জ্যাকসন হাইটসের আয়নায় পল্টনের মুখ

সংগৃহীত ছবি
নিউ ইয়র্কের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে নিয়ে একই ধরনের দৃশ্য বারবার দেখতে হবে— এটা কি এখন আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে? আজ হয়তো আমি জ্যাকসন হাইটসে গতকাল সোমবার ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা বলছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঘটনাটি এক দিনের নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান, কর্মসূচি, রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা কোনো সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশের বাইরে, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে, বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে প্রতিবাদ, পাল্টা-প্রতিবাদ, স্লোগান, উত্তেজনা কিংবা সংঘাতের দৃশ্য বারবার ফিরে আসছে।
গতকালও তার ব্যতিক্রম হলো না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউ ইয়র্ক আগমনকে কেন্দ্র করে জ্যাকসন হাইটসে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি স্লোগান, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুলিশ এসে দুই পক্ষকে আলাদা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
ঘটনাস্থলে থাকা একজন NYPD কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি জানতেন না যে সেখানে বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে। তিনি শুধু দেখছিলেন— দুই পক্ষ পরস্পরের বিরোধিতা করছে। বাংলায় কী বলা হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারছিলেন না; কিন্তু মানুষের আচরণ, শরীরী ভাষা ও উত্তেজনা তার নজরে পড়েছিল
একজন সাংবাদিক হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে সংবাদ। কিন্তু একজন বাংলাদেশি এবং আমেরিকান-বাংলাদেশি হিসেবে ঘটনাটি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ প্রশ্নটা শুধু কে কাকে কী বলেছে, কে কোন দলের সমর্থক কিংবা কে কার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে— প্রশ্নটা তার চেয়েও বড়।
আমরা নিজেদের বিশ্বের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করছি?
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনকে ঘিরে এই মুহূর্তে নিউ ইয়র্ক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও এই অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে রয়েছেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যখন এই শহরে এসে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরছেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশ যদি একই শহরের রাস্তায় নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধকে অশালীনতা, উত্তেজনা কিংবা সংঘাতের মাধ্যমে প্রকাশ করে, তাহলে আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখতে হয়— বিশ্বের সামনে আমরা কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরছি?
প্রতিবাদ করার অধিকার অবশ্যই আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কে বসে কেউ প্রতিবাদ করবেন— এটি অস্বাভাবিক নয়। কেউ সরকারের পক্ষে অবস্থান নেবেন, কেউ বিরোধিতা করবেন— এটিও স্বাভাবিক রাজনৈতিক আচরণ।
কিন্তু মতপার্থক্য আর ব্যক্তিগত অপমান এক বিষয় নয়। প্রতিবাদ আর সংঘাতও এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক বক্তব্য আর অশালীন ভাষাও এক বিষয় নয়। প্রশ্নটা তাই প্রতিবাদ করা যাবে কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ কেমন হবে।
ঘটনাস্থলে থাকা একজন NYPD কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি জানতেন না যে সেখানে বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে। তিনি শুধু দেখছিলেন— দুই পক্ষ পরস্পরের বিরোধিতা করছে। বাংলায় কী বলা হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারছিলেন না; কিন্তু মানুষের আচরণ, শরীরী ভাষা ও উত্তেজনা তার নজরে পড়েছিল।
এই ছোট্ট কথোপকথনটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে।
কারণ একজন আমেরিকান নাগরিক, একজন পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা এ দেশের কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছে আমাদের প্রথম পরিচয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়। তাদের কাছে আমরা বাংলাদেশি। আমরা বাঙালি। আমরা এই দেশের অভিবাসী কমিউনিটির অংশ।
তাই জ্যাকসন হাইটসের রাস্তায় একজন বাংলাদেশি যখন আরেকজন বাংলাদেশিকে প্রকাশ্যে অপমান করেন, তখন বাইরের একজন দর্শক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো হয়তো জানেন না। তিনি শুধু দেখেন— দুই বাংলাদেশি পক্ষ প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়িয়েছে।
এখানেই আমাদের থামতে হবে।
একজন আমেরিকান কিংবা এ দেশের কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছে আমাদের দলভিত্তিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে আমরা বাংলাদেশি। সুতরাং আজ জ্যাকসন হাইটসের একটি ঘটনা শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগের ঘটনা হিসেবে শেষ হয়ে যায় না। এটি আমাদের নিজেদের কাছেও একটি আয়না হয়ে দাঁড়ায়
একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে পুরো বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে বিচার করা অবশ্যই অন্যায়। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তাহলে আমাদের নিজেদের সম্পর্কেই নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কি আমাদের ভাবা উচিত নয়?
কারণ ছোট ছোট ঘটনাকে আমরা হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ভুলে যাই। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ হয়তো সেগুলোকে একটি ধারাবাহিক আচরণের অংশ হিসেবে দেখতে পারেন। আর এখানেই আসে ইমিগ্রেশনের প্রশ্ন।
আজকের একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষকে কোনো নির্দিষ্ট ইমিগ্রেশন সিদ্ধান্তের সরাসরি কারণ বলা যাবে না। সেটি বাস্তবসম্মতও নয়। কিন্তু একটি কমিউনিটির সামাজিক আচরণ, জনসমক্ষে তার ভাবমূর্তি এবং সেই কমিউনিটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা— এসব বিষয়কে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকও বলা যায় না।
ইমিগ্রেশন, ভিসা, নাগরিকত্ব কিংবা অভিবাসীদের নিয়ে যখন সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা হয়, তখন একটি কমিউনিটির সামগ্রিক পরিচয়ও আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো— আমরা কি নিজেরাই এমন কোনো ছবি তৈরি করছি, যা ভবিষ্যতে আমাদের কমিউনিটির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে?
আরও বড় প্রশ্ন— আমরা কি আমেরিকায় শুধু অর্থ উপার্জন করতে এসেছি? ভালো চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি, গাড়ি, সন্তানের ভবিষ্যৎ— এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা কি এই দেশের কিছু সামাজিক মূল্যবোধও নিজেদের জীবনে গ্রহণ করছি?
ভিন্নমতকে সম্মান করা। অন্যের মর্যাদা রক্ষা করা। আইন মেনে প্রতিবাদ করা। রাজনৈতিক বিরোধকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না করা। জনসমক্ষে নিজের আচরণের দায়িত্ব নেওয়া। এই মূল্যবোধগুলো কোথায়? আমরা কি শুধু জীবনযাত্রা বদলেছি, নাকি আচরণ ও মূল্যবোধেও কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি?
বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হলো— বিদেশে প্রতিবাদ। বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলো— বিদেশে পাল্টা কর্মসূচি। কোনো রাজনৈতিক নেতা নিউ ইয়র্কে এলেন— রাজপথে সমর্থক ও বিরোধীদের স্লোগান। তারপর উত্তেজনা। কখনো বাকবিতণ্ডা। কখনো ধাক্কাধাক্কি। কখনো পুলিশ।
প্রশ্ন হলো, এই ধারাবাহিকতার শেষ কোথায়? এসব প্রতিবাদে বাস্তবে কী পরিবর্তন এসেছে? কোনো নীতি বদলেছে? কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে? কোনো বাস্তব সমস্যার সমাধান হয়েছে?
নাকি কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনা, কিছু স্লোগান, কিছু ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই সব শেষ? প্রতিবাদের অধিকারকে প্রশ্ন করা হচ্ছে না। প্রশ্ন করা হচ্ছে প্রতিবাদের কার্যকারিতা, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে।
একটি সভ্য সমাজে প্রতিবাদের শক্তি শুধু গলার জোরে নয়; যুক্তি, তথ্য, শৃঙ্খলা ও নাগরিক আচরণেও প্রকাশ পায়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সন্তানরা আমাদের দেখছে। তারা দেখছে আমরা ভিন্নমতের মানুষকে কীভাবে সম্বোধন করি। তারা দেখছে রাজনীতি আমাদের কাছে কী অর্থ বহন করে। তারা দেখছে মতের অমিল মানেই কি শত্রুতা। তাহলে আমরা তাদের জন্য কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতি রেখে যাচ্ছি?
আমরা কি চাই তারা বাংলাদেশকে শুধু রাজনৈতিক বিভাজনের চোখে দেখুক? নাকি তারা এমন একটি বাংলাদেশকে চিনুক, যে দেশ মতের ভিন্নতাকে সম্মান করতে জানে, প্রতিবাদ করতে জানে, কিন্তু মানুষকে অপমান না করেও নিজের অবস্থান প্রকাশ করতে পারে?
নিউ ইয়র্কে আমাদের কমিউনিটি ছোট নয়। আমাদের ব্যবসা আছে, পেশাজীবী আছে, শিক্ষক আছে, চিকিৎসক আছে, প্রকৌশলী আছে, সাংবাদিক আছে, শিক্ষার্থী আছে, নতুন প্রজন্ম আছে। এই পুরো কমিউনিটির অর্জনকে একটি রাজনৈতিক সংঘাতের দৃশ্য দিয়ে বিচার করা অবশ্যই ঠিক নয়।
সেই কারণেই আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ আমরা যখন বিদেশের মাটিতে দাঁড়াই, তখন শুধু নিজের কথা বলি না— অনেক সময় নিজের অজান্তেই নিজের দেশের কথাও বলি। আমাদের পোশাক, ভাষা, আচরণ, ব্যবসা, সামাজিক কর্মকাণ্ড— সবকিছুর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে কেউ না কেউ চিনে। আমাদের রাজনৈতিক আচরণও কি সেই পরিচয়ের বাইরে?
একজন আমেরিকান কিংবা এ দেশের কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছে আমাদের দলভিত্তিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে আমরা বাংলাদেশি। সুতরাং আজ জ্যাকসন হাইটসের একটি ঘটনা শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগের ঘটনা হিসেবে শেষ হয়ে যায় না। এটি আমাদের নিজেদের কাছেও একটি আয়না হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা কি আমেরিকায় শুধু অর্থ উপার্জন করতে এসেছি, নাকি নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচরণকেও আরও পরিণত করতে এসেছি? আমরা কি শুধু জীবনযাত্রা বদলেছি, নাকি মূল্যবোধেও পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত? আমরা কি জ্যাকসন হাইটসকে পল্টন ময়দান বানাতে এসেছি? নিউ ইয়র্কবাসী কি তাদের জ্যাকসন হাইটসকে পল্টন ময়দান হয়ে যেতে দেখতে থাকবে? আমরা কি আমাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য এমনভাবে প্রকাশ করতে পারি, যাতে আমাদের সন্তানরা আমাদের দেখে গর্ব করতে পারে? কারণ দলীয় পরিচয়ের আগে আমাদের একটি অভিন্ন পরিচয় আছে। আমরা বাংলাদেশি।
আর নিউ ইয়র্কের রাজপথে, আমেরিকার মাটিতে, বিশ্বের মানুষের সামনে—আমরা কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চাই, সেই সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।
লেখক: সাংবাদিক



