বিদ্যুৎ আর জ্বালানির যন্ত্রণা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যুৎ ছাড়া এ সময়ে জীবনযাত্রা কল্পনা করা যায় না। শহর কিংবা গ্রাম, শিল্প কিংবা কৃষি, সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও সংরক্ষণ— কোথায় লাগে না বিদ্যুৎ? কিন্তু এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে এক অন্তহীন সমস্যা চলছে বাংলাদেশে। কিছুদিন পরপরই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মাথাচাড়া দিচ্ছে। সাময়িক সমাধানের কিছুদিন পর সংকট আবারও দৃশ্যমান হয়।
ঢাকায় লোডশেডিং একটু কম হলেও গ্রামের দিকে তা চরম আকার নিয়েছে। সমস্যা সমাধানের দাবিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষুব্ধ জনতাকে কখনো কখনো রাস্তা অবরোধ করতেও দেখা যায়। পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তারপর সমাধানের লক্ষ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। কিন্তু সমাধান আর হয় না। উপরন্তু বিশ্ববাজারের কথা বলে প্রথমে তেলের দাম, তারপর গ্যাসের দাম এবং শেষে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। এভাবেই চলছে দীর্ঘদিন। ব্যবসায়ী ও সরকার— দুপক্ষই জয়ী হয়, আর বিদ্যুৎ না পেয়েও বাড়তি দামের বোঝা চাপে জনগণের কাঁধে। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে।
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিটা কেমন? জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট, বর্তমান চাহিদা ১৭ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট (সময় অনুযায়ী)। উৎপাদন হচ্ছে ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট। এর ফলে হচ্ছে লোডশেডিং। তবে লোডশেডিং দেশের সব জায়গায় সমান নয়। দেশের ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। তাদের বিদ্যুতের চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে বরাদ্দ হয় ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। কোথাও কোথাও ১০-১২, এমনকি ১৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করতে পারে— এ আশঙ্কায় সম্প্রতি ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি পুলিশের আইজির কাছে চিঠি দিয়েছে তাদের অফিস, গ্রিড, উপকেন্দ্র রক্ষায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য।
পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তারপর সমাধানের লক্ষ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। কিন্তু সমাধান আর হয় না। উপরন্তু বিশ্ববাজারের কথা বলে প্রথমে তেলের দাম, তারপর গ্যাসের দাম এবং শেষে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাস, কয়লা ও তেল। দেশে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট। দেশে উৎপাদন ও বিদেশ থেকে আমদানি করে এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ২০৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাস ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ, পরিবহন, সার কারখানা ও বাড়িতে রান্নার কাজে। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রেই প্রয়োজন হয় ২২০ কোটি ঘনফুট; সরবরাহ হচ্ছে ৭৫ কোটি ঘনফুট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট; কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এখন তা দাঁড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট। কয়লা আমদানির সমস্যার কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। এদের মধ্যে পটুয়াখালীর নোরিনকোতে কমেছে ৩০০ মেগাওয়াট, পায়রায় কমেছে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট আর ভারত থেকে আমদানি করা আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট। ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতারও ৯ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। দেশে ব্যবহৃত গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশ, তেলের পুরোটাই এবং কয়লার ৯০ শতাংশ ধরলে মোট জ্বালানির ৬৫ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। আমদানিনির্ভর দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা এবারের সংকটে ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে।
এ কথা তো সবার জানা, গরম বাড়লেই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু চাহিদামতো উৎপাদন করার পদক্ষেপ তো নেই; বরং উৎপাদন কমেছে। গ্যাসের সংকটে উৎপাদন কমেছে, কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে। ব্যয়বহুল বলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে না। এসবের সামগ্রিক যোগফল বিদ্যুৎ চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি এবং লোডশেডিং।
বকেয়া একটি ভয়াবহ সমস্যা। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া থাকায় কয়লার আমদানি ব্যাহত হয়েছে। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে না পারায় কমছে না লোডশেডিং। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট ও সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে সংকটের তীব্রতা বেড়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সার কারখানা; রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও যানবাহনে ভোগান্তি হয়েছে তীব্র।
সংকট এলেই চটজলদি যে সমাধানের কথা সরকার ভাবে, তা হলো দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু দাম বাড়িয়ে কি সংকট কমেছে? জুনেই পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। তবু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। ব্যয়বহুল জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন যত বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় ততই বাড়বে।
গত আওয়ামী লীগ সরকার দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানি আসবে কোথা থেকে, কী দামে এবং তাতে বিদ্যুৎ ভোক্তার সামর্থ্যের মধ্যে থাকবে কি না, বাড়তি দামে বিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদন করে রপ্তানি লাভজনক হবে কি না— এসব না ভেবে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্র ভাড়া) দিতে হচ্ছে। এখনো পিডিবির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রতি বছর সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে; কিন্তু মানুষের জন্য সহজলভ্য ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়নি বিগত বছরগুলোতে। নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান তো পরের কথা, ভোলার আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ব্যবহারে আশানুরূপ কার্যকর পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি; বরং ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। এ কথা ঠিক, জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই, তাই আমদানির পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানির উৎস বাড়াতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে— এটি যেমন ঠিক, তেমনি আবার যেকোনো শর্তে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানোর ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন— সৌর, বায়ু, জল, বর্জ্যবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সাময়িক পদক্ষেপ নিরবচ্ছিন্ন, মানসম্পন্ন ও সহজলভ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করবে না; বরং সাময়িক সংকট দেখিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। যার প্রভাব পড়বে কৃষি, শিল্প, সেবা খাতে। সংকট ও দাম বাড়ানোর এই চক্র থেকে মানুষ মুক্তি চায়।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক







