মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: জ্বালানি ও সার সংকটে পড়বে কি বাংলাদেশ?

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সংকটে পড়তে পারে এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ নিয়ে গোটা বিশ্বের মতো চিন্তায় বাংলাদেশের কৃষকরাও।
চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পেয়ে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে অনেক কৃষক যেমন সমস্যায় পড়েছেন, তেমনি আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য সারের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। মূলত সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ।
এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয়, সেখানেও বড় ভরসা আমদানিকৃত গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
যদিও সরকারের দাবি, সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে দেশে যে পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিশরের মতো বিকল্প দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে সরকার।
অন্যদিকে, বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত ‘নীতিমালা-২০২৫’ বাতিল বা স্থগিতের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে আসছে সার ডিলারদের সংগঠন বিএফএ। সংগঠনটি এই নীতিমালাকে জনস্বার্থবিরোধী আখ্যা দিয়েছে।
নীতিমালা-২০২৫ বাতিল করে ২০০৯ সালের নীতিমালা বহাল রেখে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে চলতি বছরের ১১ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে সার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা। একই দাবিতে ২৯ মার্চ বিএফএ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করে।
বিএফএ হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে সারা দেশে সার ক্রয়, বিক্রয়, বিতরণ, সরবরাহ ও পরিবহন বন্ধ রাখার মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সংগঠনটির অভিযোগ, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। এ কারণে দেশের প্রায় ২০ হাজার সার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা আন্দোলনে নেমেছেন।
বর্তমানে দেশে একদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে সার ডিলারদের এই হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে কৃষি খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ পরিস্থিতির দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে আমন মৌসুমে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি হলে দেশে বেসামাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে দ্রুত সার সংকট নিরসন ও কৃষি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তে তড়িঘড়ি করে প্রণীত সার নীতিমালা-২০২৫ আপাতত স্থগিত রেখে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে জনস্বার্থে একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। সবশেষে প্রশ্ন উঠছে—সরকারের দাবি অনুযায়ী দেশে এক বছরের চাহিদা অনুযায়ী সত্যিই কি পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে? আর জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর?
তবে সরকারপ্রধান তারেক রহমান এসব সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আন্তরিক এবং জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বৈশ্বিক এই সংকট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

