ইসরায়েল কি এখনো বদলাবে না!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইসরায়েলের সংসদ নির্বাচন এর আগে কখনো এত বেশি পরিমাণে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। এবার করছে কারণ একদিকে এ নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলাখুলিভাবে ইসরায়েলের নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষ আশা করছেন, নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয় হলে ইসরায়েল যুদ্ধংদেহী পথ থেকে সরবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ধারাবাহিক বৈরিতার কারণে বাংলাদেশের মানুষ সাধারণভাবে ইসরায়েলবিরোধী। ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সরকার বা নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশেও এত আগ্রহ ছিল না। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, অমানবিকতা ও অস্থিরতা বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। সমুদ্রে পরিবহনব্যবস্থা জটিল, ব্যয়বহুল ও অনিরাপদ করায় রপ্তানি ব্যয় বাড়িয়েছে। নৈতিকভাবে বাংলাদেশের জনগণ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলি সংসদ নেসেতের সিট সংখ্যা ১২০। ভোটার সংখ্যা ৭৩ লাখ। তবে সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীদের ভোট দেন না, ভোট দেন রাজনৈতিক দলকে। ভোটের শতকরা অনুপাত অনুযায়ী সংসদে একেক দলের আসনসংখ্যা নির্ধারিত হয়। কোনো দল শতকরা ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের কম ভোট পেলে নেসেতের আসনের জন্য বিবেচিত হয় না। এবার ৩৮টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য বলে ঘোষিত হয়েছিল। নির্বাচনে ১৮টি দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে প্রয়োজনীয় ভোট পেয়েছে। তিনটি দল পায়নি।
নির্বাচন প্রমাণ করেছে ইসরায়েলের রাজনীতি অনেকখানি বদলে যাচ্ছে। ইহুদিবাদ ছাড়াও ইসরায়েলে এখন হারেদি ও আরব-ফিলিস্তিন জাতিগোষ্ঠীর মতামত আমলযোগ্য আয়তনে পৌঁছেছে। কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকদের পাশাপাশি উদারনৈতিক ও সেক্যুলার রাজনীতিকদের উত্থান ঘটছে
নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি শতকরা ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে সর্বোচ্চ ২৭টি আসন পেয়েছে। পাশাপাশি লিকুদ পার্টির সঙ্গে জোট করে আৎজমা ইহুদি ৭টি, হারেদি ইয়াহাদুত হাতোরা ৭টি, হারেদি ধর্মীয় দল (শাস) ৬টি, ধর্মীয় ইহুদিবাদী দল ৬টি— অর্থাৎ নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে এককালীন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত ইয়াশার পার্টি ১৬ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১টি আসন পেয়েছে। তার নেতৃত্বাধীন চেইঞ্জ ব্লকের আওতায় বিয়াখাদ ১২টি, ডেমোক্র্যাটস ৮টি ও ইসরায়েল বেইতেনু ৭টি আসন— অর্থাৎ মোট ৪৮টি আসন নিশ্চিত করেছে।
এবারের নির্বাচনে ১২ লাখ আরব-ফিলিস্তিনি ভোটার রয়েছেন। আরব-ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক দলও অনেক। তবে প্রধান দল চারটি— রা’ম, হাদাশ, বালাদ ও তা’ল। এবারের নির্বাচনে রা’ম ৮টি এবং হাদাশ ৫, বালাদ ৩ ও তা’ল ৩টি আসন নিয়ে একত্র জয়েন্ট লিস্ট নামে ১১টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনে যেহেতু কোনো দল বা জোটই কাঙ্ক্ষিত ৬১টি আসন পায়নি, সেহেতু কোনো দল বা জোটের পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। সেজন্য মনে করা হয়েছিল ফিলিস্তিনি দলগুলো সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে পড়বে। কিন্তু ইসরায়েলি রাজনীতিতে এতটা মেরূকরণ হয়ে গেছে যে, ডেমোক্র্যাটস ছাড়া অন্য কোনো ইহুদি দল বা জোটই ফিলিস্তিনিদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে চাচ্ছে না; যদিও ফিলিস্তিনি দলগুলো আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুবিরোধী জোটকে সরকার গঠনে সমর্থন করার ইঙ্গিত দিয়েছে। আইজেনকট বা তার নেতৃত্বাধীন জোটের রাজনীতির মূল ভিত্তিই হলো নেতানিয়াহুর সমালোচনা ও বিরোধিতা। সুতরাং তারাও নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিতে বা তার সমর্থন নিতে পারছে না। এভাবে যে যার জায়গায় অনড় থাকলে হয়তো নতুন সরকার গঠন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
লিকুদ কোয়ালিশন কট্টর ডানপন্থীদের জোট। অন্যদিকে ইয়াশারের চেইঞ্জ ব্লক মধ্য ও মধ্য-ডানপন্থীদের জোট। দুটি জোটই ইহুদিবাদী-জায়োনিস্ট। হামাস বা ফিলিস্তিন প্রশ্নে দুই জোটের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। আরব-ফিলিস্তিনি জোটও হামাসবিরোধী, তবে কট্টর নয়। পশ্চিম তীরকেন্দ্রিক ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সদ্ভাব রয়েছে।
আইজেনকট জানেন এবার সরকার গঠন করা সম্ভব না হলে সংবিধান অনুযায়ী আবার নির্বাচন হতে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সময়ে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবেন। সেক্ষেত্রে আইজেনকটের জোট ভেঙে নেতানিয়াহু কাউকে কাউকে নিজের জোটে ভিড়িয়ে নিতে পারবেন। আইজেনকটের সামনে এখন অনেক বিকল্প আছে। প্রথমত, জাতীয় সরকারের নামে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে। দ্বিতীয়ত, আরব-ফিলিস্তিনিদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা কিন্তু আরব-ফিলিস্তিনিদের সরকারের অংশ না করা। এখানেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভাঙা হবে; তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির অজুহাতে হয়তো আরব-ফিলিস্তিনিদের সরকারের অংশ না করলে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে সমর্থক, নিজ জোটের শরিক বা সমালোচকদের শান্ত করা যাবে। আরবরা কী শর্তে আইজেনকটকে সমর্থন দেয়, সেটিও এক প্রশ্ন। আবার বিরোধী দলনেতা হিসেবে নেতানিয়াহুকে নিত্য মোকাবিলা করা সহজ কাজ হবে না। তৃতীয়ত, আইজেনকট হারেদিদের সঙ্গে সমঝোতা করে নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন জোট ভাঙার চেষ্টা করতে পারে। হারেদিদের মোট আসনসংখ্যা ১৩টি। তারা বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের বিরোধী। আইজেনকটকে সেক্ষেত্রেও আপস করতে হবে।
নেতানিয়াহু ও আইজেনকট উভয়ের হাতে সময় আছে। আরব-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে রা’ম নেতা মনসুর আব্বাস রাজনীতিতে যথেষ্ট অভিজ্ঞ। ২০২১ সালে তার দল স্বল্পকালের জন্য সরকারেরও অংশ ছিল। ৮টি আসন নিয়ে এবারও তিনি বুঝতে পারছেন তার দল কিংমেকার হয়ে উঠতে পারেন। তিনি গাদি আইজেনকটকে সরকার গঠনে সমর্থন জানিয়েছেন। জয়েন্ট লিস্ট না চাইলেও আব্বাস মনসুর চেইঞ্জ ব্লক সরকারের সক্রিয় অংশ হতে পারেন। কিন্তু রাজনীতি বড় বিচিত্র। আইজেনকট যদি আরবদের সমর্থন নিতে না চান, সেক্ষেত্রে মনসুর আব্বাস নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিলেও আশ্চর্য হব না।
সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার পরও ট্রাম্প তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প তার সম্ভাব্য প্রভাব যে কাজে লাগাবেন, সে আর অবিশ্বাস্য নয়। তবু কৌতূহলীদের প্রশ্ন, ইসরায়েল কি এখনো ইহুদিবাদী যুদ্ধবাজদের খপ্পরে পড়ে থাকবে!
ইসরায়েলের নতুন সরকার যেমনই হোক, নির্বাচন প্রমাণ করেছে ইসরায়েলের রাজনীতি অনেকখানি বদলে যাচ্ছে। ইহুদিবাদ ছাড়াও ইসরায়েলে এখন হারেদি ও আরব-ফিলিস্তিন জাতিগোষ্ঠীর মতামত আমলযোগ্য আয়তনে পৌঁছেছে। কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকদের পাশাপাশি উদারনৈতিক ও সেক্যুলার রাজনীতিকদের উত্থান ঘটছে। চেইঞ্জ ব্লক সরকার গঠন করলে নেতানিয়াহুকে হয়তো দুর্নীতি ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায়ে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে নতুন সরকারে জবাবদিহি বাড়তে পারে। যুদ্ধংদেহী ও মারমুখী অবস্থানের বিপরীতে অন্তত ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা বাড়তে পারে, যা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বার্থে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পথ সহজ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখনো ভয়ংকরভাবে সাংঘর্ষিক। রাজনীতি, স্বার্থ ও আদর্শের মেরূকরণ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি অনিরাপদ করে তুলেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয় হলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র সরকার আবার মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আগ্রাসী কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে ইসরায়েলে সরকারের পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকানদের ক্ষমতা খর্ব হলে হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষশক্তির আগ্রাসন স্তিমিত হতে পারে এবং তা বিশ্বশান্তির জন্যও অনুকূল হতে পারে। ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনের দিকে সেজন্যই কৌতূহলীদের দৃষ্টি থাকবে।
লেখক: সাবেক কূটনীতিক




