হাহাকারমিশ্রিত হা হা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজনীতিতে মডেলের মহামারি নতুন কিছু নয়। ফর্মুলার ফন্দি, ফাঁদ আর ফিকিরে ভরা এই ভূখণ্ডে ‘আমি-ডামি’র দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের পলিটিক্যাল লীলা। একদা আওয়ামী আমলে ‘আমি আর ডামি’ দিয়ে যে নির্বাচনী নাটক হয়েছিল, তা ছিল দৃশ্যমান দম্ভ; আর এখনকার দৃশ্যে দেখা যায় দ্ব্যর্থ, দ্বিধা আর দ্বৈততার দুষ্টু দোলাচল।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘ডামি দর্শন’ পেয়েছে নতুন প্রপঞ্চ। মডার্ন প্যাকেজিং, সঙ্গে লেনিনীয় লজিকের মিশ্রন। আগে ডামিরা ছিল প্রকাশ্য প্রতীক; আর এখন তারা প্রোফাইল পাল্টানো, পরিচয় ঢাকা, বিপ্লবের পোশাকে পেশাদার প্রপাগান্ডিস্ট।
লেনিনের ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান?’— বিপ্লবের বই, কিন্তু এখন তা হয়ে উঠেছে ডানপন্থী দাপটের ডায়েরি। গোপন সেল, ফ্রন্ট ফেস, প্রফেশনাল পারফর্মার— সবই যেন পুনর্মুদ্রিত, পুনর্ব্যবহৃত, পুনরুজ্জীবিত। ইতিহাস এখানে হাসে। সেই হাসি হালকা নয়, হাহাকারমিশ্রিত।
এখানে কৌশল খুব ক্যালকুলেটেড, কৌশলী, কৌতুককর। সরাসরি দলীয় দাগে দাঁড়ালে যদি ‘সেকুলার সাইরেন’ সশব্দে সজাগ হয়, তবে সমাধান হলো— ভিন্ন ব্র্যান্ডিংয়ে ‘ডামি’দের সামনে ছুড়ে দাও!
ফলাফল? বিচিত্র, বিভ্রান্তিকর, বর্ণিল— যাদের একেকজন একেক মহড়ায় পটু।
সর্বমিত্র চাকমা: অধিকার-আবরণের আবেগী প্রতীক, সাথে আদিবাসী কার্ড। কিন্তু ক্যাম্পাসের অলিতে-গলিতে হাতে ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে কিশোরদের কান ধরে ওঠবস করানো, লাঠি হাতে বৃদ্ধদের তাড়া করা, কিংবা বাসকর্মীর মোবাইল কাড়াকাড়ির মতো ডার্টি ওয়ার্কে তার বীরত্ব চোখে পড়ার মতো। অসদাচরণের দায়ে শোকজ খেলে পদত্যাগের নাটক, আবার নাটক শেষে ইউটার্ন মেরে পদেই বহাল থাকেন।
এবি জুবায়ের: মুভমেন্টের মুখোশে মৃদু মিছিলের মেকানিক। ক্যাম্পাসে নীতি-নৈতিকতার ‘সিভিল পুলিশ’ সেজে কাস্টমার বেশে পতিতাবৃত্তি শনাক্তকরণের গল্প ফাঁদা, কাপল হঠানো কিংবা গভীর রাতে হিজড়াদের সঙ্গে অনৈতিক ও অপ্রীতিকর কেলেঙ্কারিতে জড়ানো— ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলার নামে বিশৃঙ্খলা আর ভীতি উৎপাদনের দক্ষ কারিগর তিনি।
ক্যাডার রাজনীতির আধুনিক এই নেটওয়ার্ক কেবল স্লোগান আর ডায়ালগে সীমাবদ্ধ নয়; এদের আসল কারিশমা উন্মোচিত হয় ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ বা নোংরা কাজগুলো আউটসোর্স করার মাধ্যমে। যে কাজগুলো দলীয় প্যাডে বা মূল নেতাদের সাদা পাঞ্জাবিতে সরাসরি রক্তের দাগ কিংবা কাদা লাগাতে পারে, সেগুলো সম্পাদনের জন্য এই ‘ডামি’রাই সেরা উপাদান
মোসাদ্দেক ইবনে আলী: মিডিয়া ও ইতিহাস বিকৃতির ভার্চুয়াল বিভীষিকা। ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে বাধা দেওয়া থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বিষোদ্গার— সবই তার ঝুলিতে। আর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি? কুলাউড়ার পাহাড়ে ইউরেনিয়াম খুঁজে পেয়ে ভারতকে ‘অসংখ্যবার ধ্বংস’ করার অবাস্তব হুঙ্কার দিয়ে হাসির খোরাক হওয়া যার পরিচয়, সেই ইউরেনিয়াম-মার্কা বিপ্লবীই পেছনের প্রভুদের বড় অস্ত্র।
ফাতিমা তাসনিম জুমা: জেন্ডার-জাগরণের জ্বলজ্বলে জ্যোতি।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে ব্যঙ্গ করা আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে বিতর্ক উসকে দেওয়ায় তিনি ওস্তাদ। আবার ‘আসল শিবির তো আমার মা’ টাইপ চটুল বুলি উগড়ে দিয়ে পেছনের রাজনীতি আড়াল করার মহড়াও তিনি দেন দিব্যি।
সালাউদ্দিন আম্মার: আর যখন প্রাতিষ্ঠানিক দাপট দেখানোর দরকার পড়ে? তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে হাতে বেলচা নিয়ে ঢোকার দুর্ধর্ষ দৃশ্য তৈরি হয়। শিক্ষক, প্রক্টর আর পুলিশের সামনে পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থী পিটানো, এমনকি আহতকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে লাথি মারার মতো নজিরবিহীন ‘মব সন্ত্রাস’ ঘটান আম্মার ও তার বলয়। ইন্টেরিম সরকারের সময় রাজশাহী থেকে ঢাকায় উড়ে এসে পিকেটিং ও উসকানির কাজও তাকে আমরা করতে দেখেছি নিষ্ঠার সঙ্গে।
কিন্তু ডামিরা কি শুধু ডায়ালগ আর সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে? না, না— তাদের দায় আরও গভীর, আরও গাঢ়।
তারা হলো ‘ডার্টি ডিপার্টমেন্ট’-এর দুঃসাহসী দফাদার।
ক্যাডার রাজনীতির আধুনিক এই নেটওয়ার্ক কেবল স্লোগান আর ডায়ালগে সীমাবদ্ধ নয়; এদের আসল কারিশমা উন্মোচিত হয় ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ বা নোংরা কাজগুলো আউটসোর্স করার মাধ্যমে। যে কাজগুলো দলীয় প্যাডে বা মূল নেতাদের সাদা পাঞ্জাবিতে সরাসরি রক্তের দাগ কিংবা কাদা লাগাতে পারে, সেগুলো সম্পাদনের জন্য এই ‘ডামি’রাই সেরা উপাদান।
এখানে দৃশ্যপটটি খুবই কৌশলী ও খেয়াল করার মতো। ক্যাম্পাসের মাঠে, হলে, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন এই ডামি ক্যারেকটারগুলো চারদিকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, অন্যায়-অপকর্ম আর মব সন্ত্রাসে মেতে উঠছে— ঠিক তখন নির্বাচিত মূল দলীয় প্রতিনিধিদের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না! কোনো বিতর্কিত বা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে তাদের ছায়াটি পর্যন্ত দেখা যায় না। তাদের যাবতীয় দৃশ্যমানতা সংরক্ষিত থাকে কেবল আনুষ্ঠানিক সভা-সমাবেশ, প্রশাসনিক বৈঠক, ফিতা কাটা কিংবা নেতৃত্বের বেলায়। তারা মিডিয়া ও সাধারণ মানুষের সামনে এসে একদম মার্জিত, সুশৃঙ্খল ও আদর্শবাদী নেতার পোজ দেন; আর পেছনের যাবতীয় ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ সম্পন্ন করে বেড়ায় এই ডামিরা।
