গার্মেন্টসের সাফল্য পুঁজির প্রস্থান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। গত চার দশকে এই শিল্প দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় রূপান্তরগুলোর একটি ঘটিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মোট রপ্তানির ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। অর্থাৎ রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো মূলত একটি গার্মেন্টসনির্ভর অর্থনীতি।
কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এই শিল্পের গুরুত্ব অসাধারণ। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪১ লাখ মানুষ সরাসরি কাজ করেন এবং বিজিএমইএর হিসাবে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৩৬ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। এই শ্রমশক্তির বড় অংশ নারী। ফলে গার্মেন্টস শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত নয়; শিল্প খাতে বিপুল শ্রমশক্তিকে ধারণ করারও প্রধান মাধ্যম।
কিন্তু এই শিল্প এমনিতেই তৈরি হয়নি। উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিগত সহায়তাও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিট, রপ্তানি প্রণোদনা, শুল্ক সুবিধা, প্রেফারেন্সিয়াল স্মার্ট অ্যাকসেস এবং অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে সাহায্য করেছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিট ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজের মতো নীতিকে আরএমজির বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৩ সালের বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকাশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউজের ৮৩ শতাংশই আরএমজি খাতের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ অতীতের মতো বর্তমানেও শিল্পনীতির একটি বড় অবকাঠামো তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও রপ্তানিনির্ভর ফার্মগুলোর জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, ব্যাক-টু-ব্যাক লেটার অব ক্রেডিট, ক্যাশ ইনসেন্টিভ ও ইপিজেড সুবিধার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
ফলে আজকের আরএমজিকে শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত হিসেবে দেখা ভুল হবে। কয়েক দশকের উৎপাদন, রপ্তানি ও পুনর্বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এই শিল্প একটি বড় উদ্যোক্তা শ্রেণি, বেসরকারি পুঁজি এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শিল্পটি ক্রমাগত প্রযুক্তি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করেছে। ফলে বাংলাদেশের শিল্প খাতে পুঁজি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দুই দিক থেকেই আরএমজির অবস্থান অন্য খাতগুলোর তুলনায় এগিয়ে।
এই ব্যবধান রপ্তানি আয়ের দিক থেকেও স্পষ্ট। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে লেদার ও ফুটওয়্যারের কথা বলা হয়। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আরএমজি রপ্তানি করেছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দ্বিতীয় বৃহত্তম খাতটির রপ্তানি আয়ও আরএমজির তুলনায় বহু গুণ ছোট। এই ব্যবধান শিল্পভিত্তিরও ব্যবধান নির্দেশ করে। আরএমজির মতো বড় পরিসরের পুঁজি, উদ্যোক্তা সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো অন্য কোনো ম্যানুফ্যাকচারিং খাত এখনো তৈরি করতে পারেনি।
এ খাতে কি নীরবে কোনো পরিবর্তন আসছে? ২১ জুলাই ২০২৬-এ বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে আরএমজি উদ্যোক্তারা যে পুঁজি তৈরি করেছেন এবং কারখানা ও উৎপাদন সম্প্রসারণে পুনর্বিনিয়োগ করেছেন, সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পোশাকশিল্পে গড়ে ওঠা পুঁজি ও সম্পদ এখন ঢাকা ও চট্টগ্রামের কারখানাকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পাশাপাশি দুবাই, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের আবাসন, আর্থিক সেবা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তাদের বহুমুখী ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরির কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
উদ্যোক্তারা যদি দেশে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশে সম্পদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, তাহলে এর পেছনে কি শুধু বেশি মুনাফার হিসাব কাজ করছে, নাকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর আস্থার ঘাটতিও রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন
উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বহুমুখীকরণ নিজে কোনো অস্বাভাবিক বা নেতিবাচক বিষয় নয়। সফল ব্যবসায়ী পরিবার নতুন খাতে বিনিয়োগ করতেই পারে, দেশের বাইরেও বিনিয়োগের ব্যবসায়িক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যাবে না। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পভিত্তি যে পুঁজি তৈরি করেছে, তা শেষ পর্যন্ত দেশের পরবর্তী শিল্পায়নের কাজে কতটা ব্যবহার হচ্ছে?
