প্যালিয়েটিভ কেয়ার: অধিকার, সংকট ও করণীয়

সংগৃহীত ছবি
১০ অক্টোবর বিশ্ব হসপিস ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য 'Pain Management: An Essential Part of Palliative Care' বা 'ব্যথা-নিয়ন্ত্রণ: প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অপরিহার্য অংশ'। প্রতিপাদ্যটি শুধু শারীরিক ব্যথা নয়, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কষ্টকেও সমন্বিতভাবে বিবেচনার ওপর জোর দেয়।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার সম্পর্কে আমাদের সমাজে এখনো ভুল ধারণা প্রচলিত। অনেকে মনে করেন, এটি কেবল মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জন্য, কিংবা চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ আশ্রয়। বাস্তবে এটি এমন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা, যার লক্ষ্য রোগ সারানো সম্ভব না হলেও রোগীর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, উদ্বেগ, অনিদ্রা ও অন্যান্য কষ্ট কমানো এবং রোগী ও পরিবারের জীবনমান উন্নত করা। তাই এটি মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার ব্যবস্থা নয়; বরং জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত মানুষকে স্বস্তি, মর্যাদা ও মানবিকতার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া।
২০১৪ সালে বিএমইউ ও নিপোর্টের যৌথ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ৬ লাখ মানুষের প্যালিয়েটিভ সেবা প্রয়োজন হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের ভার বিবেচনায় এখন এই সংখ্যা ৭ লাখের কাছাকাছি বলে অনুমান করা যায়। সেবা পান মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। শিশুদের ক্ষেত্রে চিত্র আরও করুণ: আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী বছরে প্রায় ১ লাখ শিশুর এই সেবা প্রয়োজন, অথচ শিশুদের জন্য নিবেদিত সেবা কার্যত নেই।
ক্যানসার, কিডনি রোগ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, লিভার সিরোসিস ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অসহনীয় ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চিকিৎসার বিপুল ব্যয় রোগী ও পরিবারের ওপর গভীর চাপ তৈরি করে। এই বাস্তবতায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিলাসিতা নয়, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
হু'র তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বে ১৮.১ মিলিয়ন নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয় এবং ৯.৬ মিলিয়ন মানুষ ক্যানসারে মারা যায়। চিকিৎসাধীন রোগীদের ৫৫ শতাংশ এবং অগ্রসর বা টার্মিনাল রোগীদের ৬৬ শতাংশ মারাত্মক ব্যথার শিকার হন। এই ব্যথা কমানোর মূল ওষুধ মরফিন, যাকে হু মাঝারি থেকে তীব্র ব্যথা উপশমের কার্যকর, তুলনামূলক কমদামি ও অপরিহার্য ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ সংস্থার হিসাবে বিশ্বে প্রায় পাঁচশ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত ব্যথানাশকের নাগাল পান না। উন্নত দেশগুলো মোট মেডিক্যাল ওপিওয়েডের ৬৮ শতাংশ ব্যবহার করে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলো মাত্র ৭ শতাংশ; বাংলাদেশ এই বৈষম্যের প্রকট দৃষ্টান্ত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০১৫ সালে মাথাপিছু গড় মরফিন-সমতুল্য ব্যবহার ছিল ১.৭ মিলিগ্রাম, বৈশ্বিক গড় ৬১.৫ মিলিগ্রাম। ২০১২ সালের সমীক্ষায় বাংলাদেশে তা ছিল মাত্র ০.০৫ মিলিগ্রাম, পরবর্তী সমীক্ষায় ০.০৩৪ মিলিগ্রামের কাছাকাছি; যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০ মিলিগ্রামের তুলনায় যা নগণ্য। বৈশ্বিক ক্রমতালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৬০তম। এর অর্থ, অসংখ্য টার্মিনাল ক্যানসার ও জীবন-সীমিতকারী রোগের রোগী জীবনের শেষ দিনগুলো তীব্র, অনিয়ন্ত্রিত ব্যথা নিয়ে কাটান।
ক্যানসার, কিডনি রোগ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, লিভার সিরোসিস ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অসহনীয় ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চিকিৎসার বিপুল ব্যয় রোগী ও পরিবারের ওপর গভীর চাপ তৈরি করে। এই বাস্তবতায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিলাসিতা নয়, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ
সংকটের শিকড় আইনেও রয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের ওপিয়াম আইন (১৮৭৮) ও ডেঞ্জারাস ড্রাগস অ্যাক্ট (১৯৩০) পেরিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এ ওপিওয়েড লেখার এখতিয়ার কঠোরভাবে সীমিত ছিল। ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত মরফিন লিখতে চিকিৎসকদের বিশেষ লাইসেন্স নিতে হতো, নয়তো আইনি জটিলতা ও কারাদণ্ডের ঝুঁকি ছিল। ২০১৮ সালের নতুন আইনে এখন যেকোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক মরফিন লিখতে পারেন। তবু বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি, কারণ সমস্যা শুধু আইনি নয়; এর সঙ্গে জড়িত উৎপাদন ও সরবরাহ, আমলাতান্ত্রিক অনুমোদন, বিতরণের সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ, অপব্যবহারের আশঙ্কা এবং রোগী-পরিবারের ভুল ধারণা।
মরফিনকে অবশ্য যথেচ্ছ ব্যবহারের ওষুধ ভাবা যাবে না। সঠিক রোগী, মাত্রা ও ব্যবধান, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই তা ব্যবহার করতে হয়। নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত একসঙ্গে দুটি বিষয়: অপব্যবহার ঠেকানো এবং প্রকৃত রোগীর ব্যথামুক্ত থাকার অধিকার রক্ষা করা। এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: প্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধ কি সত্যিই যাঁদের দরকার, তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছে? উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়।
মরফিন কোনো বিলাসিতা বা যথেচ্ছ ব্যবহারের ড্রাগ নয়; এটি গুরুতর অসুস্থ রোগীর কষ্ট লাঘবের চিকিৎসাগত প্রয়োজন। সঠিক রোগী, মাত্রা, নিরাপদ সংরক্ষণ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করে মরফিনের সহজপ্রাপ্যতা বাড়ানো দরকার। আমাদের নীতি নির্ধারণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি চিকিৎসায় রোগীর পাওয়ার অধিকারকে সুরক্ষা দেওয়া। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এক অপরিহার্য মানবিক অধিকার।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক




