‘ভেজাইল্যা বন্যা’র দুর্গতি

বান্দরবান জেলা শহর তলিয়ে গেছে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের বেশিরভাগ অংশ পানির নিচে। রাঙামাটির বিলাইছড়ি, বরকল, বাঘাইছড়িও তলিয়ে গেছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-লংগদু সড়ক তলিয়েছে। চলতি আষাঢ়ে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ২২ জন নিহত হয়েছেন। দীঘিনালা-সাজেক সড়কের কবাখালীতে পানি উঠেছে, নৌকা দিয়ে পারাপার হচ্ছে। সাজেকে আটকা পড়েছে পর্যটক। কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ। চট্টগ্রাম নগরী ডুবে গেছে। গত ১৫ বছর বন্যার রূপ, ক্ষতি এবং দুর্গতির ধরন পাল্টে গেছে। পাহাড় থেকে সমতল, হাওর থেকে নগর এখন ‘জলাবদ্ধ-বন্যায়’ বন্দি হয়ে পড়ছে।
আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যা হতো। শৈশবে একটা কমন বাইনারি বাংলা রচনা ছিল ‘বন্যা আশীর্বাদ না অভিশাপ?’ বন্যার সেই রূপ ও খতিয়ান এখন আর নেই। এখনকার বন্যায় মানুষের হাত আছে। এটি শুধু প্রাকৃতিক মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলাফল নয়। প্রতিনিয়ত একেক সময়ে অতিবর্ষণ বাড়ছে, অনাবৃষ্টি ও অকালবৃষ্টিও বাড়ছে। বৃষ্টি-পঞ্জিকার এমন উল্টাপাল্টা আচরণ জলবায়ু সংকটের কারণে জটিল হচ্ছে। আর মানুষের দোর্দণ্ড প্রতাপ, বেহিসাবি বিলাসিতা, যুদ্ধ ও কার্বন-বাণিজ্য
সংকটটি প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন বাউল শাহ আবদুল করিম। হাওরের বন্যা, প্রকৃতি ও দুর্দশা নিয়ে তার বহু গান আছে। ‘জলাবদ্ধ-বন্যাকে’ করিম তার গানে ‘ভেজাইল্যা বন্যা’ বলেছেন। আর এর কারণ প্রাণ-প্রকৃতির ওপর মানুষের জুলুম
বাংলাদেশে বন্যার ইতিহাসে দেখা যায়, উত্তরাঞ্চল কি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতো। কিন্তু সমকালে ডুবছে পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোও। বান্দরবান শহরটির চারধারে উঁচু পাহাড়, শহরটি অনেকটাই নিচু। বর্ষার পানি শহর দিয়ে ছড়া হয়ে সাঙ্গু/শঙ্খ নদ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কথা। কিন্তু লাগাতার পাহাড় কাটা এবং ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে পানিপ্রবাহের ছড়া-নালাগুলো বন্ধ থাকায় জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে বান্দরবান শহর। সিলেট-সুনামগঞ্জের
তাহলে জলাবদ্ধ-বন্যা থেকে মুক্তির প্রশ্নে রাষ্ট্রের কাজ কী? রাষ্ট্রকে প্রথমত সকল বাস্তুতন্ত্রের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সামর্থ্য এবং অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। নদী, খাল, হাওর, পাহাড়, বন দখলদারদের তালিকা রাষ্ট্রের কাছে আছে। রাষ্ট্র তাহলে নির্বিকারভাবে পাহাড়ধস আর জলাবদ্ধ-বন্যা কেন ঘটতে দিচ্ছে? কেন পানির প্রবাহ ও আধার উন্মুক্ত করছে না? এই বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে যে মৃত্যু ঘটছে, তা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি। রাষ্ট্র কাঠামোগত হত্যাকে জায়েজ করছে। দেশের
পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো ভাষায় মৌসুমি বন্যাকে বলে ত্যুইলত বলে। বর্ষাকালে ছড়া/ঝিরি/নদী/খালে পানি ফুলে-ফেঁপে বেড়ে গিয়ে প্লাবিত হওয়াকে ত্যুইলত বোঝায়। কিন্তু সমকালের জলাবদ্ধ-বন্যাগুলো ম্রোদের কাছে ত্যুইলত মনে হয় না। এটি তাদের ভাষায় ‘ত্যুইক্লিং মাংমো’। এমন বন্যা পরিস্থিতি পরিবেশ, পরিবার ও সমাজে বড় ক্ষত ও দাগ রেখে যায়। এমন বন্যা পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতার (ত্যুইতুনুং) মতো ভোগান্তি তৈরি হয়। সমকালের বন্যা পরিস্থিতিকে প্রবীণ ম্রোরা পরিবেশ ও
প্রতিটি পাহাড়-অরণ্যের বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক বিন্যাস থাকে। সমকালের বন্যা সংকটের মধ্যে পাহাড়ের ম্রো প্রবীণরা কিছু হারিয়ে যাওয়া বিরল লতা-গুল্মের নাম স্মরণ করেছেন। রপখার, মওরমো, সিংসুর, উইওয়ি, ডিন, মাংকু, খই কিংবা রাইহর। পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়ার ধারে এসব গাছ জন্মাত। নানা প্রজাতির গাছের বৈচিত্র্য ঝিরির পানিপ্রবাহ ঠিক রাখত, মাটি ক্ষয় রোধ করত। পাহাড়ে গাছের বৈচিত্র্য হ্রাস নিদারুণ ভূমিক্ষয়কে বাড়িয়েছে। আর এ কারণে মৌসুমি বন্যা কিংবা অতিবর্ষণের পানি
হাওরের উজানে মেঘালয় পাহাড় জুড়ে এককালে ছিল গভীর অরণ্য, হাওর জুড়ে জলাবন। চৈত্র-বৈশাখের কালবৈশাখী থেকে শুরু করে অবিরাম বর্ষণ মেঘালয়ের বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে ভাটিতে গড়িয়ে পড়ত। পাহাড়ি বনের ভেতর দিয়ে বৃষ্টির পানি ‘ছাঁকনি বা চুইয়ে পড়া নীতিতে’ উজান থেকে ভাটির হাওরে নামত। প্রাকৃতিক বনভূমি বিনাশ করে ভারত বহুজাতিক খনি প্রকল্প তৈরি করেছে। মেঘালয় পাহাড় আজ কয়লা আর চুনাপাথর তুলতে তুলতে ফাঁপা হয়ে গেছে। অল্পবিস্তর বৃষ্টিতেই আজ মেঘালয়
একই সঙ্গে জলাবদ্ধ-বন্যাকে উসকে দেওয়া জলবায়ু সংকটের ধরনগুলোও আমাদের আলাপে আনা জরুরি। আর এই সংকট শুধু স্থানীয়ভাবে বা জাতীয়ভাবে ত্রাণ, অর্থ অনুমোদন বা চাল সহযোগিতা দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সক্রিয় জলবায়ু-কূটনীতি। একই সঙ্গে পানি নিয়ে সব ধরনের কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন পানিপ্রবাহ প্রশ্নে আমাদের দ্বিরাষ্ট্রিক তৎপরতাকেও চাঙ্গা করা জরুরি।
লেখক: গবেষক ও লেখক