প্রথমত আসে ভাষার ভীতি ও ভার্চ্যুয়াল বিভীষিকার পর্ব। ফেসবুকের নীল পর্দায় চোখ রাখলেই দেখা যায় এই প্রক্সি ডামিরা কীভাবে ‘ডিজিটাল লাঠিয়াল’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক যদি তাদের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মুখ খোলেন কিংবা কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করেন, তবে মূল নেতারা মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন, আর সামনে নামিয়ে দেওয়া হয় ডামিদের তাণ্ডব। ফেসবুক ফিডে ঝরতে থাকে ফোঁটা ফোঁটা ফতোয়া, শুরু হয় গালাগালির পৈশাচিক গর্জন আর চরিত্রহননের সুসংগঠিত চক্রান্ত। ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’, ‘ধর্মদ্রোহী’ কিংবা ‘ভিনদেশি দালাল’ ট্যাগ সাঁটিয়ে দিয়ে মুহূর্তেই একটি মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার এই তাণ্ডবই হলো তাদের অন্যতম মোক্ষম হাতিয়ার।
এরপর আসে ভয়, ভীতির বাস্তব মহড়া। অনলাইনের ডিজিটাল ভয় যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পবিত্র ও শান্ত পরিবেশেও বেলচা আর লাঠি হাতে মারমুখী হুঙ্কার ওঠে। প্রক্টর, শিক্ষক বা পুলিশের সামনেই চলে কিল-ঘুষি-চড়-থাপ্পড় আর চেয়ার তুলে আঘাতের নজিরবিহীন মহড়া। হুমকি— ‘তোরে একবারে পুঁইতা ফেলাব!’ হলে হলে চলে আতঙ্ক সৃষ্টির টহল, আর আহত শিক্ষার্থীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়ে লাথি মারতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গড়ে তোলা এই মব-মিছিল ক্যাম্পাসে এক স্থায়ী ভীতির তৈরি করে, যা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কিন্তু এই রক্তগরম নাটকের সবচেয়ে কৌতুককর অঙ্কটি শুরু হয় ঠিক তখনই, যখন কাজ শেষ হয় কিংবা কেলেঙ্কারির কোলাহল একটু বেশিই কানে এসে বাজে।
যেই মুহূর্তে মিডিয়ার ক্যামেরা জ্বলে ওঠে বা চাপ তৈরি হয়, অমনি নেপথ্যের মূল নির্বাচিত নেতারা ঠান্ডা মাথায় একখানা প্রেস রিলিজের খসড়া তৈরি করেন। ভাবলেশহীন মুখে ঘোষণা আসে— “উক্ত ব্যক্তিবর্গ বা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের সংগঠনের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। আমরা সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে!”
ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে মূল নির্বাচিত দলীয় নেতৃত্ব আবার ধবধবে ধোয়া তুলসী পাতা! প্রশাসনিক টেবিলে তারা সুশীল, সুশৃঙ্খল আর গণতান্ত্রিক মানসের ধারক-বাহক। আর পেছনের মাস্টারমাইন্ডদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে গালি খাওয়া, লাঠি চালানো এই ডামিরা দিনশেষে পরিণত হয় দায় ও দাগে দগ্ধ এক-একটি রাজনৈতিক দাসে।
ইতিহাসের এই পরিহাস কী প্রগাঢ়, কতটা প্রচণ্ড আর চরম প্রহসনময়!
বামপন্থী লেনিনের গোপন সেল থিওরি ও ফ্রন্ট অর্গানাইজেশনের লজিক আর আওয়ামী লীগের সেই কুখ্যাত ‘আমি-ডামি’ মডেলের দুর্ধর্ষ সামাজিক দাম্পত্যে জন্ম নিয়েছে আজকের এই নতুন ডানপন্থী শৈলী— যেখানে ডামি, দল আর দ্বিচারিতা মিলেমিশে একাকার দমবন্ধ করা দুনিয়া।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




