দলীয়করণে দলেরই ক্ষতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সম্পদ নয়। এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে জনগণের অর্থে, পরিচালিত হয় জনগণের সেবায় এবং তাদের ওপর ন্যস্ত থাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রশাসন-শিক্ষা, স্বাস্থ্য-আইনশৃঙ্খলা, বিচার, গবেষণা কিংবা রাষ্ট্রীয় সেবার যেকোনো প্রতিষ্ঠান— সবখানেই যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও নিরপেক্ষতা বজায় থাকা জরুরি। কিন্তু যখন নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এসব মানদণ্ডের চেয়ে দলীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তার ক্ষতি বহুমাত্রিক হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, দুর্বল হয় প্রতিষ্ঠান আর দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক দলও এর নেতিবাচক পরিণতি থেকে রেহাই পায় না। দলীয় নিয়োগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতি ঘটে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে। একটি পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যদি প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে যোগ্য ব্যক্তিরা প্রতিযোগিতা থেকে নিরুৎসাহিত হন। তারা মনে করতে পারেন, সাফল্যের জন্য পরিশ্রম ও দক্ষতার পাশাপাশি একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয়ও প্রয়োজন। এ ধরনের ধারণা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করে এবং মেধাবীদের অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায়।
প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের মান কমে গেলে তার প্রভাব শুধু কর্মক্ষেত্রের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধীরগতি, সেবার মানের অবনতি, ভুল ব্যবস্থাপনা এবং জনভোগান্তি বাড়তে পারে। একজন অযোগ্য বা অপর্যাপ্ত দক্ষ ব্যক্তি যদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ পান, তাহলে তার সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে হাজারো মানুষের জীবনে। সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় সংস্থার পরিচালনা— সব ক্ষেত্রেই এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে। দলীয়করণের আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার ক্ষয়। সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তির আনুগত্য হওয়া উচিত সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি। কিন্তু নিয়োগ বা পদোন্নতির পেছনে যদি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করে, তাহলে দায়িত্ব পালনের সময় জনস্বার্থের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো সিদ্ধান্ত আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে নেওয়া হবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা বিবেচনায় নেওয়া হবে— এ প্রশ্ন তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সবার আস্থার জায়গা না হয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে।
এক সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় সরিয়ে দিয়ে অন্য পক্ষের অনুসারীদের নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীলতা হারায়
দলীয়করণের ফলে প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির সংস্কৃতিও দুর্বল হয়। যখন কেউ মনে করেন যে তার পদ বা প্রভাব পেশাগত যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তখন ভুলের জন্য জবাবদিহি করার প্রবণতা কমতে পারে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা না করে তাতে সমর্থন দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এতে নেতৃত্বের কাছে প্রকৃত পরিস্থিতির তথ্য পৌঁছায় না, নীতিনির্ধারণে ভুল বাড়ে এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। শুধু তাই নয়; এ পরিস্থিতি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও সুখকর নয়। দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করা সাময়িকভাবে সুবিধাজনক মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি দলের ভেতরের যোগ্যতা, নীতিনিষ্ঠা ও আত্মসমালোচনার পরিবেশকে দুর্বল করে। নেতৃত্বের কাছে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্যবান হয়ে উঠলে দলের মধ্যে গড়ে ওঠে তোষামোদ ও সুবিধাবাদিতার সংস্কৃতি। ফলে জনগণের বাস্তব সমস্যা, সমালোচনা ও প্রত্যাশা নেতৃত্বের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানোর পথ সংকুচিত হয়। এ ছাড়া ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাল্টাপাল্টি দলীয়করণের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এক সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় সরিয়ে দিয়ে অন্য পক্ষের অনুসারীদের নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীলতা হারায়। প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে যদি প্রশাসনিক কাঠামো নতুন করে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়, তাহলে কোনো প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারে না। এতে রাষ্ট্রের অর্থ, সময় ও জনসম্পদ অপচয় হয়।
অবশ্য রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষ সরকারি চাকরি করতে পারবেন না— এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রত্যেক নাগরিকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইন, নীতিমালা ও পেশাগত দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই নিয়োগে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা, নিরপেক্ষ পরীক্ষা, যাচাইযোগ্য যোগ্যতা, ন্যায়সংগত পদায়ন এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং এটি সব দলের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার শর্ত। আজ যে দল ক্ষমতায় থেকে প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনছে, আগামী দিনে ক্ষমতার বাইরে গেলে সেই দুর্বল প্রতিষ্ঠানই তার জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের হাতিয়ার না বানিয়ে জনগণের আস্থার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে নির্ভর করে কোনো রাজনৈতিক দলও দীর্ঘদিন সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও জনভিত্তিক থাকতে পারে না। তাই দলীয়করণের সাময়িক সুবিধার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার দীর্ঘমেয়াদি সুফল অনেক বেশি— এ উপলব্ধিই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান নীতি।
লেখক: এমফিল গবেষক, ডিপার্টমেন্ট অব ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি, ঢাবি



