে সেই সাদা পাউডার ফুলের রেণুর মতো ওড়ে ক্লাসরুমে।
শিক্ষক তন্ময় হয়ে লেখেন। কখনো তদ্ধিত প্রত্যয় বা দ্বিগু সমাসের উদাহরণ, কখনো ইউক্লিডের জ্যামিতি, কখনো ফুটো হওয়া চৌবাচ্চার অঙ্ক।
মনে হয় কত যুগ আগের কথা। এখনো মাঝে মাঝে আমার কানে আসে ব্ল্যাকবোর্ডে চকখড়ির ঘষা খাওয়ার আওয়াজ। স্মৃতির ওপার থেকে।
আমি যে হাই স্কুলে পড়েছি, সেটার ক্লাসরুমে ছিল দেয়ালজোড়া সিমেন্টের ব্ল্যাকবোর্ড। দেয়ালের অংশই ছিল সেটা। দেয়ালের সঙ্গেই জন্ম। ফলে দেয়ালের যেমন রঙ চটে যায়, ব্ল্যাকবোর্ডেরও কিছু জায়গায় কালো রঙ ফিকে হয়ে যায়। কোথাও চলটে উঠে গেছে। কিন্তু তাতে শিক্ষকের লেখা বন্ধ হয় না। এসব খানাখন্দ পেরিয়ে তার ত্রিভুজের অতিভুজ ক বিন্দু থেকে খ বিন্দুর দিকে ছুটে যায়।
আমাদের ক্লাসরুমে একটা কাঠের পাটাতনে শিক্ষক দাঁড়াতেন। তার সামনে একটা টেবিল থাকত। চেয়ার থাকত। শিক্ষক আসার সময় হাতে করে চক, ডাস্টার আর একটা বেত বা ছড়ি আনতেন। একেক শিক্ষক একেক ধরনের বেত পছন্দ করতেন। কারও বেত চ্যাপটা। কারও গোলাকার। ক্লাস শেষে যখন বের হতেন, তখন তাদের আঙুলে সাদা চক লেগে থাকত। পাঞ্জাবি বা শাড়িতে লেগে থাকত ট্যালকম পাউডারের মতো চকের গুঁড়া।
স্কুলে শিক্ষকরা সবাই সাদা চক আনতেন। অন্য রঙের চক দেখিনি। আমাদের স্কুল সেকশনের সঙ্গে কলেজ সেকশন ছিল। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। তাদের রসায়ন ল্যাব ছিল। অধিকাংশ সময় সেটা বন্ধ পেতাম। ভেতর থেকে একটা অচেনা বোটকা গন্ধ আসত। আমরা সেই ল্যাবের ঘষা কাচের জানালায় উঁকি দিয়ে দেখতাম ভেতরে নানান কিম্ভূত আকারের কাচের পাত্র— বিকার, টেস্টটিউব, ফ্লাস্ক, ফ্লানেল। কোনো জাদুকরের গুপ্ত কক্ষের মতো। সেই ল্যাবরেটরিতেও ব্ল্যাকবোর্ড ছিল। আর তাতে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার সংকেত লেখা থাকত নানা রঙের চকে— নীল, বেগুনি আর কমলা। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। কালোর বিপরীতে ফুটে ওঠা রঙিন নকশা যেন। যেন চিত্রকর্ম।
পরে জেনেছি এসব চকের রাসায়নিক উপাদান আসলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট। চুনাপাথরের খনি থেকে এগুলো আসে। আর চুনাপাথরের খনি থাকে মাটির গভীরে। বহু যুগ অতীতে এগুলো কোনো সামুদ্রিক প্রাণীর খোলস ছিল। জমা হতে হতে পাথর হয়ে গেছে। তার মানে শিক্ষক যখন চক দিয়ে বোর্ডে লিখছেন, বহু সহস্রাব্দ আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রাণীর হাড়গোড় তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন শ্রেণিকক্ষে। নিজের অজান্তে। কোনো অতীতই হারিয়ে যায় না। শিক্ষক আর ছাত্রের মধ্যে একটা যোগসূত্র হয়ে থেকে যায়।
ব্ল্যাকবোর্ড আমি খুব মিস করি। বিশেষ করে মিস করি চক। বোর্ডের ওপর চকখড়ির ঘষা খাওয়ার কিচকিচ আওয়াজ ভালো লাগে আমার। কিন্তু সেই আওয়াজ আমি কান পেতে এখন কোথাও শুনতে পাই না।
এখন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি খণ্ডকালীন পড়াই। সেটার ক্লাসরুমে ব্ল্যাকবোর্ড নেই। আছে হোয়াইট বোর্ড। তাতে নীল মার্কার পেন দিয়ে লিখতে হয়। খুব যে লেখার দরকার পড়ে, তাও না। ডেস্কে একটা কম্পিউটার। মাথার ওপর প্রজেক্টর। আমি পাওয়ার পয়েন্টের একটা প্রেজেন্টেশন রেডি করে নিয়ে আসি। কম্পিউটারে পেনড্রাইভ ঢুকিয়ে সেই প্রেজেন্টেশন প্রজেক্ট করি একটা বড় স্ক্রিনে। ক্লাসরুমের ধার ঘেঁষে মেট্রোরেলের লাইন চলে গেছে। পাওয়ার পয়েন্টের স্লাইড বদলে বদলে আমি লেকচার দিতে থাকি। শিক্ষার্থীরা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনার ভঙ্গি করে। আমি জানি, অর্ধেক শিক্ষার্থীও কিছু শুনছে না। জেন-জি শিক্ষার্থীরা এই একটা জিনিস খুব ভালো রপ্ত করে ফেলেছে। ভঙ্গি।
ক্লাসরুম অনেক বদলে গেছে। আওয়ামী শাসনামলে স্কুলপর্যায়ে শ্রেণিকক্ষে তথ্যপ্রযুক্তির উপকরণ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কম্পিউটার, প্রজেক্টর, স্ক্রিন। এর মধ্যে আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসে হাজির। এআই শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট খাতা রেডি করে দিচ্ছে। ব্ল্যাকবোর্ড আর চকখড়ির যুগ এখন পূর্বজন্মের স্মৃতি।



