থেমে যাওয়া পরিবার পরিকল্পনা হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কেয়া, জমিলা, রোকেয়া ও হালিমা— এই চার গৃহকর্মীকে যখন বিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তাদের বয়স ১৫/১৬। আর গ্রামে মা-বাবার সঙ্গে থাকা ওজিফা, গোলাপি ও সাফিনাকে বিয়ে দিয়েছে ওদের পরিবার ১৩/১৪ বছর বয়সে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত এই সাতটি মেয়েই এখন মা। বিয়ের এক বছরের মধ্যে মা হয়েছে এই কিশোরীরা। সবাই আমার পরিচিত; কিন্তু অনেক বুঝিয়েও এদের বাল্যবিয়ে বন্ধ করা যায়নি। শুধু ওরা নয়, এই একই অবস্থা দেশের অসংখ্য কিশোরীর।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই কিশোরীদের সবার গল্পই প্রায় একই— বিয়ে হওয়ার এক বছরের মাথায় এরা সবাই মা হয়েছে। অত্যন্ত চেনা এই মেয়েগুলোকে এবং তাদের পরিবারকে নানাভাবে বুঝিয়ে বাল্যবিয়ে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। আজ দেশের আনাচে-কানাচে তাকালে দেখা যায়, এমন ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক হাজার জন কিশোরীর মধ্যে ৯২ জনই প্রসূতি হচ্ছে। এই উদ্বেগের মূল শিকড় গেঁথে রয়েছে বাল্যবিয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির মধ্যে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী বাস করছে। বয়ঃসন্ধিকাল এমন এক সংবেদনশীল সময়, যখন একটি শিশু ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপ নেয় এবং প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে। ঠিক এই বয়সে প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিন্দুমাত্র স্পষ্ট বা বৈজ্ঞানিক ধারণা না দিয়ে যখন একটি কিশোরীকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয়, তখন গর্ভধারণ কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার অভাবে কিংবা পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে এই কিশোরী মায়েদের নিজস্ব ইচ্ছা, মানসিক অনুভূতি কিংবা শারীরবৃত্তীয় নিরাপত্তার বিষয়টি একেবারে উপেক্ষিত থেকে যায়। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের মাশুল হিসেবে একদিকে তাদের জীবন ও স্বাস্থ্য ক্ষয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ঠেলে দিচ্ছে এক কঠিন ঝুঁকির মুখে।
২০২৫ সালের তথ্যসূত্রে দেখা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৫৭ লাখে, যার প্রায় ২৮ শতাংশই বয়ঃসন্ধিকালের তরুণ জনগোষ্ঠী। সচেতনতার অভাব, অপর্যাপ্ত জন্মনিরোধ ব্যবস্থা ও বাল্যবিয়ের কারণে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের প্রবণতা থামছে না। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ শিশু এবং প্রতি মিনিটে প্রায় ৯ থেকে ১০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে। অথচ একসময় মোট প্রজনন হার বা টিএফআর কমিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সাফল্যের এক অনন্য নজির গড়ে তুলেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই কর্মসূচির স্থবিরতা এক চরম বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একই সময়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়ে প্রজনন বয়সে প্রবেশ করছে। তাদের কাছে বৈজ্ঞানিক, নির্ভুল ও দায়িত্বশীল তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য এবং বাল্যবিয়ে বিষয়ে ট্যাবু ভাঙতে হবে
একজন নারী প্রজননক্ষম বয়সে মোট কতটি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, সেটিই টিএফআর। ইউনিসেফ ও বিবিএসের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে টিএফআর এখন ২.৩ থেকে বেড়ে ২.৪-এ দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আগে প্রতি ১০ জন নারী ২৩টি সন্তানের জন্ম দিতেন, এখন তা ২৪-এ পৌঁছেছে। শুনতে সামান্য মনে হলেও এই ডেমোগ্রাফিক সূচকটি জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। ১৯৭৫ সালে টিএফআর ছিল ৬.৩, যা নানা সচেতনতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ২০১১ সালে ২.৩-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময় ধরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকট, তদারকির অভাব এবং সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ
বিঘ্নিত হওয়ার কারণে এই অর্জন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পপুলেশন কমিউনিকেশন পড়াকালীন শিক্ষকরা প্রায়ই বলতেন, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় যদি এক দিনের জন্যও সরবরাহ বন্ধ থাকে, তবে পুরো কর্মসূচিই ভেস্তে যেতে পারে। বাস্তবচিত্র আজ সেটাই প্রমাণ করছে। বর্তমানে প্রায় ১০ শতাংশ দম্পতি চাহিদামতো এসব উপকরণ পাচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশ জুড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট।
উপকরণের অভাব এবং অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ফলে গর্ভপাত ও সে জনিত মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৬ সালে প্রসব ও গর্ভপাতজনিত মৃত্যুর হার ৬ শতাংশ হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অল্প বয়সে ঘন ঘন প্রসবের কারণে মায়েরা রক্তস্বল্পতা ও চরম পুষ্টিহীনতায় ভোগেন; জন্ম নেয় কম ওজনের অপুষ্ট শিশু। উপরন্তু আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া নারীদের অকাল মেনোপজের ঝুঁকি বহু গুণ বেশি, যা তাদের পরবর্তী জীবনে হৃদরোগ, হাড় ক্ষয় ও মানসিক বিষণ্নতার মতো জটিল ব্যাধির মুখে
ঠেলে দেয়।
একই সময়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়ে প্রজনন বয়সে প্রবেশ করছে। তাদের কাছে বৈজ্ঞানিক, নির্ভুল ও দায়িত্বশীল তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য এবং বাল্যবিয়ে বিষয়ে ট্যাবু ভাঙতে হবে। পাশাপাশি এর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। জোরালোভাবে চালু করতে হবে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম।
এখনো সময় আছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। সরকারকে অবশ্যই মাঠ পর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, তরুণদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন শিক্ষা দিতে হবে এবং বাল্যবিয়ে রোধে কঠোর হতে হবে। প্রজনন স্বাস্থ্য ও যৌনতা নিয়ে সামাজিক সংকোচ কিংবা ট্যাবু ভেঙে প্রচার-প্রচারণা জোরদার না করলে সামনের দিনগুলোতে দেশ এক অপূরণীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক




