উন্নয়নে উপেক্ষিত জাতির মানসিক স্বাস্থ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, কারও মন্তব্য কেউ পছন্দ না করলে দ্বিমত প্রকাশ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অকথ্য ভাষার ব্যবহার করে। এ ছাড়া নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তো রয়েছেই। প্রশ্ন জাগে– জাতিগতভাবে আমরা কি ক্রমে মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলছি? মানুষের মতামতের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে; কিন্তু সেই দ্বিমত প্রকাশ করতে গিয়ে এমন অসহিষ্ণু আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর ভাষার যথেচ্ছ ব্যবহার এক বিষয় নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সংযম, দায়িত্ববোধ ও অন্যের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাও জড়িত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজ স্বাধীন মতপ্রকাশের নামে অনেক সময় যে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে, তার সঙ্গে আমাদের পরিচিত সামাজিক শিষ্টাচারের হিসাব মেলানো কঠিন। যুক্তির জায়গা দখল করছে বিদ্বেষ; আর ভিন্নমতের মানুষ বিবেচিত হচ্ছে শত্রু হিসেবে।
এ প্রসঙ্গে একটি স্মৃতি মনে পড়ছে। এক সন্ধ্যায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশ অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই দ্রুত উন্নয়ন বোধ হয় আমাদের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়; সমাজ হয়তো তার সবটা ধারণ করতে পারবে না।’ তিনি যখন এ মন্তব্য করেছিলেন, তখন আমি সচিব পদে কর্মরত এবং নানাভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। সে সময় অনেকেই মনে করছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ‘টেক-অফ’ বা উড্ডয়নপর্বে পৌঁছে গেছে। ফলে অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মন্তব্যটি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল, দ্রুত উন্নয়ন আবার সমস্যার কারণ হবে কেন? অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে জেনেছিলাম, দারিদ্র্যের ভারে ন্যুব্জ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তুলতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অপরিহার্য। আর ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হয় বেসরকারি খাতকে। তাই শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছাড়া মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়। এর জন্য আমাদের মতো দেশে সরকারি উদ্যোগে উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়।
কিন্তু এত বছর পর এখন মনে হচ্ছে, ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মন্তব্যটির তাৎপর্য হয়তো কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে গেলেও সমাজের মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যদি একই গতিতে বিকশিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট হয়। অবকাঠামো নির্মাণ করা তুলনামূলকভাবে সহজ; কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক, সহিষ্ণু সমাজ ও সুস্থ জাতিসত্তা গড়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।
পরিচয়ের বৈচিত্র্য অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু সেই বৈচিত্র্য যখন পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও সংঘাতের উৎস হয়ে ওঠে, তখন তা জাতির মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষা সম্ভবত এই গভীরতর অসুস্থতার দৃশ্যমান উপসর্গ মাত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম পাঁচ দশকের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মূলত উপকরণনির্ভর কৌশল প্রাধান্য পেয়েছে। অধিক জমি, শ্রম ও মূলধন কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ কৌশলের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই এবং এর মাধ্যমে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেছে। তবে শুধু উৎপাদনের উপকরণ বাড়িয়ে অনির্দিষ্টকাল একই হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায় না; একপর্যায়ে প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা কমে আসে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধু এগিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, টিকে থাকার জন্যও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। এর মূল চাবিকাঠি হলো দক্ষতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন। অর্থাৎ উপকরণনির্ভর উন্নয়ন থেকে আমাদের ক্রমে দক্ষতা ও উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নের দিকে যেতে হবে। এক দশকের বেশি সময় ধরে আমরা দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধির কথা বলে আসছি; কিছু কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতি ও কার্যক্রমে প্রায়ই পরস্পর বিরোধিতা দেখা যায়, আবার কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় অস্বস্তিকর নীরবতা। দক্ষ ও উদ্ভাবনী জাতি গঠনের প্রধান ভিত্তি তরুণ প্রজন্ম। অথচ সেই প্রজন্মের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানাভাবে বিভক্ত। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন জ্ঞান, মূল্যবোধ, জীবনদৃষ্টি ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। শিক্ষার ধরন ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য ও জাতীয় মূল্যবোধের একটি অভিন্ন ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। কারণ, মূল্যবোধের ভিত্তি দুর্বল হলে শিক্ষাব্যবস্থার ভিন্ন ধারাগুলো সামাজিক বৈচিত্র্যের পরিবর্তে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে। একই দেশের নাগরিক হয়েও তরুণদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সহমর্মিতা ও অভিন্ন পরিচয়বোধ কমতে থাকে। তখন শিক্ষা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে অজান্তেই বিভক্তির প্রাচীর নির্মাণ করতে পারে।
আয় ও শিক্ষার বৈষম্যের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায়ও প্রকট বৈষম্য রয়েছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের বহু শিশু শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি, চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বঞ্চনা, অপমান ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর কাছে ভবিষ্যতে দেশ, জাতি বা উন্নয়ন– এই শব্দগুলো কতটা অর্থবহ হবে কিংবা রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আত্মিক সম্পর্কইবা কীভাবে গড়ে উঠবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন েথকেই যায়।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর তাই প্রশ্ন জাগে– আমরা কি সত্যিকার অর্থে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে পেরেছি? না, পারিনি। একই দেশের মধ্যেই দুই বা ততোধিক পৃথক সামাজিক সত্তা বিরাজ করছে। আমরা ‘বাঙালি’, না ‘বাংলাদেশি— এই বিতর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আমরা ‘বাঙালি মুসলমান’, না ‘মুসলমান বাঙালি— এই পরিচয়গত টানাপড়েন। পরিচয়ের বৈচিত্র্য অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু সেই বৈচিত্র্য যখন পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিদ্বেষ ও সংঘাতের উৎস হয়ে ওঠে, তখন তা জাতির মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষা সম্ভবত এই গভীরতর অসুস্থতার দৃশ্যমান উপসর্গ মাত্র। এর পেছনে রয়েছে বৈষম্য, বঞ্চনা, পরিচয়ের সংকট, দুর্বল শিক্ষা, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক হতাশা। তাই শুধু ব্যক্তিকে ভদ্র ভাষা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন— সব পর্যায়ে সহনশীলতা, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার চর্চা প্রয়োজন। এর অর্থ দেশের উন্নয়নের গতি থামিয়ে দেওয়া নয়; বরং উন্নয়নের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করা। সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও মাথাপিছু আয় যেমন উন্নয়নের সূচক, তেমনি মানুষের মানসিক বিকাশ, সামাজিক আস্থা, ন্যায়বোধ, সাংস্কৃতিক পরিশীলন এবং নাগরিক সহিষ্ণুতাও উন্নয়নের অপরিহার্য মাপকাঠি।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষকে সামর্থ্য দেয়; কিন্তু সেই সামর্থ্য কোন পথে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণ করে শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও মানসিক সুস্থতা। তাই বাংলাদেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শুধু আরও অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি করা নয়; এমন ভৌত, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ গড়ে তোলাও জরুরি, যেখানে মানুষের মন সুস্থভাবে বিকশিত হবে এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সক্ষমতা অর্জন করবে। উন্নয়নের সঙ্গে জাতির মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ, অসহিষ্ণু ও বিভক্ত একটি সমাজ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত তা ধারণ করতে পারে না। সুউচ্চ ভবন নির্মাণের পাশাপাশি তাই তার মানবিক ভিত্তিটিও শক্ত করতে হবে।
লেখক: সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাবেক বিকল্প নির্বাহী পরিচালক