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ যখন দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের দিকে তাকানো হয়। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ ব্যাংক আপডেট বলছে, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, বিদেশি বিনিয়োগ কম এবং অধিকাংশ ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান উচ্চ রেগুলেটরি কস্ট, দুর্বল অবকাঠামো ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। একই প্রতিবেদনে রেগুলেটরি অনিশ্চয়তা কমানো, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, উদ্যোক্তারা যদি দেশে নতুন শিল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদেশে সম্পদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, তাহলে এর পেছনে কি শুধু বেশি মুনাফার হিসাব কাজ করছে, নাকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর আস্থার ঘাটতিও রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন। তবে স্পষ্ট, স্থিতিশীল নিয়মাবলি এবং সেগুলোর প্রয়োগের অভাব, অবকাঠামোগত সমস্যা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগের যে চিত্র বিশ্বব্যাংক তুলে ধরেছে, তা অন্তত প্রশ্নটিকে অপ্রাসঙ্গিক করে না।
এ বিষয়টি তাই শুধু উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নিলে সেটি সঠিক হবে না। কারণ দেশে আরএমজির মতো বড় আর কোনো শিল্পভিত্তি নেই, যেখানে কয়েক দশক ধরে বিপুল বেসরকারি পুঁজি জমা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে আরএমজি থেকে তৈরি হওয়া পুঁজি শুধু উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; বৃহত্তর অর্থনৈতিক অর্থে এটি বাংলাদেশের শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
একটি শিল্প দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজি সঞ্চয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করলে তার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধু নিজের উৎপাদন বাড়ানোতে থাকে না। পুঁজি, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্থনীতির অন্য উৎপাদনশীল খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আরএমজি সেই ভূমিকা পালন করতে পারত। গার্মেন্টস থেকে তৈরি হওয়া পুঁজি নতুন কারখানা, উৎপাদন প্রযুক্তি, সাপ্লাই চেইন ও নতুন শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করতে পারত।
কিন্তু সেই পুঁজি যদি ক্রমবর্ধমানভাবে দেশের বাইরে চলে যায়, অথবা এমন সম্পদে বিনিয়োগ হয়, যা বাংলাদেশের উৎপাদনক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়ায় না, তাহলে এই সম্ভাব্য প্রক্রিয়া দুর্বল হয়। ক্ষতিটা তখন শুধু একটি কারখানা বা রপ্তানি খাতের নয়; ক্ষতি হয় সেই বৃহত্তর শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার, যার পরবর্তী ধাপ প্রথম প্রজন্মের শিল্পের সঞ্চিত পুঁজি ও প্রযুক্তির ওপর দাঁড়ানোর কথা ছিল।
এই অর্থে বাংলাদেশের জন্য আরএমজির সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় বা ৪১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নয়। এর কৌশলগত মূল্য হলো, এই শিল্প এমন একটি বেসরকারি শিল্পায়নের সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করেছে, যা অন্য কোনো শিল্প এখনো তৈরি করতে পারেনি। একই সঙ্গে এটি এমন প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা অন্য উৎপাদনশীল খাতেও ব্যবহারযোগ্য।
তাই গার্মেন্টস শিল্প থেকে পুঁজি সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকে শুধু উদ্যোক্তাদের বিজনেস ডাইভারসিফিকেশন হিসেবে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক বাদ পড়ে যায়। এখানে যে প্রশ্নটি করা উচিত, কেন বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল শিল্প থেকে তৈরি হওয়া পুঁজি পরবর্তী শিল্পায়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে না? কেন দেশে আরেকটি উৎপাদনশীল শিল্প গড়ে তোলার চেয়ে বিদেশে সম্পদ কেনা বা অন্য ধরনের সম্পদে বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে? এর উত্তর খুঁজতে হলে উদ্যোক্তার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থায়ন ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতিকেও দেখতে হবে।
রাষ্ট্র যেভাবে কয়েক দশক আগে আরএমজির বিকাশের জন্য নীতিগত পরিবেশ তৈরি করেছিল, এখন হয়তো তার সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসেছে এই শিল্পে সৃষ্ট পুঁজি যেন বাংলাদেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভেতরেই আরও বেশি সময় ধরে ঘুরতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা। এর অর্থ আরএমজিকে আরও সুবিধা দেওয়া নয়; বরং এমন বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে এ খাত থেকে অর্জিত পুঁজি বাংলাদেশেই নতুন উৎপাদন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান তৈরির দিকে নেওয়া উদ্যোক্তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়।
কারণ, গার্মেন্টস বাংলাদেশের চিরস্থায়ী শিল্পভিত্তি হবে কি না, সেটি আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়। মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, গার্মেন্টস যে পুঁজি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করেছে, আমরা সেটিকে বাংলাদেশের পরবর্তী শিল্পায়নের সম্পদ হিসেবে ধরে রাখতে পারছি কি না। যদি পারি, তাহলে আরএমজি শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হিসেবেই থাকবে না; এটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের ভিত্তিও হয়ে উঠতে পারে। আর যদি না পারি, তাহলে গার্মেন্টসের সাফল্য আমাদের অর্থনীতিকে যতটা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমরা নিজেরাই হারিয়ে ফেলব।
লেখক: প্রাবন্ধিক




