অদৃশ্য বিপদের দৃশ্যমান পথ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যেসব রোগের সংক্রমণে একসময় অসংখ্য মানুষ মারা যেত, সেসবের অনেকটিই অ্যান্টিবায়োটিকের কল্যাণে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু ইদানীং মুশকিল হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক আগের মতো জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করছে না। একে বলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর— জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা। প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাওয়া, ভুল অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন, অপর্যাপ্ত মাত্রা, অনিয়মিত সেবন ইত্যাদি নানা কারণে সংবেদনশীল জীবাণু মারা গেলেও কিছু শক্তিশালী জীবাণু টিকে যায়। পরে তারা বংশবিস্তার করে এবং কখনো অন্য জীবাণুর কাছেও প্রতিরোধের বৈশিষ্ট্য পৌঁছে দেয়। এই প্রতিরোধী জীবাণু হাসপাতালের বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, পানি, মাটি, খাদ্য, প্রাণী এবং স্পৃষ্ট স্থানের মাধ্যমে সমাজে ছড়াতে পারে। অর্থাৎ কেউ কখনো অ্যান্টিবায়োটিক না খেলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রতিরোধী জীবাণুতে আক্রান্ত হতে পারেন।
হাসপাতালের বর্জ্যপানি: ২০০৬ সালে একটি হাসপাতালের বর্জ্যপানি নিয়ে আমাদের গবেষণায় ৩০০টি নমুনা থেকে ২৪টি সিপ্রোফ্লক্সাসিন-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া Escherichia coli মেলে। অর্থাৎ জীবাণুর যে ‘তালায়’ সিপ্রোফ্লক্সাসিন চাবির মতো বসে কাজ করার কথা, সেই তালার গঠনই বদলে গিয়েছিল। ফলে ওষুধ আর কাজ করছিল না।
হাসপাতালের বর্জ্যপানিতে রোগীদের শরীর থেকে বের হওয়া জীবাণু এবং বিপাক না হওয়া ওষুধের অংশ একসঙ্গে জমা হতে পারে। যথাযথ শোধন ছাড়া সেই পানি পরিবেশে গেলে নদী-নালা ও জনবসতির জীবাণু-সমাজে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেখানে টিকে থাকা জীবাণুগুলো ভবিষ্যৎ সংক্রমণের উৎস বা প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের ভাণ্ডার হয়ে উঠতে পারে।
ট্যানারির বর্জ্য: আমাদের ২০২৪ সালের গবেষণায় ১০টি ট্যানারির বর্জ্যপানি এবং তুলনার জন্য ১০টি অ-ট্যানারি বর্জ্যপানি পরীক্ষা করা হয়। ট্যানারির বর্জ্যপানি থেকে পাওয়া জীবাণুর এক-তৃতীয়াংশ একাধিক শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল। ট্যানারির জীবাণুর মধ্যে সেফট্রিয়াক্সোন, এরিথ্রোমাইসিন, নালিডিক্সিক অ্যাসিড ও আজিথ্রোমাইসিনে শতকরা ৪০ শতাংশ বা তদূর্ধ্ব প্রতিরোধ পাওয়া যায়। কয়েকটি জীবাণু পরীক্ষিত ছয় শ্রেণির মধ্যে পাঁচ শ্রেণির ওষুধই প্রতিরোধ করতে সক্ষম ছিল। তাই ট্যানারি বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর আছে কি না, সেটি শুধু পরিবেশগত মানদণ্ড দিয়ে নয়; জীবাণু ও প্রতিরোধী জিন পর্যবেক্ষণ করেও যাচাই করতে হবে।
শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক মানেই ভালো অ্যান্টিবায়োটিক নয়; রোগের জন্য সবচেয়ে নির্দিষ্ট, প্রয়োজনীয় এবং চিকিৎসকের নির্বাচিত ওষুধটিই ভালো
অদৃশ্য চলাচলের পথ: এএমআর শুধু ড্রেন দিয়ে বাইরে যায় না; হাসপাতালের ভেতরেও রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও যন্ত্রপাতির স্পর্শে জীবাণু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে। ঢাকার একটি বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, যেমন— এমআরআই, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাফি, ম্যামোগ্রাফি ইত্যাদি এবং পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ থেকে পৃষ্ঠীয় নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে আমাদের একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। সেখানকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাকটেরিয়া সেফালেক্সিন, অ্যামোক্সিসিলিন ও অক্সাসিলিনের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ দেখিয়েছে। এরা দুর্বল রোগীর জন্য গুরুতর সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
জীবাণুর দুর্গ বায়োফিল্ম: প্রতিরোধী জীবাণুর আরেকটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হলো বায়োফিল্ম। সহজভাবে বললে, জীবাণুরা কোনো ক্ষত, নল, যন্ত্র বা পৃষ্ঠে দলবদ্ধ হয়ে আঠালো এক আবরণ তৈরি করে; এটি যেন তাদের বানানো দুর্গ। ওই আবরণ ওষুধ ও দেহের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আঘাত থেকে জীবাণুকে আড়াল করে। ডায়াবেটিসজনিত পায়ের ক্ষতের সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনেও বায়োফিল্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ধরনের রোগীর নমুনা থেকে পাওয়া ১১৭টি জীবাণু নিয়ে আমাদের ২০২৫ সালের গবেষণায় ৮০টিকে বহু ওষুধ প্রতিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ৫৮টি মাঝারি থেকে শক্তিশালী বায়োফিল্ম তৈরি করেছিল। পরীক্ষাগারে সোডিয়াম অ্যাসকরবেট বা ভিটামিন সির একটি রূপ বায়োফিল্ম গঠন কমিয়েছে। অ্যামোক্সিসিলিন বা অক্সাসিলিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিক, যারা আগে এ ধরনের জীবাণুর বিপরীতে একেবারেই অকার্যকর ছিল, তারা ভিটামিন সি-এর সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহৃত হলে ওষুধের কার্যকারিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিরে এসেছে। বায়োফিল্মকে নিষ্ক্রিয় করে ব্যাকটেরিয়ার রক্ষাকবচ, recA নামের একটি জিনের সক্রিয়তাও কমতে দেখা গেছে।
উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া: মানুষের অন্ত্রে বিপুলসংখ্যক উপকারী অণুজীব বাস করে। তারা খাদ্য হজম, ভিটামিন তৈরি, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা প্রশিক্ষণ এবং ক্ষতিকর জীবাণুকে ঠেকাতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বিস্তৃত পরিসরের অ্যান্টিবায়োটিক, রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর পাশাপাশি এই উপকারী জীবাণুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমাদের পর্যালোচনামূলক গবেষণায় প্রকাশ থাকে যে ওষুধের ধরন, মাত্রা, ব্যবহারের সময়কাল ও ব্যক্তিভেদে এ ক্ষতি ভিন্ন হয়; কিছু জীবাণুগোষ্ঠী দ্রুত ফিরে এলেও কিছু ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এ কারণে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক মানেই ভালো অ্যান্টিবায়োটিক নয়; রোগের জন্য সবচেয়ে নির্দিষ্ট, প্রয়োজনীয় এবং চিকিৎসকের নির্বাচিত ওষুধটিই ভালো। প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক বা খাদ্যাভ্যাস কিছু পরিস্থিতিতে অন্ত্রের জীবাণু-সমাজ পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এগুলোও রোগী ও প্রেক্ষাপটভেদে বিবেচনার বিষয়; একটি সর্বজনীন সমাধান নয়।
সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি: এএমআর মোকাবিলায় শুধু রোগীকে ‘পুরো কোর্স শেষ করুন’ বললে হবে না। চিকিৎসকের প্রয়োজনভিত্তিক প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষাগারে দ্রুত জীবাণু শনাক্তকরণ, ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিকাদান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন— সব একসঙ্গে এগোতে হবে। হাসপাতাল ও শিল্পবর্জ্য পরিবেশে ছাড়ার আগে কার্যকর শোধন নিশ্চিত করা এবং শোধনের পরও জীবাণু ও প্রতিরোধী জিন পর্যবেক্ষণ করে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে যাচাই করা দরকার। কৃষি, পোলট্রি ও মৎস্য খাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে অ্যান্টিবায়োটিক জীবন বাঁচাচ্ছে, আগামী প্রজন্মের জন্য সেটি কার্যকর রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক: অধ্যাপক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



